Jun 3, 2021

"পারদ (সব খুন খুন নয়)" - আরিঞ্জয় ওয়াহিদ (আবু)

Edit Posted by with No comments

 


পারদ (সব খুন খুন নয়)

আরিঞ্জয় ওয়াহিদ (আবু)

 

পর্ব-১

মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায়

 

রাত্রি তখন ১২টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি, উত্তরের জানালাটা খোলা,আকাশে মেঘ তারার সাথে আলিঙ্গন করছে বৃষ্টি নামাবে বলে,মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে বাতাসের কলতান।

বালিশে হেলান দিয়ে একটানা ঘন্টা খানেক ধরে মোবাইলটা স্ক্রল করে যাচ্ছে অরি, চোখটা জাস্ট লেগে যাচ্ছিল মোবাইলের ডাটাটা অফ করে ঘুমোতে যাবে ঠিক এমন সময় মোবাইলের স্ক্রিনে হালকা আওয়াজে ভেসে উঠল একটা মেসেজ-'হাই'

বুড়ো আঙুলে মেসেজটা খুলতেই -দেখল নাম- স্মিতা রায়' অরি উত্তর দিলো- 'হম!কে বলছেন'

-কেন facebook এ নাম দেখায় না বুঝি'

-হম । কিন্তু কে আপনি?

-পরিচয় হতেই তো টেক্সট করলাম ।

-আচ্ছা ! বলুন।

-একটা কথা বলবে !

-কি।

-মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় ?

-মানে। কিছু বুঝলাম না কি বলতে চাইছেন ।

(এর পর আর কোনো Repaly এল না ফোনের ওপার থেকে)

অরি অনেক্ষন চিন্তা করতে করতে মোবাইলটা রেখে ঘুমোনোর চেষ্টা করলেও কিছুতেই আর ঘুমোতে পারছিল না , তার চোখের সামনে সেই লেখাটাই ভেসে আসছে বার বার-'আচ্ছা মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায়' !

হঠাৎ হুড় মুড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে মেয়েটার profile ঘাটতে শুরু করল তারপর যা দেখল তা দেখে সে অবাক ,

আরে এটাতো 'রিয়া'...!

রিয়া অরিত্রের মানে অরির প্রাক্তন প্রেমিকা, স্কুল জীবন থেকেই পরিচয় পরে ধীরে ধীরে সেটা সম্পর্কের রূপ পায় যদিও রিয়া প্রথমের দিকে অন্য কারোর সাথে সম্পর্কে থাকার জন্য অরির সাথে ওর সম্পর্কটা বন্ধুত্বের ছিল কিন্তু পরবর্তীতে কোনো কারণে ছেলেটা তার সঙ্গ ছাড়লে রিয়ার প্রতিটি মন খারাপের রাতে অরিই ছিল শেষ সম্বল আর এভাবেই তা পরে সম্পর্কের রূপ নেয় ।

কলেজ জীবনের পরবর্তীতে বেকার অসহায় গরিব অরিত্রের সাথে সম্পর্কটা মেনে নিতে চায়নি রিয়ার বাবা, আর তার জেরেই সম্পর্কের বিয়গ। বিয়ের ৩ বছরের মাথায় একদিন খবর পেয়েছিল অরি যে কিছু একটা মেয়ে ঘটিত রোগের কারণে রিয়া মারা যায় ।

সেদিন একাকাশ মন খারাপ নিয়ে তারা ভরা আকাশের দিকে চেয়ে রাত কেটেছিল তার ।

আসলে সম্পর্ক বড়ো কঠিন রোগ, একবার জড়িয়ে গেলে সারানোর ওষুধ খোঁজা দুষ্প্রাপ্য। সম্পর্কের যোগে অধিকার, বিয়োগে অনাধিকার, তাই হয়ত ছেড়ে আসার পর সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল সে । কিন্তু সেটা বিশ বছর আগের ঘটনা তাহলে আজ হঠাৎ ওর ফেসবুক একাউন্ট থেকে sms করল কে ?

এমন সময় দানবের চিৎকারের মতো আওয়াজ করে আকাশ ধেঁয়ে তুমুল বেগে বৃষ্টি নামল । জানালার পাল্লা হওয়ার বেগে দেওয়ালে আছার খেয়ে ফিরে ফিরে যাচ্ছে, ঠিক জানালার সামনেই রাখা চেয়ারটায় বসে সেই পঁচিশ বছর আগেকার কুড়ি বছরের রিয়ার প্রেমে মাতাল হয়ে অরি যেন পৃথিবীর সব কিছু ভুলে তাতেই মগ্ন হয়ে পড়ে রইল ।

 

পর্ব-২

সুইসাইড নোট

 

আকাশটা আজ বড্ড পরিস্কার,ঠিক যেন সদ্যস্নাত কোনো নারী খোলাচুলে রোদে কাপড় মেলছে। পূর্বের আকাশটা লাল হয়ে কিছুটা ছটা দর্জার ভাঁজে দাঁড়িয়ে।

বাইরে গলিতে সব্জি ওয়ালার চিৎকার আর পেপার ওয়ালার সাইকেলের বেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল অরির ।

এমন সময় দর্জার ওপার থেকে কথা বলতে বলতে ভিতরে প্রবেশ করল মণি।

-কি গো দিন দিন বয়স যেনো কমছে তোমার,রাত জাগার অভ্যাসটা এখন গেল না ।

টেবিলের উপর চায়ের কাপটা রেখে মনি বলল- রাতে মেডিসিন নিয়েছ ? উত্তরে অরি বলল-মন খারাপের যন্ত্রণা কি আর মেডিসিনে সাড়ে ! কটা বাজে ?

-সাতটা কুড়ি,কাল রাতে নীলুদার মেয়েটা সুইসাইড করে মারা গেছে ?

-নিলুদার মেয়ে মানে আমাদের তনয়ের সাথে যে মেয়েটা পড়ে ?

- হুম, গলায় ফাঁস ঝুলিয়ে, এই যুগের ছেলে-মেয়ে গুলো মাইরি যাচ্ছে তা, জানতিস ছেলেটা ভালো নয় মুখ কালা করার আগে একবার ও ভাবলি না, নিজে মরল আর এখন বাপ মাকে তার পাপ বইতে হবে, আমি এ জন্য বাবুকে বলেছিলাম ওসব মেয়ের সাথে না ঘুরতে, কে শোনে কার কথা।

বিছানার চাদরটা ঠিক করতে করতে মনি আবার বলল-এখনকার ছেলে-মেয়েদের তো স্বাধীনতা চাই, এই হল স্বাধীনতার হাল ।

অরি চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বলল

-আচ্ছা মনি মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় ।

অর্ধেক মেলানো চাদরে হাত ঝাপড়াতে ঝাপড়াতে হঠাৎ থেমে মনি বলল-এই জন্যই বলি রাতে পিল নিতে, বুদ্ধি শুদ্ধি লোভ পাচ্ছে তোমার দিন দিন- মানুষ মরলে কোথায় যায় জানোনা ?

-কোথায়? অরি বলল ।

-অবশ্যই ভগবানের কাছে,বাচ্চাদের মতো কথা

বলছ কেন ?

-ওহ তাইতো । সুইসাইডের কারণ তাহলে ছেলে সম্পর্ক ঘটিত ।

-তাছাড়া আর কি হবে। ওই যে ছেলেটা মাঝে মাঝে বাইকে করে নামিয়ে দিয়ে যায় ।

সিগারেটের প্যাকেটটা থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে প্যাকেটটা টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে অরি বলল-

-সে তো বন্ধুও হতে পারে !

অরির সদ্য ফুরিয়ে আসা চায়ের কাপটা হাতে নিতে নিতে মনি বলল-বন্ধু না ছাই, তুমি সব জায়গাকে নিজের কোর্ট ভাবাটা বন্ধ করো, লোকে বলাবলি করছিল "He also threatened to baby abort"ভাবো একবার, আমরা কোন যুগে এসে পৌঁছেছি ।

-হম সেটাই । পুলিশ এসেছিল ?

-হ্যাঁ পুলিশ এসেই তো দর্জা ভেঙে বডিটা বের করল ।

- কি বলল ?

- ওওদের মধ্যে একজন বলাবলি করছিল যে প্রি-প্ল্যানিং মার্ডার।

এই বলে মনি চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেড়োতে বেড়োতে বলল-তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে নিচে আসো, মাসি আসেনি ব্রেকফাস্ট সেরে বাজারে যেতে হবে, ঘরে আলু ছাড়া কোনো কাঁচা সবজি নেই ।

চেয়ার থেকে উঠে খোলা জানালার পাল্লাটা আরো ভালো করে বাইরের দিকে ঠেলে দিয়ে নিলুদার বাড়ির দিকে তাকাল অরি, জনা বিশেক লোক

উঠনে ভিড় করে, নিলুদা করিডোরে মাথা ঠেকিয়ে বসে, উঠনের সামনের রাস্তাটায় একটি এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে ।

ঘর থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে নীলুর বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে,পুলিশ ততক্ষণে বডি গাড়িতে তুলেছে।

অরি দেখল তার পরিচিত ইন্সপেক্টর দীপঙ্কর বাবু এসেছেন inspection এ। অরিত্রকে দেখে দীপঙ্কর বাবু এগিয়ে এসে বলল- কি অরিত্রদা বাড়ির পাশে এতবড়ো ঘটনা ঘটে গেল আপনি এতক্ষনে...!

অরি ততক্ষণে নিলুর পাশে গিয়ে বসে নিলুর হাতে হাতটা রেখে ইন্সপেক্টরকে উদ্দেশ্য করে বলল-

কি বুঝলেন ?

-সে রকম কিছু না।প্রাথমিক ধারণা তো সুইসাইড।

মোবাইলটা অরির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ইন্সপেক্টর বলল-দেখুন তো আপনি কিছু আন্দাজ করতে পারেন কি না ।

-মোবাইল খুললেন কি ভাবে ?

