পিরামিডের ধাক্কায় কাঁপল তাসের ঘর: চূড়ান্ত বিতর্কিত ও একতরফা রেফারিং, মেসি ই-মোশন আর ভাগ্যের জোরে মুখ রক্ষা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের!
✍🏽 অয়ন চট্টোপাধ্যায়
ভাগ্যিস, কেপ ভার্দে ছিল! — আর্জেন্টিনার রাউন্ড অফ ১৬-এর ম্যাচটা দেখে এই একটা কথাই মাথায় এল। ওরাই প্রথম দেখিয়ে দিয়েছিল এই আর্জেন্টিনার কফিনে কীভাবে পেরেক পোঁতা যায়। আজ মিশরও সেই একই ছকে ২-০ লিড নিয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বিতর্কিত এবং একতরফা রেফারিং আর ভাগ্যের জোরে ৩-২ করে কোনোমতে মুখ রক্ষা হলো গতবারের বিশ্বজয়ীদের।
ম্যাচের প্রধান চারটি বিতর্ক এবং পাওনা —
১. মিশরের দ্বিতীয় গোল বাতিল (সবচেয়ে বড় বিতর্ক) -- ম্যাচের ৫৮ মিনিটের মাথায় মিশরের মোস্তফা জিকো একটি চমৎকার পাল্টা আক্রমণ থেকে আর্জেন্টিনার জালে বল জড়িয়ে ম্যাচটিকে ২-০ করে ফেলেছিলেন । কিন্তু ফ্রেঞ্চ রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ভিএআর (VAR) চেক করে গোলটি বাতিল করে দেন । বিতর্কের কারণ: গোল হওয়ার প্রায় ২০ সেকেন্ড আগে, মাঠের অন্য প্রান্তে মিশরের মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পায়ে সামান্য চাপ দিয়েছিলেন। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাচের বিল্ড-আপ ফেজের এত পেছনে হওয়া একটি সাধারণ ফাউলের জন্য মিশরের একটি নিশ্চিত গোল বাতিল করা অত্যন্ত কঠিন এবং অন্যায্য সিদ্ধান্ত ছিল। এমনকি অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ধারাভাষ্যকাররাও অন-এয়ার রেফারির এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন।
২. আর্জেন্টিনার বিতর্কিত পেনাল্টি ও মোস্তফা শোবেইবের বীরত্ব -- প্রথমার্ধে মিশর ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরেই আর্জেন্টিনা একটি পেনাল্টি পায়। রিপ্লেতে দেখা যায়, মিশরের ডিফেন্ডারের সাথে আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের সাধারণ শারীরিক সংঘর্ষ বা কাঁধে-কাঁধের লড়াই হয়েছিল। এটি পেনাল্টি দেওয়ার মতো ফাউল ছিল কিনা, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফুটবল ফ্যানদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। অবশ্য মিশরের তরুণ গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইব অসাধারণ রিফ্লেক্স দেখিয়ে লিওনেল মেসির সেই পেনাল্টি শটটি বাঁচিয়ে দেন। মেসির মতো কিংবদন্তির শট রুখে দিয়ে তিনি প্রথমার্ধে মিশরীয় শিবিরকে মানসিকভাবে বহুগুণ এগিয়ে দিয়েছিলেন, যার ফলে সে যাত্রা বিতর্ক বড় আকার নেয়নি।
৩. মোহামেদ সালাহ-র জাদুকরী অ্যাসিস্ট -- ম্যাচের ৬৭ মিনিটে মিশর যখন আসলেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়, তখন বিশ্ব দেখল 'সালাহ ম্যাজিক'। বিশ্বসেরা তারকা মোহামেদ সালাহ নিজের একক দক্ষতায় আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে একটি নিখুঁত কাউন্টার-অ্যাটাক তৈরি করেন। তাঁর চমৎকার পাস থেকেই মোস্তফা জিকো আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগের কঙ্কালসার দশা যেন আরও একবার প্রকাশ পেয়ে গেল এই গোলটিতে।
৪. যোগ করা সময়ে পেনাল্টি না পাওয়া ও কার্ডের একতরফা বৃষ্টি -- ম্যাচের ইনজুরি টাইমের (৯২ মিনিট) ঠিক আগের মুহূর্তে আর্জেন্টিনার বক্সে সবচেয়ে বড় নাটকটি তৈরি হয়। মিশরের ফুটবলারদের জোরালো দাবি ছিল, আর্জেন্টিনার বক্সে মিশরের হামদি ফাতিকে টেনে ফেলে দিয়েছিলেন আলেক্সিস ম্যাকালেস্টার। রেফারি সেখানে মিশরের পক্ষে পেনাল্টি না দিয়ে উল্টো আর্জেন্টিনার কাউন্টার অ্যাটাক চালু রাখেন এবং সেখান থেকেই এনজো ফার্নান্দেজ আর্জেন্টিনার হয়ে ৩-২ ব্যবধানের জয়সূচক গোলটি হেড করেন। এই