নগ্ন ধারাভাষ্য, ৪৮ মিনিটের অসম যুদ্ধ, রক্ষণের পারদ-পতন: আলভারেজের 'স্ক্রিমার'-এ শেষ চারে আর্জেন্টিনা
✍🏽 অয়ন চট্টোপাধ্যায়
কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের রাতের আকাশ মহানাটকীয় উত্তেজনার সাক্ষী। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ কোয়ার্টার ফাইনালের রণাঙ্গনে মুখোমুখি গতবারের বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা এবং লড়াকু সুইজারল্যান্ড। অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের রক্তক্ষয়ী থ্রিলারে সুইজারল্যান্ডকে ৩–১ ব্যবধানে ধূলিসাৎ করে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল আলবিসেলেস্তেরা, যেখানে ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হতে চলেছে ইংল্যান্ডের।
⚔️ আলবিসেলেস্তের আধিপত্য ও সুইসদের মরণকামড় ---
ম্যাচের প্রথমার্ধের শুরু থেকেই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখেছিল আর্জেন্টিনা। পুরো ম্যাচে ৫৯ শতাংশ বল পজিশন নিজেদের অধীনে রেখে, ৮৮ শতাংশ নিখুঁত দক্ষতায় ৬১৬টি পাসের (যার মধ্যে ৫৪৬টি ছিল একদম সঠিক) এক মায়াবী জাল বুনেছিল লিওনেল স্কালোনির দল। ম্যাচের মাত্র ১০তম মিনিটেই প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটায় আর্জেন্টিনা। মহাতারকা লিওনেল মেসির এক নিখুঁত ও জাদুকরী কর্নার কিক থেকে বাতাসে ভেসে চমৎকার হেডে দলকে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা আধিপত্য দেখালেও দ্বিতীয়ার্থের ৬৭ মিনিটে দারুণভাবে ম্যাচে ফেরে সুইসরা। রদ্রিগেজের সাথে চমৎকার ওয়ান-টু-ওয়ান পাসের বিল্ড-আপ থেকে এক কোনাকুনি শটে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে সুইজারল্যান্ডকে ১–১ সমতায় ফেরান ড্যান এনদোয়ে।
🎙️ ধারাভাষ্যের ঔদ্ধত্য: ম্যাচ শেষের আগেই যখন চিত্রনাট্য তৈরি ---
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা যখন সবে শুরু হয়েছে, মাঠের স্কোরবোর্ডে ১-১ সমতা, ঠিক তখনই বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমী টিভির পর্দায় ধারাভাষ্যকারদের মুখে শুনতে পেলেন এক চরম ঔদ্ধত্য—"আর মাত্র ৪৫ মিনিট, আর তারপরেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল খেলবে আর্জেন্টিনা!" রণাঙ্গনে যখন ১১ জন সুইস ফুটবলার দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছেন, তখন খেলা শেষের ৪৫ মিনিট আগেই আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালের টিকিট বুক করে দেওয়া আসলে আধুনিক স্পোর্টস ব্রডকাস্টিংয়ের এক নগ্ন ও নোংরা রূপ। কর্পোরেট মিডিয়া ও ব্রডকাস্টারদের কাছে সুইজারল্যান্ড বা কেপ্ভার্দের মতো নতুন/ছোটো/আণ্ডারডগ দলগুলো যেন কেবলই এক একটা 'এক্সট্রা' (Extra), যাদের একমাত্র কাজ হলো মেসি বা আর্জেন্টিনার মতো গ্লোবাল ব্র্যান্ডদের সেমিফাইনাল বা ফাইনালের মঞ্চে যাওয়ার রাস্তাটাকে একটু আকর্ষণীয় করে তোলা। এই টুর্নামেন্টে শুধু রেফারিদের বিতর্কিত বাঁশিই নয়, ধারাভাষ্য বক্সের এই 'আগে থেকে লিখে রাখা চিত্রনাট্য'-ও নিরপেক্ষ ফুটবলপ্রেমীদের মনে তীব্র বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছে।