-No more privacy মনে হচ্ছে sms টা দেখানোর জন্যই খোলা রাখা হয়েছে ।

অরি হাত বাড়িয়ে মোবাইল নিয়ে sms টি পড়তে লাগল যা নিম্নরূপ-

||"মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় জানিনা,

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করলাম।

আমি দেখতে চাই মৃত্যুর পথ কতটা প্রসর,

আশাকরি মৃত্য তোমার থেকে বেশি কষ্টের হবে না,

আমি চললাম,তোমাকেও একদিন আসতে হবে "||

Sms টা পড়ার পর নিজেকে সামলাতে পারলনা অরি,

তড়িঘড়ি মোবাইলটা দীপংকর বাবুর হাতে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটলেন তিনি ।

অরি চলে যাওয়ার মিনিট দুয়েকের মধ্যে দীপঙ্কর বাবু বডি নিয়ে চলে গেলেন। ঘরে এসে নিজের ফোনে messenger খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ । কালকের সেই নম্বর থেকে আবার sms....

"আতঙ্কিত হবেন না মৃত্যুকে উপভোগ করুন"

 

পর্ব-৩

খুনির সন্ধানে

 

আজ অনেকদিন পর একা ছাদে বসে মদ খাচ্ছে অরি, রিয়াকে বলিয়ে বাজার থেকে নিয়ে আসা খাসির তেলের পাকোড়া সাথে । যদিও ডাঃ বলেছে এই বয়সে এই সব ইগনোর করতে, মনি প্রথমের দিকে খেতে দিতে চাইত না পরে অনেক কষ্টে তাকে মানিয়েছে অরি ।

ছাদের থেকে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই আলোচিত মেসেঞ্জার এর সাথে রিয়ার মৃত্যুর সম্পর্ক খুঁজতে লাগল সে । উকিল হওয়ার দৌলতে জীবনে অনেক কেস এর সমাধান করলেও আজ জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে এই ঘটনাটার কোনো কুল খুঁজে পাচ্ছে না সে ।।

বাবা আসবো.....!

মদের গ্লাসটা টেবিলে রেখে পিছনে তাকিয়ে অরি দেখল তনয় ।

-হুম আয় । অরি বলল ।

-আজ হঠাৎ,মন খারাপ নাকি । অরির সামনে থাকা টেবিলের ওপারের চেয়ারটায় বসতে বসতে বলল তনয়।

-না আজ হঠাৎ খেতে ইচ্ছে করল তাই ।

-খেতে ইচ্ছে করল নাকি পাপের প্রায়চিত্ত করার চেষ্টা করছ ।

-মানে । কি বলতে চাস । গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে বলল অরি ।

-বাবা তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমিও একজন উকিলের ছেলে । তোমার চোখ আজ মিথ্যা বলছে ।

-মিথ্যা বলছে মানে । কি বলতে চাস তুই , তুই তোর বাবাকে সন্দেহ করছিস ।

-অর্ধেক খাওয়া মদের গ্লাসটা  অরির নাগালের বাইরে  সরিয়ে তনয় বলল-স্মিতাকে তুমি চেনো ।

-চোখ গোল পাকিয়ে তনয়ের দিকে তাকিয়ে রইল অরি!

-স্মিতা তোমার মেয়ে বাবা আর আমার...! পুরো কথাটা শেষ করতে পারলনা তনয়।

বেশ বড়ো একটা নিশ্বাস নিয়ে অনেকটা উঁচু গলায় অরি বলল-

-মানে । কি বলছিস তুই , কে স্মিতা, কিসের মেয়ে ।

 

মদের গ্লাসটা অরির দিকে ঠেলে দিয়ে তনয় বলল-

মানুষ কতটা চরিত্রহীন হলে নিজের বোনের সাথে বেড shere করে বাবা ।

নিজেকে যথেষ্ট সামলে নিয়ে অরি বলল - কি হয়েছে খুলে বলবি ।

ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা চেয়ারে ছাড়তে ছাড়তে তনয় বলল-

তোমার প্রাক্তন বান্ধবী রিয়া অসুখে মরেনি বাবা, সে সুইসাইড করেছে তার কারণ তুমি ! তুমি হয়ত জানোনা বাবা তোমার প্রাক্তন বান্ধবী তোমার ২মাসের বেবি পেটে নিয়ে বিয়েতে বসেছিল- বিয়ের ছ-মাসের মাথায় সব জানা জানি হয়ে গেলে তোমার বান্ধবীকে শশুর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় । স্মিতার জন্ম হয় তোমার বান্ধবীর বাপের বাড়িতে,স্মিতার জন্মের 2 বছর পর ওর দাদু মারা যায়, আর তার 1 বছরের মাথায় মানসিক অবসাধে নিজেকে মেরে ফেলে তোমার বান্ধবী যে মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী বাবা ! তুমি একটা খুনি...এই বলে কাঁদতে শুরু করল তনয়।

মিনিট পাঁচেকের জন্য সব যেন অন্ধকার হয়ে আসল অরির চোখের সামনে, এক মুহূর্তে জীবনের সব হিসেব যেন গুলিয়ে ফেলল সে । এত বড় ভুল হয়েছে তার দ্বারা তনয় এসব জানল কি ভাবে কার কাছে....!

তুই মিথ্যা বলছিস না তো!-অরি বলল ।

- পৃথিবীটা গোল বাবা । হাজার মানুষের ভিড়েও আমরা মানুষ খুবই অল্প সংখ্যক । তুমি জানতে চাইবে না তোমার মেয়ে কোথায় তার সাথে আমার কি সম্পর্ক ।

- হ্যাঁ !

-নিলুদার মেয়ে বাবলিকে চেনো , ও তোমার মেয়ে ।

তোমার বান্ধবী মারা যাওয়ার পর নিলুদা ওকে দত্তক নেয় ।

অরি শুধু তাকিয়ে আছে তনয়ের দিকে তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে শুধু, যে অশ্রুর কোনো শব্দ নেই, অভিমানও নেই আছে অনেকগুলো আক্ষেপ ও হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা ।

চেয়ার থেকে উঠে ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে মুখটা বাইরের দিকে ঝুঁকে  অরি বলল-

আর বাবলি মানে স্মিতার বলতে পারো তোমার সেই মেয়ে মানে আমার বোনের সঙ্গে চার বছরের সম্পর্ক ছিল আমার ।

পিঠ ঘুরিয়ে দ্রুত হেঁটে অরির পায়ের কাছে মাথা গেড়ে তনয় বলল- আমি কি করব বাবা আমরা সব সত্যতা জানার পর নিজেদের ক্ষমা করতে পারিনি,তার পরেও বাবলি আমার সন্তানের মা হতে চায় -তাই আমি

বাবলিকে খুন করেছি বাবা, তোমার পঁচিশ বছর আগে করে আসা ভুলের শাস্তি আজ আমাদের পেতে হল, কারন আমি আমার বোনের সন্তানের বাবা হতে পারব না ।

বাবলির মোবাইলের sms গুলো আর আমাকে সেই numbar থেকে sms গুলো কে করে ছিল...

-আমি.....তনয় বলল-

- মানে ওই সুইসাইড sms গুলো তোর লেখা ।

- হুম বাবা সেই sms গুলোর অর্থ আর একটু পর নিজেই বুঝতে পারবে ।

-তাহলে আমাকে sms করেছিস কেন ।

-সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ।।

এই বলে টেবিলের উপর একটা ছোট্ট চিরকুট রেখে

তনয় আবার ছাদের কার্নিশের দিকে চলে গেল...

চিরকুটটা খুলে অরি পড়তে লাগল...

||"সব খুন খুন নয় বাবা । কিছু খুন প্রায়চিত্তও করে,

তুমি খুন করেছো আর আমি প্রায়চিত্ত করলাম।

তুমি মৃত্যুকে উপভোগ করো.... তোমার বান্ধবীর,তোমার মেয়ের আর তোমার............||

হঠাৎ ছাদ থেকে ভারী কিছু সজোরে নিজে পড়ার আওয়াজ পেল অরি,নিচে থেকে রিয়া চেঁচিয়ে উঠে কান্না শুরু করল---"ও মা গো এ কি সব্বনাশ হল গো আমার ।।


May 30, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯৫

Edit Posted by with No comments

May 29, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with 2 comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- সৌমিত সরকার

 

একটা সময় ছিল যখন এত ছুটোছুটি ছিল না। সারাদিনে কিছুক্ষণ সময় পাওয়াই যেত গল্পের বই নিয়ে বসার। এখনকার মতো নয়। এখন তো নিঃশ্বাস নেবার সময়ও হয় না, বসে বই পড়া তো দূরের কথা।

এখনকার বাচ্চারাও বই পড়ে, তবে তা ছাপার অক্ষরে নয়, ই-বুক হিসাবে, মোবাইলে।

এদের বইয়ের নেশা নেই বা পড়ার নেশা নেই এরকম ভাবা কিন্তু ভুল। এরা আমাদের থেকে অনেক বেশি পড়ে। ইন্টারনেটের দৌলতে এখন সারা পৃথিবীর সাহিত্য এদের হাতের মুঠোয়।

কিন্তু ভেবে দেখুন, জীবনে সব ক্ষেত্রেই কি এটা সত্যি নয়। নতুন আসে, পুরোনো সরে দাঁড়ায় তাকে জায়গা করে দেবার জন্য, তবেই তো জীবন এগিয়ে চলে। আমরা নিজেরাও, একসময় জীবন নিজেদের শর্তে বাঁচি, তারপর কোন এক সময় জীবনের হাল অন্য কারুর হাতে তুলে দিই, আর তারপর একদিন স্রোতের মুখে ভাসতে ভাসতে চলে যাই অজানার উদ্দেশ্যে। আমরা সরে যাই, তাই অন্য কেউ এগিয়ে আসতে পারে, সুযোগ পায় নিজের জীবন নিজের শর্তে বাঁচার চেষ্টা করার।

তাই তো একদিন পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা পাবার জন্যে লোকে কলকাতায় থাকা বন্ধুকে বলতো কিনে পাঠাতে, আর আজ সেই বন্ধুকেই বলে যে প্রয়োজনে অনলাইনে অর্ডার করে নিজেই তার কাছে পাঠিয়ে দেবে – দু’জনের মধ্যে যে যেখানেই থাকুক না কেন।

এ কথা অবশ্যই সত্যি যে দিন বদলেছে, সময় পাল্টেছে। লোকের হাতে এখন বসে বই পড়ার মত সময় নেই, তাই আজ ই-বুকের রমরমা।

