এক চোখের বাজপাখি বনাম বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নাভিশ্বাস: ২০২৬ বিশ্বকাপের
সবচেয়ে বড় রূপকথা
অয়ন চট্টোপাধ্যায়
"Pterygium(টেরিজিয়াম)" এটি মূলত চোখের কনজাংটিভা বা সাদা অংশের
ওপর এক ধরণের বাড়তি মাংসল টিস্যুর বৃদ্ধি। এটি ধীরে ধীরে চোখের মণি বা কর্নিয়ার দিকে
ছড়িয়ে পড়ে। জোসিমার এভোরা ডিয়াস ওরফে ভোজিনহার ক্ষেত্রে এই আস্তরণটি তাঁর বাঁ চোখের
একটি বড় অংশকে ঢেকে ফেলেছে। যার কারণে তাঁর বাঁ চোখের কার্যকরী দৃষ্টিশক্তি নেই বললেই
চলে। অর্থাৎ, তিনি মূলত একটি (ডান) চোখ দিয়েই পুরো মাঠের খেলা দেখেন ও সামলান!
ফুটবলে একজন গোলকিপারের জন্য
দুটো চোখ পুরোপুরি সচল থাকা কতটা জরুরি, তা ভাবলেই ভোজিনহার পারফরম্যান্স অলৌকিক মনে
হবে। কোনো শট্ কতো স্পিডে আসছে এবং বলটি ঠিক কোন পজিশনে আছে, তা নিখুঁতভাবে জাজ করার
জন্য গোলকিপারের দুটি চোখেরই সমানভাবে কাজ করা প্রয়োজন। এক চোখের দৃষ্টি ছাড়া এই হিসাব
করা মারাত্মক কঠিন। মাঠের বাঁ দিক থেকে কোনো স্ট্রাইকার আচমকা উইং দিয়ে ঢুকে শট্ নিলে
বা ক্রস বাড়ালে, বাম চোখের দৃষ্টি ছাড়া চোখের পলকে সেই রিফ্লেক্স দেখা প্রায় অসম্ভব।
এই বিশাল শারীরিক সীমাবদ্ধতা
থাকা সত্ত্বেও, ৪০ বছর বয়সে এসে ভোজিনহা শুধুমাত্র নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং অবিশ্বাস্য
রিফ্লেক্সের ওপর ভর করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে দাপিয়ে বেড়ালেন। আর্জেন্টিনার
মতো বিশ্বসেরা আক্রমণভাগের বিরুদ্ধে আজকের ম্যাচে তাঁর নেওয়া প্রায় ১০টি সেভ তাই কেবল
সাধারণ কোনো পারফরম্যান্স নয়, বরং বিশ্বফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অনুপ্রেরণামূলক
লড়াই!
ফুটবল মহাবিশ্বে এবং বিশ্বকাপের
ইতিহাসে এই ধরণের গোলকিপার আর কেউ ছিলোনা এবং নেই। কেউ তর্কের খাতিরে ১৯৬৬ তে বিশ্বকাপজয়ী
ইংল্যাণ্ডের গোলকিপার গর্ডন ব্যাঙ্কসের কথা বলতেই পারেন কিন্তু দুজনের মধ্যে আকাশ-পাতাল
তফাত্। বিশ্বকাপের সময় তার দুচোখই সচল ছিলো আর ১৯৭২ এতে গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর এক
চোখ নষ্ট হবার পরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আর তিনি আসতে পারেননি, আমেরিকার ঘরোয়া লিগে খেলেছিলেন।
ফুটবল বা খেলাধুলা যে শুধুমাত্রই
শারীরিক সক্ষমতার বিষয় নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক জোর এবং সাহসের খেলা - গর্ডন ব্যাঙ্কস
কিংবা আজকের ভোজিনহা বারবার সেটাই প্রমাণ করেছেন।