ঘটনার পর মিশরের খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফরা রেফারির ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়েন। মাঠের ভেতরের এই চরম উত্তেজনার মাঝে রেফারি একের পর এক মিশরের খেলোয়াড়দের হলুদ কার্ড দেখাতে শুরু করেন। এমনকি রেফারির সাথে তীব্র তর্কে জড়ানোয় মিশরের কিংবদন্তি প্রধান কোচ হোসায়েম হাসানকেও হলুদ কার্ড দেখতে হয় এবং মাঠের ভেতরে চলে আসা মিশরের এক স্টাফকে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরো ১২০ মিনিটের এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মিশরের খেলোয়াড়রা প্রতিবাদ ও ফাউলের জন্য মোট ৪টি হলুদ কার্ড ও ১টি লাল কার্ড পেলেও, আর্জেন্টিনার কোনো খেলোয়াড় একটিও হলুদ কার্ড পাননি! রেফারির এই একতরফা কার্ডের পরিসংখ্যান রেফারিং নিয়ে মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও পক্ষপাতিত্বের বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে।
৫. মেসির সমতাসূচক গোল -- ম্যাচের ৬৭ মিনিট পর্যন্ত মিশর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বড় অঘটনের জন্ম দেওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছিল। ৭৯ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর গোলে আর্জেন্টিনা ব্যবধান কমিয়ে ২-১ করে। এর ঠিক চার মিনিট পর, ৮৩তম মিনিটে আসে সেই জাদুকরী মুহূর্ত। ডি-বক্সের ভেতর দারুণ পজিশন থেকে মেসি একটি নিখুঁত শটে মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবাইরকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। এই গোলের মাধ্যমে ম্যাচে ২-২ সমতা ফেরে এবং আর্জেন্টিনা শিবিরে প্রাণ ফিরে আসে, যা পরবর্তীতে ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজের করা গোলে ৩-২ ব্যবধানের জয় এনে দেয়।
৬. মেসির করা নতুন বিশ্বরেকর্ডসমূহ -- এই একটি গোলের মাধ্যমে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলে বেশ কিছু ঐতিহাসিক রেকর্ড নিজের নামে করেছেন। যথা ---
● গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে: এই বিশ্বকাপে এটি মেসির ৮ম গোল, যার ফলে তিনি ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং নরওয়ের আর্লিং হাল্যান্ডকে (উভয়েই ৭ গোল) টপকে গোল্ডেন বুটের রেসে এককভাবে শীর্ষে চলে গেছেন।
● টানা ৯ ম্যাচে গোল: ২০২২ সালের বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে টানা ৯টি ম্যাচে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়লেন মেসি।
● মারাদোনার রেকর্ড ভঙ্গ: এই ম্যাচে রোমেরোর গোলে অ্যাসিস্ট করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে মেসির মোট অ্যাসিস্ট সংখ্যা দাঁড়ায় ৯-এ, যা ডিয়েগো মারাদোনার করা ৮টি অ্যাসিস্টের পূর্ববর্তী রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
● নকআউট পর্বের রাজা: বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মেসির বর্তমান গোল অবদান দাঁড়িয়েছে ১৪টিতে (৭ গোল, ৭ অ্যাসিস্ট), যা গত ৬০ বছরে যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ।
শেষ কথা: কোয়ার্টার ফাইনালে তো ওঠা হল, কিন্তু ফুটবল দুনিয়া মনে রাখবে—কেপ ভার্দের মতো ছোট দলগুলোই আসলে এই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার আসল দৌড়টা সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে এবং মিশর সেই ক্ষততেই নুন ছড়িয়েছে।শেষ পর্যায়ে এসে অবস্থাটা এখন —
গা ছমছম, কি হয়! কি হয়! তাসের ঘর যেন ভেঙে না পড়ে!
লড়ঝড়ে মিডফিল্ড, ফোকলা ডিফেন্সে, গোল আটকানো যাচ্ছে না যে!
কান ধরে মুলে দাও স্কালোনি বাবু,
সুইসরা যেন ছোবল না দিতে পারে!

0 comments:
Post a Comment