আমাদের উত্তরবঙ্গে কোচবিহারের মতো প্রত্যন্ত জেলাতে কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী যুবক-যুবতী স্বপ্ন-উড়ানের স্পর্ধা দেখিয়ে নেটফড়িং এর মতন অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা প্রতি সপ্তাহে প্রকাশ করে চলেছে। এই পত্রিকার প্রতিটি লেখকের লেখনী পাঠক মহলে ভিন্ন স্বাদের আস্বাদন দেবেই। নেটফড়িং এমন একটি অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা যেখানে অণুগল্প, ধারাবাহিক গল্প, নানা স্বাদের কবিতা ও বিভিন্ন বইয়ের সম্বন্ধে সঠিক ধারণা পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, রয়েছে বিভিন্ন শিল্পীদের তোলা আলোক-চিত্র। তরুণদের স্পর্ধা দেখানোর সাহস জোগায় এই সাহিত্য পত্রিকা। আমি এক তরুণ লেখক, লেখালেখির চেষ্টা করছি আর কী? আজ আমার লেখা নেটফড়িং এর মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিভার সঠিক বিচ্ছুরণ ঘটাতে আমার মতো হাজারো তরুণ-কে পথ দেখাচ্ছে নেটফড়িং সাহিত্য পত্রিকা। আমার বিশ্বাস এভাবেই অনেকটা পথ পাড়ি দেবে নেটফড়িং। আমি নেটফড়িং এর সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করছি। আশা রাখছি আগামীদিনেও ঠিক একইভাবে পাঠক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করবে নেটফড়িং। এভাবেই এগিয়ে যাক নেট ফড়িং।


May 28, 2021

"আবার ফিরে এসেছি " - অনাদি মুখার্জি

Edit Posted by with No comments

 


আবার ফিরে এসেছি

অনাদি মুখার্জি

 

অয়ন অনেকদিন ধরে একটা বাড়ি কেনার সন্ধানে রয়েছে, শেষমেশ একটা পুরাতন ফ্ল্যাট বাড়ি পাওয়া গেলো ! কিন্তু এই নতুন বাড়িতে আসার পর থেকে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে লাগলো, যা কল্পনাও করা যায় না ! রাত হলে একটা মেয়ের কান্না আওয়াজ পাওয়া যায়, একদিন রাতে সবাই মিলে বসে খাওয়া-দাওয়া করছে, তখন বাথরুমের জল পড়ার শব্দ শুনতে পায়, সেই শব্দ শুনে অয়ন বাথরুমে গিয়ে দেখে কল থেকে জল পড়ছে না, তবে কোথা থেকে শব্দ এল ? তার পর ছাদে কে যেন আওয়াজ করে বলছে আমাকে সুখে থাকতে দিলি না সবাই কে শেষ করবো! অয়ন এইসব শুনে একটু ভয় পেলো ! অয়নের বৌ মালা বললো দেখো কেউ আছে ছাদে  গিয়ে দেখে এসো ! অয়ন তখন ছাদে গিয়ে দেখে কেউ নেই শুধু একটা ঠান্ডা হাওয়া স্রোত বয়ছে  এতে অয়নের সারা শরীরের একটা  কাঁটা দিয়ে উঠলো ! নিচে নামতে আবার সেই কান্নার আওয়াজ এলো ! অয়ন ভাবলো পাশের বাড়ি থেকে এই কান্নার আওয়াজ আসছে, ঠিক দুই দিন পরে আবার সেই একই ঘটনা তবে এই বার কান্নার আওয়াজ নয় বরং কে যেনো বাইরের দরজার ধাক্কা দিচ্ছে, এত রাতে কে এল? বলে অয়নবাবু একমাত্র ছেলে সমু দরজা টা খুলে দেখে কেউ নেই তার পর হঠাৎ দমকা হাওয়ায় সব কিছু, ঘরের জিনিস-পত্র উড়ে যেতে লাগলো ! এই দৃশ্য দেখে অয়ন ও তার বৌ খুব ভয় পেয়ে  চেঁচিয়ে বললো কে তুমি বলো ? কেন এমন করছো ? হাওয়া তখন থেমে গেল !

পরে আর এই রকম ঘটনা আর হয়নি বলে অয়ন সেই ব্যাপার টা নিয়ে মাথা ঘামালো না ! একদিন রাতের বেলায় সবাই ঘুমিয়ে আছে সেই সময় এক বিকট চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেলো অয়নবাবু ছেলে সমুর, সেই শুনতে পেলো কান্নার আওয়াজ সেই আওয়াজ শুনে বিছানা ছেড়ে ছাদে এল, ছাদে ঘুটঘুটে অন্ধকার কিছুই দেখা যাচ্ছে না, হঠাৎ একটা ছায়া চোখে পড়তেই বলে উঠলো কে ? ওপর দিকে তাকিয়ে দেখে একটা মেয়ে দড়িতে ওপরে ঝুলছে, তা দেখে সমু ভয় পেয়ে বললো কে তুমি ? কেন এমন ভয় দেখাচ্ছ? তখন ঐ ছায়াটা ঝুপ করে তার সামনে এসে পড়লো !

সমু দেখলো মেয়েটার পড়নে নীল রঙের শাড়ি, তার মুখ খানিকটা কেমন যেন থেতলে দেওয়ার মতো, চোখের থেকে যেন লাল রক্ত ঝরছে, এই দেখে খুব ভয়ে কাঁপতে লাগলো সমু, ভয়ে ভয়ে বললো কে তুমি ? কি চাও ? ওই মেয়েটা তখন খুব হাসতে লাগলো আর বললো তোরা কেউ থাকবি না, তুই এখুনি মরবি বলে লম্বা একটা হাত বের করে সমুর গলা চেপে ধরলো !

সমু বললো ছেড়ে দাও আমাকে আমি কি অন্যায় করেছি ? মেয়েটা সমানে বলে যাচ্ছে আমি ফিরে এসেছি আমাকে এখানে মেরে ফেলেছে ওরা বলে বিকট শব্দ করে বললো আমার ইচ্ছা পূরণ হয়নি তাই তোকে মরতে হবে, আমি তোকে নিয়ে যেতে এসেছি, এখানে কেউ থাকবে না বলে সমু-কে ছাদের ওপরে আঁছাড় মারলো !

পরেরদিন সকালে অয়নবাবু ও তার বৌ ছাদে গিয়ে দেখতে পায় সমুর লাশ পড়ে আছে, মুখে রক্তের দাগ ও কপালের মধ্যে রক্তে লেখা আছে ‘আমি ফিরে এসেছি, আমার নাম মালা’! সেই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো দু’জনে !

সেদিন এক প্রতিবেশীর কাছে জানতে পারে একটা ঘটনা !

অনেকদিন আগে এই বাড়িতে মালা ও তার বাবা-মা থাকতো, মালার বয়স ছিল আঠেরো বছর। সে একটা ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, সেই বিয়েটা মেনে নিতে পারেননি মালার বাবা ও মা ! একদিন মালার বর কে পায়েসের সাথে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেললো মালার বাবা ! মালা তখন জানতে পারে তার বর-কে মেরে ফেলেছে তখন মালার কি কান্না ! সে কাঁদতে কাঁদতে বললো আমার সুখ ছিনিয়ে নিয়ে ভালো করোনি এর পরিণতি খুব খারাপ হবে ! তখন মালাকে ওপরের ছাদে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে দিল, তখন মালা বললো আমি কাউকে ছাড়বো না, এই বাড়িতে সবাই-কে মেরে ফেলবো, বলে ছাদ থেকে ঝাপিয়ে আত্মহত্যা করলো ! তার কিছুদিন পর মালার বাবা ও মায়ের লাশ পাওয়া যায় এই ছাদের মধ্যেই ! সেই থেকে মালার আত্মা ঘুরে বেড়ায় ঐ ছাদের মধ্যে !

সবকিছু শুনে অয়ন ও তার বৌ বুঝতে পারলো যে ঐ মেয়েটার আত্মা তাদেরকেও শাস্তি দেবে। এই ভয়ে পরের দিন ঐ বাড়িটি ছেড়ে দিল, আগে যদি এই ঘটনা জানতো তবে তার একমাত্র ছেলেকে হারাতে হতো না। বিধির কি বিধান, কে করলো অপরাধ আর তার শাস্তি কে পেলো ! সেই থেকে ওই বাড়িতে কেউ আসে না, পরে এলাকার লোকেরা ওই বাড়ির নাম দিয়েছে ‘আবার ফিরে আসবো’! মাঝেমধ্যেই ওই বাড়ি থেকে একটা আওয়াজ শোনা যায়, ‘আমি ফিরে এসেছি’ !

 


"দিদিভাই ও নিগমদা" - সায়ন বণিক

Edit Posted by with No comments

 


দিদিভাই ও নিগমদা

সায়ন বণিক

 

পশ্চিমের সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পথে। বাড়ির ঠিক ডান পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী করলা। জলপাইগুড়ি শহরটাকে যেন ভাগ করে রেখেছে এই নদী। তাও, এখন অনেক ব্রিজ হয়েছে। বড়দের মুখে শোনা অনেক আগে নাকি এপার-ওপার করতে নৌকো বা ভেলা পার হয়ে যেতে হত। ছ-সাত বছর আগে সেরকম একটা বাড়ি-ঘর ছিল না, তখন মা-বাবার সাথে আসতাম মাসির বাড়ি। রাত্রি হলেই নদীটার দিকে তাকালে ভয় করত। মনে হত, এই বুঝি জলের ভেতর থেকে কেউ উঠে আসে।

ঘন্টাখানেক হল মাসির বাড়িতে এসেছি। ওরা কেউ বাড়িতে ছিল না। ব্যাগদুটো ভেতরে রেখে নদীর পাড়টাতে দাঁড়িয়ে আছি। অস্পষ্ট দৃষ্টিতে দেখে চলেছি নদীতে জামা-কাপড় কেঁচে নিয়ে বাঁশের মধ্যে শুকোতে দিচ্ছে তিনজন মহিলা। আমার সামনে দিয়ে দুটো গোরু কোনো খাবারের খোঁজে পাশ দিয়ে চলে গেল। সামনের লেবু গাছটাতে এখনও তেমনভাবে লেবু ধরেনি— মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক পাখি তাদের বাসার দিকে চলেছে।

"এই গুড্ডু! এলি কখন তুই?"— আমার পিছন থেকে দিদিভাই আচমকা এসে আমাকে বলল। আমার মাসির বড় মেয়ে 'অদ্রিজা', বাড়িতে সবাই 'আইভি' বলেই ডাকে। ওর সাথে আমার খুব ভালো একটা সম্পর্ক, ছোট থেকেই। বছর তিনেকের বড় যদিও, তবুও আমাদের মধ্যে সমস্তরকম কথাই আলোচনা হয়।

আমি বললাম, "এইতো, প্রায় একঘন্টার মত হলো দাঁড়িয়ে আছি। ভেবেছিলাম, হঠাৎ তোমাদের বাড়িতে এসে সারপ্রাইজ দিব। কিন্তু, নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেলাম।" বলে হাসতে লাগলাম। দিদিভাই-ও হাসা শুরু করে দিল।

"আসলে শিলিগুড়ি থেকে আমার আসার কথা ছিল কালকে, আমার কাজটাও শেষ হয়ে গেল তাড়াতাড়ি, তাই ভাবলাম আজই চলে আসি তোমাদের বাড়ি। কিন্তু, এসে দেখি তোমরা কেউই নেই।"

"বাড়িতে যখন দেখলি যে কেউ নেই, ফোন করলি না কেন আমাদের কাউকে?"