🟥 এমবোলোর লাল কার্ডের ট্র্যাজেডি ও ৪৮ মিনিটের লড়াই ---
ম্যাচ যখন ১-১ সমতায় টানটান, ঠিক তখনই ম্যাচের ৭২তম মিনিটে ঘটে সেই ভাগ্যনির্ধারক মহানাটকীয় ঘটনা। ৪৪ মিনিটে প্রথমার্ধে একটি হলুদ কার্ড দেখা সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলো আর্জেন্টিনার বক্সে লেয়ান্দ্রো পারেদেসের সাথে একটি চ্যালেঞ্জের সময় সিমুলেশনের অপরাধে রেফারি জোয়াও পিনহেইরোর কাছ থেকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন, যা পরবর্তীতে ভিএআর (VAR) রিভিউতেও বহাল থাকে।
এই একটি সিদ্ধান্তই ম্যাচটি সুইজারল্যান্ডের হাত থেকে পুরোপুরি কেড়ে নেয়। সুইসদের খেলতে হয় দীর্ঘ ৪৮ মিনিট ১০ জন নিয়ে (১১ বনাম ১০ জনের লড়াই)! মূল সময়ের বাকি ২০+ মিনিট তারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়ে গেলেও, অতিরিক্ত সময়ের পুরো ৩০ মিনিট একজন কম খেলোয়াড় নিয়ে গতবারের বিশ্বজয়ী আটকানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
💥 আলভারেজের ‘স্ক্রিমার’ ও লাউতারোর শেষ পেরেক ---
একজন বেশি থাকার পূর্ণ সুবিধা নিয়ে অতিরিক্ত সময়ে আক্রমণের সুনামি বইয়ে দেয় আর্জেন্টিনা। পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে ২৩টি শট নেয়, যার মধ্যে ৭টি ছিল অন-টার্গেট শট। বিপরীতে সুইজারল্যান্ড ৪১ শতাংশ বল পজিশন ও ৪৫৩টি পাসের পুঁজি নিয়ে ১৩টি শট (৫টি অন-টার্গেট) মারলেও তা আর্জেন্টিনার দুর্গ ভাঙার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
ম্যাচের ১১২তম মিনিটে আসে সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। ডি-বক্সের বাইরে থেকে আলভারো রদ্রিগেজের পাস পেয়ে দূরপাল্লার এক অবিশ্বাস্য কোনাকুনি শটে (Screamer) সুইজারল্যান্ডের জাল ছিঁড়ে দেন হুলিয়ান আলভারেজ (২-১)। লড়াকু সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। আর ঠিক ম্যাচের শেষ মুহূর্তে (১২০ মিনিটে) হোসে ম্যানুয়েল লোপেজের নিখুঁত অ্যাসিস্ট থেকে সুইসদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন লাউতারো মার্টিনেজ (৩-১)।
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগও এদিন ৪২টি ক্লিয়ারেন্স, ৯টি ইন্টারসেপশন এবং ৯০ শতাংশ সফল ট্যাকেলের (১০টির মধ্যে ৯টি জয়) এক ইস্পাতকঠিন দেয়াল তুলেছিল। সুইসরা ১৮টি ফাউল এবং ৭টি শট ব্লক করেও শেষরক্ষা করতে পারেনি।
👑 গোল না পেলেও অনন্য ইতিহাস: ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে শীর্ষে মেসি ---
এই ম্যাচটিতেই লিওনেল মেসির টানা ৫ ম্যাচে গোল করার দুর্দান্ত রেকর্ডের অবসান ঘটেছে। সুইজারল্যান্ডের রক্ষণাত্মক কড়া মার্কিং (গ্রানিট জাকা ও ম্যানুয়েল আকাঞ্জি মেসিকে পুরো ১২০ মিনিট কড়া পাহারায় রেখেছিলেন) এবং ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ট্যাকল এড়াতে গিয়ে ডান চোখের নিচে পাওয়া চোট ও শারীরিক অস্বস্তির কারণে মেসি পুরো ম্যাচে মাত্র ২ বার শট নেওয়ার সুযোগ পান। তা ছাড়া এই ম্যাচে তিনি নিজে গোল করার চেয়ে মাঠের একটু গভীর থেকে ‘প্লে-মেকার’ হিসেবে সতীর্থদের সাহায্য করছিলেন। এমনকি ১২০ মিনিটে লাউতারোর গোলের ঠিক আগের মুহূর্তেও মেসির ডান দিকে ফাঁকা পজিশনে থাকা সত্ত্বেও থিয়াগো আলমাদা নিজে শট নেন এবং সেই ফিরতি বলেই লাউতারো গোলটি করেন।