*'ফুটবল ঈশ্বর' বনাম ভোজিনহা এবং ১১১ মিনিটের ভাগ্য*
ভাগ্যিস!!! ১১১ মিনিটে ওই আত্মঘাতী
গোলটা হোলো, না হলে আজ আর্জেন্টিনার কপালে যে কী চরম দুর্দশা ছিল, তা লাইভ ম্যাচ দেখা
প্রতিটি ফুটবলপ্রেমী হাড়েহাড়ে টের পেয়েছে। যদিও স্বীকার খুব কম মানুষই করছে এবং করবে।
কারণ তথাকথিত তাদের "ঈশ্বর" আটকে গেছিল বলে কথা।
তথাকথিত "ফুটবল ঈশ্বর"-এর
বাঁ পায়ের জাদুকে যেভাবে ভোজিনহা একাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে রুখে দিলেন, বিশেষ করে ওই
৩টে নিখুঁত বাঁ পায়ের ফ্রি-কিক্ যখন ভোজিনহা আটকে দিলেন, তখন মেসির মুখের এক্সপ্রেশনই
বলে দিচ্ছিল—"আরে.. ভাই! গোল করতে দে না!" ফ্রি-কিক্ গুলো সেভ হওয়ার পর মেসির
মুখের ওই অভিব্যক্তি—বিস্ময়, বিরক্তি আর ক্লান্তি—সবটাই ক্যামেরায় স্পষ্ট ধরা পড়ছিল।
ভোজিনহার করা প্রতিটা সেভের পরপরই আজ ফুটবল বিশ্ব দেখলো ফুটবলের তথাকথিত "ভগবান"
এরও হাঁফ ধরে।
ম্যাচ যত গড়িয়েছে, কেপ ভার্দের কাউণ্টার অ্যাটাকের সামনে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ আর ডিফেন্সের কঙ্কালসার চেহারা তত বেশি নগ্ন হয়েছে। শেষ দিকে এসে তো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নাভিশ্বাসই উঠে গিয়েছিল। ম্যাচ শেষে তাই আর্জেন্টিনীয়দের উল্লাসের বদলে ভগবানকে ধন্যবাদ জানাতে দেখা গেল।
*সত্য কঠিন হয়: আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ ও কড়া বাস্তবতা*
প্রতিপক্ষের ওন-গোল আপনাকে
একটা ম্যাচ হয়তো পাইয়ে দিতে পারে, কিন্তু ট্রফি এনে দিতে পারে না। পরের রাউণ্ডগুলোতে
যখন আরও বড় দলগুলোর হাই-প্রেসিং ফুটবল আর নিখুঁত কাউণ্টার অ্যাটাকের সামনে পড়তে হবে,
তখন এই ভঙ্গুর ডিফেন্স আর অতিরিক্ত মেসি-নির্ভরতা নিয়ে নামলে স্কালোনির টিমকে স্রেফ্
মাঠ ছাড়তে হবে।
সত্য কঠিন হয় আর কড়া বাস্তবতা
এটাই যে ১১১ মিনিটের মাথায় ওই আত্মঘাতী গোলটা যদি উপহার হিসেবে আর্জেন্টিনার কাছে না
আসত, তবে টাইব্রেকারে এক চোখের ভোজিনহা আজ আর্জেন্টিনাকে কোন নরকদর্শন করাতেন, তা ম্যাচ
দেখা প্রত্যেকে মনে মনে ভালো করেই জানে।
অন্ধ ভক্তরা সোশ্যাল
মিডিয়ায় যা-ই ঢাকঢোল পিটুক্ না কেন, নিরপেক্ষ ফুটবলপ্রেমীরা আজ দেখেছে যে মাঠের আসল
হিরো বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ছিল না, বরং ছিলেন ৪০ বছর বয়সী ওই অদম্য গোলকিপার ভোজিনহা!
তাই আত্মঘাতী গোল কিংবা হ্যাণ্ড অফ গডের মতো কোনো অঘটন না ঘটলে এবারে আর জিতবে না আর্জেন্টিনা।