"করতেই গেছিলাম। মোবাইলটা অন করে দেখি কিছুক্ষণ আগেই রিচার্জটা শেষ হয়ে গেছে।"

মাসিরা দুই বোনকে নিয়ে গেছিল ব্যাডমিন্টন খেলাতে। কিছুদিন বাদে ওদের টুর্নামেন্ট আছে, তাই তাড়াতাড়ি চলে গেছিল আজ। ওর দুইবোন যমজ, ক্লাস সিক্সে পড়ে। খুব ছটফটে।

গেটটা খুলে ব্যাগদুটো হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম। ঘরটা কেমন নতুন-নতুন লাগছে। মেঝেয় টায়েলস্ দিয়েছে নতুন, ঘরের রঙটাও নতুন করেছে। আগে যখন এসেছিলাম, তার চেয়ে এখন বেশি ভালো লাগছে। জ্বলজ্বল করছে ঘরের দেওয়ালের সুন্দর রঙগুলো।

পাশের বাড়ি থেকে সন্ধ্যাবাতির আওয়াজ কানে আসছে। কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম মাসিরা বাড়ি ফিরে এল দুইবোনকে নিয়ে। তাদের সাথে আলাপ-গল্প করলাম অনেকক্ষণ। রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ হয়ে আসল। আমরা ঘুমোতে গেলাম।

দিদিভাই আর আমি প্রতিবারই আলাদা একটা ঘরে শুই। খুব মজা হয় ওর সাথে রাতের বেলাটা। আমি বললাম, "দিদিভাই, তোমাদের রিলেশনশিপের ব্যাপারে কিছু বলো না! আগের বার পুরোটা শোনার সময়ই ছিল না। এবার তোমায় প্রথম থেকে বলতে হবে।"

দিদিভাই মাথা নেড়ে "আচ্ছা" বলল।

মশারি টাঙানো খাটের উপরে। বাইরের দেওয়ালের হলুদ নাইট বালব্টার আলো কমে এসেছে। মাথার ওপরের পাখাটা ভনভন করে ঘুরে চলেছে। আমরা ছোট্ট একটা খাটে শুয়ে উপরের ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি, আর পাখার ঘরঘর আওয়াজটা শুনে চলেছি।

"সেবার আমি ক্লাস ইলিভেনে পড়ি। কলকাতায় গিয়েছিলাম একটা সায়েন্স এক্সিভিশনের জন্য। আমরা একটা মডেল তৈরি করেছিলাম, দুই বান্ধবী মিলে।

যাই হোক। অনেকে দেখতে এসেছিল আমাদের মডেল। একটা ছেলে এল আমাদের মডেল দেখার জন্য। বেশ সুন্দর চেহারা, দাঁড়িগুলো ঠিকমত ঘন ছিল না— অগোছালো ধরনের। চুলগুলো ছোট ছোট করে কাটা। একটা হাফ শার্ট, আর জিন্সের প্যান্ট পরা ছিল।

আমায় বলল, তোমরা কি বানিয়েছ একটু বুঝিয়ে বলো।

তার গলার মধ্যে একটা গম্ভীর ভাব ছিল। কিন্তু, তার মধ্যেও কোথায় যেন একটা মিষ্টতা লুকিয়ে ছিল। তার চেহারা আর গলার আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম যে, বয়স কুড়ি-একুশের মাঝামাঝি।"

"কি সুন্দর রোমান্টিক গো তোমরা। আমার তো দারুণ লাগছে। তারপর?" আমি বললাম।

দিদিভাই লজ্জা পেয়ে হাসল। বলল, "আমি ওর নাম জিজ্ঞেস করলাম, ও বলল নিগম সরকার। কোনখান থেকে এসেছো জিজ্ঞাস করতেই, আমার মনটা প্রফুল্লিত হয়ে উঠল। ও বলল যে জলপাইগুড়ি থেকে এসেছে।

আমি বললাম, তুমি জলপাইগুড়ি থেকে এসেছ? আমিও তো জলপাইগুড়িতেই থাকি।

—তাই নাকি? কোন জায়গায় থাকো জলপাইগুড়ির?

আমি ওর গম্ভীরভাবটা কাটিয়ে এতক্ষণে হাসি দেখতে পারলাম। কত সুন্দর করে সাজানো ওর দাঁতগুলো..."

"আরে হ্যাঁ, বুঝেছি। নিগমদাকে আমিও ভালোমতই দেখেছি।" আমি দিদিভাইয়ের কোথায় লজ্জা পেয়ে আটকে দিলাম।

"কেনো গুড্ডুভাই, খুব তো বলে চলেছিস আমাদের কথা শুনবি, এখন যখন বিস্তারিত বলছি তখন লজ্জা লাগছে?" আমাকে বলে নিয়ে দিদিভাই খিলখিল করে কোলবালিশটা জড়িয়ে হাসতে লাগল।

"তারপর, তোর নিগমদাকে সমস্ত কথা বলল আমায়। ও শুনলাম সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে, ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে।

ওকে তারপর চলে যেতে লাগল। কোনো দায়িত্বে ছিল বোধহয়, তার জন্যেই ভিজিটিং-এ এসেছিল।"

ওর চলে যাওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ ধরে একটা চিন্তা করতে থাকলাম। জানি না কেন ! আগেও তো অনেকের সাথে কথা বলেছি— আগে তো মনের ভেতরটা ওরকম হতে কখনও দেখিনি।"

বাইরের হাওয়াটা একটু জোরে বইছে। আমি নীচে নেমে পাখার স্পিডটা কমিয়ে আসলাম। পাশের ঘর থেকে সবার নাক ডাকার শব্দ কানে আসছে। টেবিলের ওপর রাখা বোতলটা থেকে জল খেয়ে বিছানায় ঢুকে বললাম, "তারপরে কি হলো দিদিভাই? তুমি তো ওর নম্বর নিলে না, তবে?" মশারিটা গুঁজতে গুঁজতে আমি বললাম।

দিদিভাই আমার দিকে পাশ ঘুরে বলল, "ভাগ্যে থাকলে যা হয়।

আমরা যথারীতি জলপাইগুড়ি চলে এসেছিলাম। এক সপ্তাহ, দু-সপ্তাহ এই করে একটা মাস কেটে গেল।

একদিন, আমরা বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে বেরিয়েছি রাজবাড়ী পার্কে। আমরা সবাই যে-যার মত গল্প করছিলাম, কেউ বা ওদের বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুরতে এসেছিল।

দূর থেকে আমি লক্ষ করলাম, সেই ছেলেটা ! কাছে এগিয়ে আসতেই ঝাপসা ভাবটা কাটিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম সেই ছেলেটাই। যাকে আমি কলকাতায় দেখেছিলাম, ও আমার মডেল দেখবার জন্য এসেছিল। আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে বললাম, তুমি নিগম না?

ও বলল, হ্যাঁ।

রাজবাড়ী পার্ক। চারিদিকে লোকজনেরা বসে রয়েছে। ছোট-ছোট বাচ্চারা খেলছে, কেউবা দৌড়াদৌড়ি করছে। আমার বান্ধবীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে। ও কি করল জানিস?"

আমি উৎসাহের সঙ্গে জানতে চাইলাম, "কী করল?"

"আমাকে সবার মাঝে প্রপোজ করে বসল"

"কী...?" আমি হাসব না লজ্জা পাবো, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। "তারপর?"

"তারপর আর কি, আমাকে সবার সামনে হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করল। তাও আবার, পাশের গাছ থেকে একটা ফুল ছিঁড়ে।

সেই ফুলটা আমার কাছে এখনও আছে। ডায়েরীর ভেতর রাখা।"

"আমায় দেখিও কিন্তু দিদিভাই। যাই হোক, পরে?"

"আমায় তো সবার সামনে প্রপোজ করে বসল। আর আমি মুখে হাত দিয়ে লজ্জায় হাসছিলাম।

আমি ওর কাছ থেকে ফুলটা নিলাম। আমি ওকে বললাম, আমি ভেবে নিয়ে তোমায় জানাব।

যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। সারাটা সন্ধ্যা ওর কথা ভেবে রাত্রিবেলা মা-র ট্যাবটা হাতে নিলাম। হোয়াটস্অ্যাপটা খুলে ওর নম্বরটা সেভ করে, হাই লিখে পাঠালাম।"

"তুমি ওর নম্বরটা কীভাবে পেলে?"

"আমি তখনই ওর নম্বরটা নিয়েছিলাম। বলেছিলাম যে, তোমার নম্বরটা আমায় দিয়ে দাও বাড়িতে গিয়ে ভেবে বলবো।

ব্যাস ! সারাটা রাত ভাববার পরে আমি ওকে হ্যাঁ বলে দিলাম।"

ঘড়ির কাঁটার আওয়াজটা আসতে আসতে তীক্ষ্ণ হয়ে আসছে। বাইরে হাওয়াটা এতক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। রাত্রি দুটো বাজে তাকিয়ে দেখলাম। দিদিভাই-এর গল্প শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, বুঝিনি।

সকালের পাখিদের ডাকে ঘুমটা ভেঙে গেল। দুটো সপ্তাহ জলপাইগুড়িতে কাটিয়ে আমি নিজের বাড়ি চলে আসলাম।

নিগমদা-র সাথে কথা বলে আমার খুব মজা লাগে। এত সুন্দর ওদের লাভ স্টোরি, এত সুন্দর ওদের মজাদার কথাবার্তা।

আগের বছর যখন ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, দিদিভাই আমাকে নিয়ে বের হত ওর সাথে দেখা করবার জন্য। আমি দূর থেকে লক্ষ করতাম, ওরা হাঁটছে— দু’জনে গল্প করছে।

ওরা একে অপরকে এতটা ভালোবাসে, যে বলাই বাহুল্য।

আমি ওদের সবসময় একসাথে দেখতে চাই, ওরা যেন পরক্ষণেও আলাদা না হয়ে থাকে। এসব আমি দূর থেকে লক্ষ করতাম।

একদিন তো দুজনকেই বলে বসেছিলাম, এই তোমরা বিয়েটা কবে করছ গো?