তবে নিজে গোল না পেলেও ১০ম মিনিটে মেসির নেওয়া সেই নিখুঁত কর্নার থেকেই আসে প্রথম গোলটি, যার ফলে তাঁর খাতায় একটি চমৎকার অ্যাসিস্ট যোগ হয়। আর এই একটি অ্যাসিস্টের মাধ্যমেই মেসি বিশ্বকাপের ইতিহাস ওলটপালট করে দিয়ে নতুন কীর্তি গড়েছেন:
● তিনি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের ১০ম গোল কন্ট্রিবিউশন (গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে) পূর্ণ করলেন, যা তিনি আগের ২০২২ বিশ্বকাপেও করে দেখিয়েছিলেন।
● বিশ্বকাপে এটি মেসির ১০ম অ্যাসিস্ট, যা ফুটবল ইতিহাসে ডিয়েগো ম্যারাডোনার (৮টি অ্যাসিস্ট) ঐতিহাসিক রেকর্ডকে ভেঙে তাঁকে এককভাবে বিশ্বমঞ্চের সর্বকালের শীর্ষ অ্যাসিস্টদাতার আসনে বসিয়েছে।
🛡️ রক্ষণের পারদ-পতন: গ্রুপ পর্বের ইস্পাত যখন নকআউটের ফাটল ---
আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে উঠলেও এই ম্যাচের পর তাদের রক্ষণভাগকে কোনোভাবেই টুর্নামেন্টের "সেরা ডিফেন্স" বলা যাচ্ছে না। গ্রুপ পর্বে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরো জুটি যে দুর্ভেদ্য প্রাচীর তুলেছিলেন, নকআউট পর্বে এসে তাতে স্পষ্ট ফাটল দেখা গেছে। গ্রুপ পর্বের ৩টি ম্যাচে আর্জেন্টিনা গোল খেয়েছিল মাত্র ১টি, যেখানে আলজেরিয়া (৩-০) ও অস্ট্রিয়ার (২-০) বিরুদ্ধে দুটি ব্যাক-টু-ব্যাক ক্লিন শিট পেয়েছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। এমনকি জর্ডানের (৩-১) বিরুদ্ধে একমাত্র গোল হজম করলেও প্রতিপক্ষকে মাত্র দু-একটি সুযোগের বেশি তৈরি করতে দেয়নি তারা।
কিন্তু নকআউট পর্ব শুরু হতেই—রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দে ম্যাচ থেকে যেন ডিফেন্সে হঠাৎ ক্লান্তি এবং মনোযোগের অভাব দেখা যায়, যার ফলে পরের ৩টি ম্যাচেই তারা ৫-৫টি গোল হজম করে বসে এবং একটিতেও ক্লিন শিট রাখতে পারেনি। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে নবাগত দলের কাছে দু-দুবার সমতায় ফিরে ৩-২ ব্যবধানে অতিরিক্ত সময়ে জেতা, কিংবা মিশরের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে শেষ ১১ মিনিটে অলৌকিক ৩ গোল করে বাঁচা—কোনোটিই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সুলভ রক্ষণের পরিচয় নয়। আজ সুইজারল্যান্ড ম্যাচেও ড্যান এনদোয়ে ৬৮ মিনিটে এই ডিফেন্স ভেঙেই ১-১ সমতা এনেছিলেন। রক্ষণভাগ এদিন ৪২টি ক্লিয়ারেন্স ও সফল ট্যাকেলের ভালো খতিয়ান দেখালেও, নকআউটের এই ভঙ্গুর পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে ডিফেন্সের ফাটল বারবার ঢেকে দিয়েছে আর্জেন্টিনার জাদুকরী আক্রমণভাগ ও মিডফিল্ড (মেসি, আলভারেজ ও লাউতারো)।
আজকে রেফারি জোয়াও পিনহেইরোর শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায়—রক্ষণের নড়বড়ে পারফরম্যান্স সত্ত্বেও, স্রেফ ধারালো আক্রমণের ওপর ভর করে বিশ্বজয়ের মুকুট ধরে রাখার মিশনে শেষ চারে পা রাখল মেসি-বাহিনী।

0 comments:
Post a Comment