দুজনেই লজ্জা পেয়ে গেছিল। নিগমদা বলল, আমার তো কোনো ব্যাপার না রে, আমার এখন চাকরিটাও হয়ে গেছে, মা-ও সমস্ত কথা জানে। খালি বাবাকেই...ওই আর কি ! তোর দিদিকে বল—

দিদিভাই বলে যে, এখন তো আমি তোর সাথে বিয়ে করছিই না— গান্ডু কোথাকার !

দিদিভাই, নিগমদার সাথে বহু জায়গায় ঘুরতে গেছি একসঙ্গে। 'ডমিনোস্', 'গল্প'— বড় বড় রেস্টুরেন্টে। তাছাড়াও, তিস্তা স্পারে তো আমরা প্রায়শই আড্ডা দিতাম। ওখানে 'টাওয়ার' বলে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, নদীর চরের মধ্যে। খুব সুন্দর করে সাজানো নদীর ওপরের ছোট্ট রেস্টুরেন্টটা।

দিদিভাই আর নিগমদার মধ্যে কথাকাটাকাটি খুবই কম হত। বড়জোর একটা দিন, বা একটা রাত্রি। সকালে উঠেই আবার তারা এক হয়ে যেত। এমনভাবে তারা পরের দিন বা নতুন দিনটিকে শুরু করত, যেন তাদের কোনো ঝগড়ার কথাই মনে থাকত না।

প্রতিটা বছরই ভ্যালেন্টাইনস্ ডে তে দুজন দুজনের হোয়াটস্অ্যাপে স্ট্যাটাস দেয়। খুব সুন্দর লাগে সেইগুলো পড়তে, আর একসাথে তোলা ওদের ছবি দেখতে। ওরা বাড়ির সমস্যার জন্য দেখা না করতে পারলেও ফোন কল, ভিডিও কলের মধ্যে দিয়ে তারা একে অপরকে ভালোবাসার বার্তা জানাতো।

ভ্যালেন্টাইনস্ ডে-র ঠিক চার-পাঁচ দিন পর, আমার ফোন একটা মেসেজ এল। হোয়াটস্অ্যাপটা খুলে চেক করতেই দেখলাম দিদিভাই লিখেছে, "গুড্ডু, আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা আর নেই রে!"

আমি ভাবলাম আমার সাথে মজা করছে। আমিও হাসির ইমোজি সেন্ড করলাম, কিন্তু কোনো রিপ্লাই আসল না। আমি সত্যিটা জানার জন্য নিগমদাকে মেসেজ করলাম, তার কাছ থেকেও একই উত্তর এল।

কিছুক্ষণের জন্য চোখ বড়ো হয়ে মুখে হাত চলে গেছিল। হৃৎপিণ্ডের শব্দটা যেন নিজের কানে শোনা যাচ্ছিল। আমি স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম। আমার নিজের হাত-পা কাঁপা শুরু হয়ে গেছিল।

আমার চোখে দেখা সবচেয়ে ভালো জুটি কেউ দেখতে চাইলে, আমি সোজাসুজি ওদের নাম বলে দিতাম। আর, এটা সত্যিই অসম্ভব যে ওদের আলাদা হয়ে যাওয়াটা।

আমি দু’জনের সাথে কথা বলে যতটুকু বুঝতে পারলাম, ওদের আলাদা হয়ে যাওয়াটা বা থাকাটা কোনো স্বাভাবিক ব্যাপারে নয়। বরং, সাময়িক আনন্দের জন্য তাদের আলাদা হয়ে যেতে লাগলো।

দিদিভাই আর নিগমদা জলপাইগুড়িতে দেখা করা সত্ত্বেও, শিলিগুড়িতে দেখা করত। কিন্তু, শিলিগুড়িতে দেখা করার উদ্দেশ্যটা একটু আলাদা ছিল। আর সেই উদ্দেশ্যের জন্যই হয়তো তাদের সম্পর্কটা আজ বিচ্ছিন্ন।

সেবার, শিলিগুড়িতে ওরা দু’জন দেখা করে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। ওরা অন্ধকার ঘরে, ভালোবাসায় ভেসে গেছে। ওরা যৌনতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, তিন বছর আগের নতুন যৌবন আবার ফিরে পেতে চেয়েছে।

ওরা কোনো খারাপ করেনি। ওরা প্রাপ্তবয়স্ক। ওদের স্বাধীনতা, নিজের চাওয়া-পাওয়া, মন, ইচ্ছা, আনন্দ বলেও কিছু একটা আছে। কিন্তু হ্যাঁ, বিশ্বাস হারিয়ে গেলে পাওয়াটা খুব কঠিন হয়ে যায়।

আর ঠিক, সেরকমটাই হল ওদের সঙ্গে। কোনরকমভাবে নিগমদার মা জেনে গেছিল, সঙ্গে ওর বাবা-ও। আর, তারপরেই তৈরি হলো ওদের মধ্যে ভাঙনের বাঁধ। যেই মা নিজের ছেলেকে এবং সঙ্গে দিদিভাইকেও এতটা বিশ্বাস করেছিল, সেও কিনা আজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাল ছেড়ে দিল !

সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছিল, নিগমদা-র বাবা। তিনি যেমনভাবে প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্তে কথা শুনিয়ে যেত, ওর বেঁচে থাকাটাও যেন দায় হয়ে উঠেছিল। শেষমুহূর্তে, দু’জনেই একসাথে ভালোভাবে কথা বলে নিয়ে সম্পর্কের দড়িটা কাঁচি দিয়ে কেটে দিল। দু’জনের মুখেই হাসি— দুজনেরই একই মন্তব্য, 'তুমিই আমার প্রথম ভালোবাসা এবং সারাটা জীবন এভাবেই থেকে যাবে। সত্যিটা এটাই যে, ভালোবাসা কাকে বলে এই তিনটা বছরে আমরা বুঝেছিলাম— আর এটাও ঠিক যে, তুমিই প্রথম তুমিই শেষ।'

তাদের দুজনের কথার ভাঁজটাও একইরকম— ওরা আজও প্রতিটা রাতে নিজের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে দেয়। একাকীত্ব বোধ করে ওরা দুজনে। ওরা নিজেরাও জানে না যে, তাদের পরবর্তীতে আদৌ মিলন হবে কিনা !


May 26, 2021

"বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন" - অগ্নিমিত্র

Edit Posted by with No comments

 


বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন

অগ্নিমিত্র

 

ছোটবেলা থেকেই বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন আমার খুব ভালো লাগে। আমি এই ধর্মের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পাই। কোনো ধর্মকে ছোট না করেই এ কথা বলছি।

কলকাতার ঢাকুরিয়া লেকের পাশে জাপানী বুদ্ধমন্দিরে মাঝে মাঝেই চলে যেতাম ছোটবেলায়। সেখানকার পরিবেশ আমার খুব ভালো লাগতো। এরকম আরো পাঁচটি বৌদ্ধ মন্দির আছে কলকাতায়।

বৌদ্ধ ধর্ম শান্তি, অহিংসা ও সত্যের প্রতীক। যদিও এই ধর্মেও হীনযান ও মহাযান, এই দুই ধারা রয়েছে। ধারা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত। বেশির ভাগ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত মানুষই মহাযান ধারা মেনে চলেন। রয়েছে তন্ত্রমন্ত্রের প্রভাব। গেলুকপা, লোটাস সূত্র প্রভৃতি আরো উপধারা আছে। যদিও গৌতম বুদ্ধ এই সব বলে যাননি। তিনি কামনা বাসনা ত্যাগ করে 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ' ধরে চলতে বলেছিলেন। গৃহীদের বলেছিলেন জীবনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে।

দুনিয়ায় বৌদ্ধধর্মের গেলুকপা ধারার প্রধান দলাই লামা।

আজকের এই সমস্যাবহুল জীবনে বুদ্ধের এই বাণী বিশেষ দরকার। এতে মন সুস্থিত থাকবে। আর কোনো ধর্মের ভালো কিছু নিলে কোনো লজ্জা নেই।।


May 23, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯৪

Edit Posted by with No comments

May 22, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with No comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- অনৈতা রক্ষিত

 

বেশিদিন আগের কথা নয়। গুরুতরভাবে মন, শরীর সব জখম হয়ে পড়ে আছি। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ার মতো নেট ফড়িং কোত্থেকে যেনো উড়ে এল। আমার মৃতপ্রায় মানুষকে এভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হবে আমি কোনদিন ভাবিনি। ভাবনা চিন্তা ধীরে ধীরে আরো বিস্তৃতি পেলো, চলতে চলতে আরো অনেক বলতে শিখলাম, জানতে শিখলাম। প্রত্যেকটা মুহূর্তে নিজের সৃষ্টিগুলো পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার অনুপ্রেরণা পেলাম। সবমিলিয়ে ভালোবাসা দিয়ে আমাকে নতুন 'আমি' করে তুলেছে নেট ফড়িং। নেট ফড়িং এর জন্যে রইলো একরাশ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

May 20, 2021

"শুধু তুমি আর আমি" - অনাদি মুখার্জি

Edit Posted by with No comments

 


শুধু তুমি আর আমি

অনাদি মুখার্জি

 

মেঘনা ঠিক করেছে আজ বিয়েবাড়িতে শাড়ি পড়ে যাবে। দ‍রজা লাগিয়ে সেই দুই ঘন্টা ধরে শাড়িটা খুলছে আর পড়ছে ! কিছুতেই শাড়িটা ঠিক মতো গুছিয়ে পড়তে পারছে না, শেষে বিরক্ত হয়ে বলে- ‘ধুর !’

এমন সময় শুভ দরজা ঠেলে ভেতরে এসে বললো- ‘কি হল মেঘনা? এখনও তুমি রেডি হওনি ?’

মেঘনা বললো- ‘এই শাড়িটা কিছুতেই গোছ করে পড়তে পারছি না !’

সেই কথা শুনে শুভ খুব হাসতে লাগলো, মেঘনা শুভর মুখের হাসি দেখে বললো- ‘শয়তান, বলেই তার মুখের উপর শাড়িটা ছুড়ে বললো- যাও তুমি একা, আমি যাবো না।’ শুভ তার কাছে এসে বললো- ‘মেয়েদের আসল রুপ শাড়িতেই প্রকাশ পায়। নাও তুমি পড়ে নাও আমি দেখিয়ে দিচ্ছি !’

মেঘনা আবার শাড়িটা পড়লো তা দেখে শুভ বললো- ‘এমন করে কেউ শাড়ি পড়ে ? খোলো আমি তোমাকে পড়িয়ে দিচ্ছি।’ বলে শুভ বেশ সুন্দর করে তাকে শাড়িটা পড়িয়ে দিল। তা দেখে মেঘনা শুভর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললো- ‘তুমি তো দেখি সব কিছুই জানো।’

শুভ মেঘনাকে কাছে টেনে জড়িয়ে বললো- ‘হুম গো !’ মেঘনা বললো- ‘ছাড়ো চলো, বিয়ে বাড়িতে দেরি হচ্ছে না?’ তারা যখন বিয়েবাড়িতে এসে খেতে বসলো, মেঘনার দুই হাতে মেহেন্দি লাগানো। তাই সে খেতে পারছে না ! শুভ তখন তাকে খাইয়ে দিতে লাগলো, সেই সময় টুম্পা বলে উঠলো- ‘এই মেঘনা তোর কি ভাগ্য ভাল, তোর বর তোকে খাইয়ে দিচ্ছে !’

রাতেরবেলায় যখন তারা বাড়ি এল তখন শুভ মেঘনাকে বললো-‘দাও তোমার শাড়িটা খুলে দিই।’ তা শুনে মেঘনা বললো- ‘তুমি খুব দুষ্টু। এক নম্বর !’ শুভ বললো- ‘কেনো গো?’ মেঘনা মুচকি হাসি দিয়ে বললো- ‘সবসময় তুমি আমার খুলে দেখতে চাও তাই না? খুবই দুষ্টু তুমি !’ শুভ তখন মেঘনা কে বললো- ‘জেনে রাখো তুমি আমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছো, তোমার সব কিছুই আমার, আমি দেখবো না তো কে দেখবে?’ শুভ মেঘনাকে বললো- ‘জানো আমাদের বিয়ের আগে যেদিন তুমি খুব বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিলে ! সেই দিন তোমার পোশাক খুলে আমার জামাটা তোমাকে পড়তে দিয়েছিলাম !’ মেঘনা বললো জানি- ‘তুমি তখন দুষ্টু চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিলে ! এই, তোমার এই কথাটা মনে আছে?  যেদিন তোমার বাবা মারা যায় হাসপাতালে, সেদিন তোমার সাথে সারারাত আমি হাসপাতালে ছিলাম তোমার পাশে ! পরেরদিন তোমার মন খুব খারাপ ছিল সেই সময় আমি তোমার পাশে সারাদিন বসেছিলাম !’

‘জানি’ বলে শুভ মেঘনাকে বুকে মধ্যে টেনে বললো- ‘তুমি আমার আর আমি তোমার ! তুমি যদি মেঘ হয়ে ওঠো আমি হবো বৃষ্টি।’ বলে একটি চুমু খেতে চাইলো, মেঘনা বললো- ‘এই অসভ্য আজ ছাড়ো ঘুমাতে চলো !’ বিছানায় শুয়ে শুভ ঘুমিয়ে পড়লো শান্ত ছেলের মতো। মেঘনা তার পাশে শুয়ে দেখছে শুভকে ! আর ভাবছে শুভ তুমি শুধু আমার ! আমি খেলে তুমি খাবে, আমি হাসলে তার কারণ তুমি হবে ! তোমার খুশিতে আমি সুখি ! আজ জানো শাড়ি কেন পড়লাম ? শুধু তোমার জন্যই ! তুমি শুধু আমার।


May 19, 2021

"হারানো সম্পর্ক" - অ্যস্ত্রিক্স

Edit Posted by with No comments

 


হারানো সম্পর্ক

অ্যস্ত্রিক্স

 

আজ থেকে ঠিক দুই মাস আগে আমার আর আমার স্ত্রীর ডিভোর্স এর জন্য কোর্টে হাজির হওয়ার তারিখ ছিল। কিন্তু এই লকডাউনের দৌলতে কোর্ট-কাছারি তো সবই বন্ধ, তাই আর হলো না। কবে যে সব ঠিক হবে আর কবেই যে এই ঘরবন্দি থাকার থেকে নিস্তার পাবো, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।

আমি একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবী, বাড়ি কলকাতাতেই তবে কাজের সূত্রে থাকতে হয় নয়ডাতে। আমি আর আমার বউ, বিবাহিত প্রায় আট বছর, আমাদের একটা মেয়েও আছে, তিন্নি, এবার জুলাইতে পাঁচ বছর পূর্ণ হবে তার। তিন্নি আর ওর মা কলকাতাতেই থাকে। আসলে তিন্নির মা, মানে আমার স্ত্রী ঋতিকা, একটা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। আমার আর ওর কিন্তু লাভ ম্যারেজ হয়েছিল, তবে সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসা বা ওই লাভটা যেন হারিয়ে গেছে কোথাও। কলেজেই পরিচয় আমাদের। আমি অন্তিম স্নাতকের ছাত্র আর ওর প্রথম বৎসর। সম্পর্কটা গড়ে ওঠে খুব কম সময়েই। বিয়েটা একটু দেরিতেই হয় আমাদের। এমনি কোনো রোমাঞ্চকর গল্প নেই এর পেছনে, ওই দু’জনের পড়াশোনা শেষ করে, চাকরিতে ঢুকে নিজেদের একটু স্থায়ী করে তারপর বিয়েটা করি। ওই ধরুন বিয়ের আগে পাঁচ বছরের সম্পর্ক। ওর বাড়িও কলকাতাতেই। আমি ওই দক্ষিণ দিকে থাকতাম আর ওর বাড়ি পশ্চিম দিকে। বিয়ের পর চার বছর আমরা একসাথেই থাকতাম, আমাদের কলকাতার বাড়িতেই। ও তখনও ওই স্কুলেই চাকরি করতো আর আমি অন্য একটা বেসরকারি কোম্পানিতেই ছিলাম। বিয়ের তিন বছর পর তিন্নি এলো। আমরা খুবই খুশি ছিলাম। আমার মা-বাবা, আমি, ঋতিকা আর আমাদের পরিবারের ছোটো সদস্য তিন্নি, এটাই আমাদের সংসার ছিলো। এক সাথে বেশ ভালোই কেটেছে চারটে বছর। তারপর একটা অফার পাই আমি ব্যাঙ্গালোর থেকে, ভালো মাইনে ছিল, তাই ঠিক করি যে এই কাজেই যোগ দেবো।

একটা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি। পড়াশোনাতে আগাগোড়া ভালো ছিলাম তাই একটা সংকল্প ছিলো, যে অনেক টাকা উপার্জন করবো। তাই একটু ভালো থাকার আর সবাই কে ভালো রাখার চেষ্টায় ঋতিকা আর এক বছরের তিন্নিকে বাবা-মার সাথে ছেড়ে চলে যাই ব্যাঙ্গালোর। ভেবেছিলাম ঠিক ঠাক ভাবে সব চললে, সবাই কে নিয়ে আসবো কলকাতা থেকে এখানেই। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো সবাইকে ছেড়ে একা একা থাকতে। আর প্রথম ছয় মাস কোনো ছুটিও দেয়নি যে বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসবো। কলকাতা থেকে কারো ব্যাঙ্গালোরে আমার সাথে দেখা করতে যাওয়াও সম্ভব হতো না কারণ ঋতিকার চাকরি ছিলো তারপর তিন্নিও ছোটো আর সাথে মা-বাবাকেও একা ফেলে আসা সম্ভব ছিল না। যাই হোক, ছয় মাস পর যাই আমি বাড়িতে, তখন সবাই খুব খুশি, প্রথমবার বাড়ির থেকে এতদূর এতদিন ধরে থেকে এলাম। দশ দিনের ছুটি কাটিয়ে আবার ফিরে যাই। এভাবেই বছর কেটে যায় আর মাঝে এক দু’বার এসেছিলাম বাড়ি। তারপর ব্যাঙ্গালোরে দেড় বছর চাকরিটা করার পর নয়ডাতে বর্তমান প্রতিষ্ঠানটাতে যোগ দেই। এক বছর পর বাড়িতে বলি সবাই মিলে আমার এখানে চলে আসতে, তবে বাবা আর ঋতিকা কেউ রাজি হয়নি, যদিও মা চেয়েছিল আসতে। তারপর তিন্নিও স্কুলে ভর্তি হয়। ব্যাস কাউকেই আনা হয়নি আমার ওখানে, মাঝে ঘুরতে এসেছে কয়েকবার ঠিকই। আমিও বাড়ি আসতাম মাঝে মাঝে তবে সময়ের সাথে সাথে যাওয়া আসাটাও কমে গেছে। যেখানে থাকি আর যেমন স্তরে আমার কাজ, সেই জাকজমকে নিজের জীবনটা সাজিয়ে নিয়েছিলাম। আর কাজের চাপও বাড়তে থাকে আস্তে আস্তে। ঋতিকার সাথে ফোনে কথা বলাটাও কমে গেছিলো। আগে দিনে দু-একবার ফোন তো হতই, সবার সাথে কথা বলার জন্য আর সময় পেলেই ঋতিকাকে ফোন করে কিছুক্ষণ কথা বলে নিতাম। এখন তো সেসব কিছুই কমে গেছে। হয়ত দু’দিনে একবার ফোন করতাম আর ওটাতেই সবার সাথে কথা আর মাঝে মাঝে তো সেটাও করা হয়ে ওঠে না। তবে হ্যাঁ তিন্নি ফোন করলে আমার কথা বলতেই হতো।

আস্তে আস্তে সময় পেরিয়ে যাচ্ছিলো আর আমি দূরে সরে আসছিলাম ঋতিকার থেকে। কেমন যেন একটা বিরক্তি এসে পরেছিল। এমন না যে আমি অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পরে ছিলাম তবে এই সম্পর্কটাও এখন বাঁধন মনে হচ্ছিলো। আর এক সাথেও তো থাকা সম্ভব হচ্ছিলো না। ও আমার কাছে এসে থাকতে রাজি না নিজের চাকরি ছেড়ে আর আমার কাছেও কোনো উপায় নেই কলকাতা তে স্থায়ী ভাবে থাকার। তাই ভাবলাম বিবাহটা ভেঙ্গে দেওয়াটাই উচিত হবে। তাই বললাম একদিন ফোনেই ওকে। জিজ্ঞেস করলো "কেন, হঠাৎ কি হলো যে এতো বড়ো পদক্ষেপ?" বুঝিয়ে বললাম সব কারণ। জিজ্ঞেস করলো "বাবা-মা আর তিন্নির কি হবে?" তখন এই প্রশ্নটার উত্তর ছিলো না আমার কাছে। আসলে অতদুর ভাবিনি তখনও তাই বললাম "সে নয় একটা কোনো উপায় করা যাবে।" তখন ও বললো "ঠিক আছে আগে সব ভেবে নাও তারপর জানিও, আমারও একটু সময় চাই ভাবতে।" আমার মন বদলানোর চেষ্টা ও করেনি ঠিকই তবে ওর গলার আওয়াজটা এবার একটু ভাঙ্গা ভাঙ্গা হলো, বুঝলাম হয়েতো চোখ দিয়ে ওর জল পড়ছে, মনটা খারাপ হয়েছে কিন্তু বুঝতে দিচ্ছে না আমায়।

তিন দিন ভেবে একটা নির্ণয় নিয়ে ফোনে কথা বললাম ঋতিকার সাথে। জানালাম ওকে যে ডিভোর্সের পর বাবা-মাকে আমি নিয়ে আসবো আমার কাছে নয়ডাতে আর রইলো তিন্নির কথা, সে নয় ওর সাথেই থাকবে আর বললাম যে ও চাইলে আমাদের কলকাতার বাড়িতেই থাকতে পারে, মাঝে মাঝে তিন্নি কে দেখতে আসবো কলকাতা তে। আসলে ওই বাড়িতে বিয়ে হয়ে এসেছিলো প্রথম, এতো বছর ওই বাড়িতেই কাটিয়েছে, একটা আলাদা মায়া তে জড়িয়ে পড়েছে তাই আর আলাদা করতে চাইলাম না। সব চুপ করে শুনে উত্তর দিলো "সবই তো শুনলাম, তোমার ইচ্ছে মতনই হোক সব শুধু আমার একটা অনুরোধ আছে, সেটা রাখা গেলে ভালো হতো।" আমি জিজ্ঞেস করলাম "বলো কি চাও? চেষ্টা করবো যথাসাধ্য।" ও বললো "বাড়িটা তুমি রেখে নিও, আমি ভাড়া বাড়ি নিয়ে খরচা চালিয়ে নেবো, শুধু বাবা-মা কে আমার সাথে থাকতে দাও।" আমি শুনে অবাক হলাম, জিজ্ঞেস করলাম "এটা আবার কি ধরনের আর্জি হলো? আমার বাবা-মা তোমার সাথে কেনই বা থাকবেন ?" তখন ও বললো "আজ আমাদের বিয়ে ভেঙ্গে দিচ্ছ তুমি, বুঝতে পারছি সেটাতে তোমার অধিকার হতেই পারে। তবে গত ১২-১৩ বছর ধরে আমার বাবা-মার সমান স্থানেই এই দু’জন মানুষকে রেখেছি আর আমার বাবা-মা চলে যাওয়ার পর, এই দুটি মানুষ কে জড়িয়ে আছি আমি। আমার কি এই মানুষগুলো, এই সম্পর্কগুলোর ওপরে কোনো অধিকার নেই?" শুনলাম ওর কথাগুলো, কিছুটা বোঝার চেষ্টাও করলাম তবে মা-বাবাকে ওর কাছে দিতে পারলাম না। তাই বলে দিলাম "না এটা সম্ভব না।" তখন ও বলে উঠলো "তবে এই ডিভোর্সটাও সম্ভব না।" আর ফোনটা রেখে দিলো। মা বাবা অথবা তিন্নি কেউই এই সবের বিষয়ে জানতো না। জানাইনি কারণ বাবা-মার শরীরটা ঠিক থাকে না, তাই অযথা চিন্তায় ফেলতে চাইনা আর তিন্নি তো ছোটো, বুঝবেই বা কি ! যাই হোক, আরো এক-দুইবার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম তবে ও আর মানলো না তাই নিজের আইনজীবীকে দিয়ে ওর কাছে কাগজ পাঠালাম ডিভোর্সের, সই করেনি তাই শেষমেষ কেসটা উঠলো কোর্টে। আর সেই সূত্রেই এলাম কলকাতা আর ব্যাস আটকে পরলাম এই লকডাউনে।

জানি এই লকডাউনটা জরুরি ছিলো খুবই, মানুষ-কে সুস্থ রাখতে, ভালো রাখতে। তবে আমার জন্য যেন এটা একটা বিরক্তিকর দন্ড ছিলো, বন্দী হয়ে গেছিলাম সেই মানুষটার সাথে যার থেকে আলাদা হওয়ার জন্যই আমার এখানে আসা। খুব বিরক্ত লাগতো, সারাদিন তাকে চোখের সামনে দেখতে, তবে তিন্নিকে সারাক্ষণ কাছে পেতাম তাই সহ্য হয়ে যেত এসব। আর বাড়িতে খুব একটা কাজও ছিলো না, সারাদিন ওই মোবাইল, ল্যাপটপ আর মেইল চেক, মাঝে মাঝে ছাঁদে গিয়ে ফুল গাছগুলোকে একটু জল দিতাম আর একটুআধটু বাড়ির কাজ করতাম ব্যাস। এভাবেই দিন কাটছিলো, হঠাৎ একদিন ঘুম ভাঙ্গলো একটা চিৎকারের আওয়াজ শুনে, দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি ঋতিকা পরে আছে সিড়ির শেষে। তারাহুরো করে গেলাম ওর কাছে, বুঝতে পারলাম ভালোই চোট পেয়েছে বাম পায়ে আর ডান হাতটাতে। হেঁটে যাওয়ার অবস্থায় ছিল না, তাই আমি কোলে করেই নিয়ে গেলাম ওকে ওর ঘরে। ডাক্তার ডাকলাম, আমার বন্ধুই ছিলো সে, আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক। এলো দিব্যেন্দু আধা ঘন্টার মধ্যেই। দেখেই বললো এক্সরে আর কিছু পরীক্ষা করাতে। নিয়ে গেলাম আমি আর দিব্যেন্দু মিলে ওকে। তিন্নি আর মা-বাবা বাড়িতেই ছিলো। সব করে ফিরতে ফিরতে তখন প্রায় দুপুর দেড়টা। রিপোর্ট এলো বিকেলে, যা ভেবেছিলো দিব্যেন্দু সেটাই হয়েছে। ডান হাতের হাড়টা ভেঙেছে আর বাম পায়ের হাঁটুতে চির ধরেছে। সব মিলিয়ে দাঁড়ালো যে দুই জায়গাতেই প্লাস্টার করতে হবে আর ঠিক হতে হতে মোট এক মাস সময় লাগবে। তার আগে কোনোরকম ভারী কাজ করা বারণ আর বিছানায় সজ্জাশায়ী থাকতে হবে কম করেও আড়াই সপ্তাহ। সব ওষুধ লিখে দিয়ে আর খাওয়ানোর পদ্ধতি বলে দিব্যেন্দু চলে গেলো। সেদিন দুপুরের রান্নাটা আমিই করেছিলাম। আর তো কেউ নেই করার। আর সেদিন থেকেই ঋতিকা যেসব কাজগুলো করতো সারাদিন, যত সব ওর দায়িত্ব ছিলো সবার প্রতি, সব এলো আমার ঘাড়ে আর সাথে ওর দেখাশোনাও করতে হল।

আগামীদিন থেকে সময়তালিকা পাল্টে গেলো আমার। সকালে উঠেই গেলাম ঋতিকার ঘরে। দেখলাম ও জেগে আছে আর মা বসেছিলো ওর পাশে। কথা বলে জানতে পারলাম, ভোর পাঁচটা থেকেই নাকি ও জেগে আছে। ওটাই আসলে ওর রোজকার ওঠার সময় আর ওর ওঠার পর, এই সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মাও উঠে পড়েন তবে আজ একটু তাড়াতাড়ি উঠেছেন। আর ওঠার কারণটা হলো ঋতিকা। সকালে জেগেই নাকি কাউকে না জানিয়ে বাথরুম যাওয়ার চেষ্টা করেছিল আর পড়ে গেছে মেঝেতে আর সেই আওয়াজেই মার ঘুম ভেঙ্গে গেছে আর মা ওকে বাথরুমে নিয়ে গেছে। এটা দেখে ঠিক করলাম আজ রাত থেকে ওর আর তিন্নির সাথেই ঘুমোবো নইলে মাকে অযথা বিরক্ত হতে হবে। যদিও মা একটুকুও বিরক্ত হয়নী, বরং চিন্তিত ছিল ওকে নিয়ে। তারপর কিছু ওষুধ দেওয়ার ছিলো ওকে, সেগুলো দিয়ে নিয়ে নিজে একটু ফ্রেশ হয়ে ঢুকলাম রান্নাঘরে, মাও এলো সাহায্য করতে, মানা করাতে বললো যে এটুকু সাহায্য উনি সব সময়ই করেন রান্না করতে। দু’জনে রান্নার কাজটা সেরে তিন্নিকে উঠোলাম আর ওকে ফ্রেশ করিয়ে সবাই মিলে সকালের খাওয়ারটা খেয়ে নিলাম। এরপর বাসন মাজা, কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা সবই এক এর পর এক করতে লাগলাম, আর মাকে বললাম ঋতিকাকে খেয়াল রাখতে নইলে মা কোনো কাজই পুরোপুরি করতে দিতো না আমাকে। সব কাজের মাঝে হঠাৎ নজর চলে যেত ওর দিকে আর দেখতাম ও তাকিয়ে আছে আমার দিকে, মন খারাপ নিয়ে, কারণ ও কোনোদিন আমাকে কিছু করতে দিতো না আর যেই আমার নজর ওর ওপর যেত, অন্যদিকে তাকানোর ভান করতো। এই ভাবেই সারাদিন কেটে গেলো। রাতে খাওয়ার পর ঘুমোতে যাই, তিন্নিকেও নিয়ে আসি আমাদেরই ঘরে, ওকে মাঝে শুইয়ে দু’পাশে শুলাম দু’জনে। আজ প্রায় দুই বছর পর এক বিছানায় আমরা। খুব ক্লান্ত ছিলাম তাই বিছানাতে মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে পড়ি। পরে সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি মাঝে তিন্নি নেই চলে গেছে ঠাম্মা আর ঠাকুরদার কাছে, বিছানায় ছিলাম শুধু আমি আর ও। উঠে পড়লাম দেরি না করে আর শুরু একই সেই সময়তালিকা হিসেবে কাজ করা। আজ রাত থেকে তিন্নি ঘুমাতো না আমাদের সাথে, শুধু আমি আর ওই শুতাম একসাথে। এই ভাবেই দিনগুলো পেরোতে থাকলো, একদিন, দুইদিন, তিনদিন করে এক সপ্তাহ। রোজ ভোরে ওঠা, সবার জন্য কাজ করা আর ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যাওয়া। খুব বিষণ্ণ লাগতো মাঝে মাঝে। আর বুঝলাম আস্তে আস্তে এই কিছুদিনেই আমার এই অবস্থা আর মানুষটা তো কতো বছর থেকে এই সব করছে আর সাথে নিজের চাকরিটাও সামলাচ্ছে। জানেন সেদিন থেকে একটা আলাদা শ্রদ্ধা জন্মালো ওর প্রতি। সেই যে আমাদের কলেজের অপরিপক্ক ভালোবাসাটা ছিলো, তারপর বিয়ে তারপর সেইভাবে সম্পর্কটাকে সময়টাই দিয়ে ওঠা হয়নি পূর্ণতা পাওয়ার, যদিও বেশিরভাগ দোষটা আমারই ছিল, সেই সময়টা মনে হলো যেন সম্পর্কটা এখন পূর্ণতা পাচ্ছিলো।

দিন পেরোতে থাকলো আর তার প্রতি ভালোবাসাটা যেন ফিরে ফিরে আসছিল আমার মনে। সেই দিনগুলো, সেই সময়গুলো ভেসে আসছিলো যখন ভালোবাসায় মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছিলাম দু’জনে। মনে মনে ঠিক করলাম ফিরবো না নয়েডাতে আর। ওই কাজটা ছেড়ে, কলকাতাতেই কোনো কাজ খুঁজে নেবো। সময় লাগবে একটু আর বেতনটাও হয়তো মনের মতন পাবো না, তাও যেটুকু ব্যাংকের খাতায় আছে সেটুকুতে চলে যাবে। আর এই লকডাউন এটাও শিখিয়েছে যে আমাদের রোজকার জীবিকাতে জরুরি জিনিসগুলোর আর্থিক মূল্য যথেষ্ট কম, অর্থ তো আমরা খরচ করি নিজেদের সদাম্ভিক জীবিকার সামগ্রীগুলোতে। এটা মনে ভেবে রাখলাম তবে ওকে বলার সাহসটা জোগাতে সময় লেগেছে অনেক। ভালোবাসা যখন ছিল না এই ভয়টাও ছিল না আর এখন ভয়টা এসেছে কারণ ভালোবাসাটা ফিরে পেয়েছি। ভয়টা ওর থেকে না, ওকে হারানোর ভয় এটা।

দেখতে দেখতে ঠিক হয়ে গেল ও। এখন যথেষ্টই ভালো, নিজের সব কাজ আবার সামলে নিচ্ছে, তবুও যেটুকু পারি হাতে হাতে ওকে সাহায্য করি, ও মানা করে তবে এই সাহায্যের ছলেই হোক, ওর কাছাকাছি থাকতে পারি আর ওর কিছুটা আরাম হয় তাই করি। এখনো এক সাথেই শুই। হঠাৎ একদিন শোয়ার সময় আর নিজের মনের কথা আটকাতে পারলাম না, ভেঙ্গে পরলাম, কেঁদে ফেললাম, আর আমার চোখে জল দেখে জড়িয়ে ধরলো ও আমাকে, জিজ্ঞেস করলো "কি হয়েছে ? কাঁদছো কেন এভাবে হঠাৎ?" আমি বললাম "আর পারছি না, তোমাকে ছেড়ে, তোমার পাশে থেকেও তোমার থেকে কতো দূরে সরে গেছি আমি নিজের ভুলে। পারছি না আর।" আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো "তোমার জীবন, তুমি যেভাবে চাও বাঁচতেই পারো, তুমি বিয়ে করেছ বলেই যে আমার সাথে সারাজীবন থাকতে হবে সেটাতো জরুরি না, তুমি আলাদা হতে চাও আলাদা হয়ে যেতেই পারো। সেটা তো দোষের কিছু না।" ওর কথাগুলো শুনে যেন আরো ভেঙ্গে পড়লাম, নিজেকে আরো ছোটো মনে হল এই মানুষটার কাছে। শেষে বললাম ওকে "আমি তোমাদের সাথে থাকবো, চাইনা আমার ডিভোর্স, চাইনা টাকা, শুধু তোমাদের নিয়ে থাকতে চাই। এখানেই একটা কাজ খুঁজে থেকে যাবো। একসাথে থাকবো, বলো রি তুমি থাকবে তো আমার সাথে ?" এটা শুনেই ও আমায় ছেড়ে একটু দূরে সরে বসলো। ওর চোখটাও ভেজা তবে মুখে কিছুই বললো না। জিজ্ঞেস করলাম আবার "বলো না রি তুমি থাকবে তো আমার সাথেই?" কিছুক্ষণ পর উত্তর দিলো "না। আমি থাকতে পারবো না তোমার সাথে।" আমি কারণটা জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলো "তুমি যা বলেছ, যেই নির্ণয় নিয়েছো এই সম্পর্কটা নিয়ে নিজের ব্যাপারে ভেবে আমি সেটাতেই রাজি ছিলাম। আর আজ আমি নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি আর আমি চাই না এই সম্পর্কটা রাখতে। আশা করি তুমিও জোর করবে না আমায়।" এই কথাটা শুনে আর কি বা বলতাম ওকে আমি। ঠিকই তো বলছে ও, আমার জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার অধিকার আমার থাকলে ওরও অধিকার আছে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার। যদিও জানি ও খুব অভিমান করে আছে আমার ওপর, এটাও হতে পারে যে ওর আত্মমর্যাদাতে অনেকখানি আঘাত লেগেছে আমার কথায় অথবা ওর আমার প্রতি ভালোবাসাটা আজ কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। কারণটা যেটাই হোক, অসম্মান করবো না ওর কথার আমি শুধু প্রার্থনা করছি ওর আমার সাথে থেকে যাওয়ার। আর যদি না থাকে তাহলে এই লকডাউনটা যতদিন আছে, নিজের এই সুবর্ণ মুহূর্তগুলো উপভোগ করে নেই। শেষে কি হবে এই সম্পর্কটার পরিণতি আমি জানি না তবে ঋতিকাকে আজীবন ভালোবেসে যাবো আর থাকবো ওর আশেপাশেই, নিজের সব দায়িত্বগুলো পালন করবো ওর প্রতি। ভালো রাখবো ওকে।


May 16, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা- ১৯৩ (ঈদ সংখ্যা)

Edit Posted by with No comments

May 15, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with No comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- দেবদর্শন চন্দ

 

স্বভাবতই পুরোনো স্মৃতি আমাদের প্রত্যেককেই নস্টালজিক করে তোলে। এই পত্রিকাটিও আমার কাছে তাই। প্রথমদিন থেকে বেশ কিছুটা পথ পত্রিকার সাথে জড়িয়ে থাকার সুযোগ হয়েছে আমার। সান্নিধ্য পেয়েছিলাম কোচবিহার সহ বিভিন্ন জায়গার একঝাঁক তরুণ তুর্কি এবং পাকা হাতের লেখকদেরও। একটা কথা না বললেই নয়। বহু ছোট-বড় বাধা অতিক্রম করে আজ চৌমাথায় দাঁড়িয়ে নেট ফড়িং। লেভেল ক্রসিং পেরোলেই আবার ছুটতে প্রস্তুত। তবে এতটা পথ একা চলা মোটেই সহজ নয়, কারোপক্ষেই। শুরুতেই কোনো পত্রিকার যাত্রাপথ এতটাও সহজ থাকে না। নেট ফড়িং-ও তার ব্যতিক্রম নয়। দিনের পর দিন যত্ন করে একটা ছোট শিশুকে বড়ো করে তোলেন অভিভাবকরাই। পত্রিকার কাছের মানুষগুলোর ভালোবাসা আগামীর যাত্রাপথে গোলাপসম। শুরুতে অনলাইন ম্যাগাজিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নেটফড়িং। এরপর অনলাইনের পাশাপাশি এসেছে মুদ্রণ সংখ্যাও। লিটল ম্যাগকে অন্যরূপে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে দিনরাত প্রয়াস চালাচ্ছেন সম্পাদকমন্ডলী। তাদের প্রতি রইলো কৃতজ্ঞতা। বর্তমানে পত্রিকার গঠনশৈলীতে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন। শুধু লেখক বা লেখিকারাই নয়। ছবি আঁকা হোক কিংবা ছবি তোলা, সকলের কাছেই নেট ফড়িং যেন 'হাত বাড়ালেই বন্ধু'। গ্রিক শব্দ নসটস(বাড়ী ফেরা) ও আলজিয়া (প্রত্যাশা) থেকেই নস্টালজিয়া শব্দের উৎপত্তি। নস্টালজিয়া বলতে সুখের স্মৃতি রোমন্থন, স্মৃতি মনে করে সেই পুরোনোতে ফিরে যেতে চাওয়া। কলম যত এগোচ্ছে ততই পুরোনো দিনগুলো অনেকটাই কাছের বলে মনে হচ্ছে। সবটা মিলিয়ে একটা ভালো লাগার অনুভূতি। পুরোনো বন্ধু, পুরোনো মানুষ, পত্রিকা এমনকি শুরুতে একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাগুলিও আজ মনে পড়ছে ভীষণভাবে। আজ ২০০ সংখ্যার দোরগোড়ায় নেট ফড়িং। কোচবিহার থেকে বাংলাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বের বহু মানুষের ভালোবাসায় আজ সমাদৃত পত্রিকাটি। সর্বোপরি, প্রত্যেকের কাছেই নেট ফড়িং উৎসাহের আশ্রয়। উঁচুতে পৌঁছবার শেষের আগের ধাপ। এভাবেই এগিয়ে যাক নেট ফড়িং। টিম নেট ফড়িং এর জন্যেও রইলো একরাশ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।