Mar 30, 2020

আমাদের রূপকথা

Edit Posted by with No comments


আমাদের রূপকথা
অ্যাস্ট্রিক্স

সে ধরে নিন প্রায় দশ বছর আগের ঘটনা। সবে শরৎকালের আগমন, মা আসবে বলে আয়োজন শুরু হয়েছে সবে। তখন আমি সবে সতেরোতে পা দিলাম একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। পাঁখাটা গজানো শুরু হচ্ছে বুঝতেই পারেন। সেমন এক দিনেরই কথা, ছাঁদে দাড়িয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুড়ি উড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে দাড়ালো ঠিক আমাদের বাড়ির গেটের সামনে। এক ভদ্রলোক নামলেন গাড়ি থেকে আর জিনিসপত্র সব নামাতে শুরু করলেন গাড়ি থেকে। বুঝলাম সামনের বাড়িতে লোক এসেছে নতুন, আমাদের প্রতিবেশী আর কি। তো ওখান থেকে যেই চোখ সরিয়ে ঘুড়ির দিকে তাকাবো হঠাৎ দেখলাম গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে নুপুর বাঁধা পা দুটো নিয়ে নামছে সে।
এখনও মা দুর্গার আসতে কিছুটা সময় বাকি, তবে তার আগমনটা তো ব্যাস এক নজরে হয়ে গেছিলো আমার মনে। হালকা হলুদ রঙের চুড়িদার আর চুলটা খোঁপা করে বাঁধা। মুখটাতে এক আশ্চর্য রকমের কমনীয়তা আর বড় বড়ো দুই চোখ, খুব গভীর। গায়ের রং টা একটু চাপা তবে সেটা যেনো আরো ফুটে উঠেছিল ওর উপর। প্রথমবার যেন এমন মনে হলো কাউকে দেখে। আর ব্যাস এই সবের মাঝে হয়ে গেলো ভোকাট্টা, আমার ঘুড়ি আর আমার মনের।
অনেকদিন অপেক্ষা করলাম ওর জন্য, কখনো ছাদে, কখনো বা পাড়ার রাস্তায় ক্রিকেট খেলার ছলে। খুব অস্থির হয়ে উঠেছিলাম তবে এই বারো দিনের মাঝে শুধু দু’বার ওর দেখা পেয়েছি, একবার ও বেরিয়ে ছিলো ওর মার সাথে, তখন আমি ছাদে দাড়িয়ে আর একবার বাবার সাথে সকালে বাজার করার সময় ওর দেখা পেলাম, ও নিজের মায়ের সাথে এসেছিল বাজার করতে। ভাগ্যটা কোনো রকম ভাবে সঙ্গ দিয়েছিল তাই ওর মা ওর নাম ধরে ডাকলো তো শুনতে পেলাম "উমা"। মনে হলো যেন জীবনের একটা বড়ো জয় হলো আজ। তবে অনেক চেষ্টা করেও ওর গলার আওয়াজটা শুনতে পারিনি। আবার অপেক্ষা আর তো কিছু করার ছিল না।
কিছুদিন পড়ে ওকে আমি নিজের স্কুলে দেখলাম, খোঁজ নিয়ে জানলাম নতুন ভর্তি হয়েছে দশম শ্রেণীতে। আসলে আমার সাথে একাদশ শ্রেণীতেই হত তবে গত বছর পরীক্ষাটা দিতে পারেনি কারণ তখন হঠাৎ ওর খুব শরীর খারাপ হয়ে গেছিলো। এতো কিছুর মাঝে আরো একটা জিনিস জানতে পারলাম যে ও কথা বলতে পারে না। জন্ম থেকে ওর স্বরতন্ত্রী মানে ভোকাল কর্ডটা কার্যকরী নয়। হ্যাঁ, শুনে আমারও মনটা খারাপ হয়েছিল খুব। তবে ওকে জানার যে ইচ্ছেটা ছিল, সেটা আরো বেড়ে গেলো।
এর মাঝে পুজো এলো, পাড়ার প্যান্ডেলে বসে থাকতে থাকতে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারার মাঝে অষ্টমীতে পেলাম ওর দেখা। লাল শাড়ি, পায়ে নুপুর, খোঁপা করা চুল, হাতে কাঁচের চুড়ি আর সেই কাজল দেওয়া চোখ নিয়ে অঞ্জলী দিতে এসেছিল ওর মায়ের সাথে পাড়ার প্যান্ডেলে। আমি পাশে দাঁড়ালাম আবার অঞ্জলী দেওয়ার ভান করে আর এক চোখ বন্ধ আর এক চোখ খুলে ওর দিকে তাকিয়ে মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করছিলাম উমা কে আমার জীবনে পাওয়ার। এবার পুজোটা শেষ হয়ে এলো কিন্তু আর ওর দেখা এর মাঝে আর পেলাম না।
অনেকটা সময় কাটলো, প্রায় দু-তিনটে মাস তবে কথা বলা হল না, শুধু ওই স্কুলে দেখতাম ওকে আবার কখনো বাড়ির ছাদ আর পাড়ার ক্রিকেটের মাঝে। প্রথমবার পরিচয়টা হয় মুখোমুখি আমাদের স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে। বন্ধুরা জোর করেছিল বলে সাহসটা করতে পারলাম। বললাম যে আমি ওর বাড়ির উল্টো পাশেই থাকি, ও হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে উত্তর দিলো। বুঝলাম ওর কথা গুলো আসলে ওর ব্যাপারে জানার পর এই দু-তিন মাস আমি হ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজটা কিছুটা শেখার চেষ্টা করে ছিলাম যাতে ও এটা না ভাবে যে আমি এটুকুও জানিনা। ওই প্রথম পরিচয়ের পরে আমাদের কথা বাড়তে থাকে আর বন্ধুত্বটা গভীর হয়ে ওঠে। আস্তে আস্তে দুজন দুজনের ছাদে দাড়িয়ে কথা বলাও শুরু করি। একসাথে ঘুরতে যাওয়া, বাইরে দেখা করা আর সব কথা দুজন দু’জনার সাথে ভাগ করে নিতে নিতে কবে যেনো ভালোবেসে ফেলেছিলাম ওকে।
দেখতে দেখতে একাদশ শ্রেণী পেরোলাম আমি আর ও পেরোলো মাধ্যমিক। মনে আছে এখনও, ময়দানে গল্প করতে করতে হঠাৎ হাঁটু গেড়ে আমি ওকে প্রপোজ করি আর ও কিছুটা অবাক হলেও মেনে নিয়েছিল সেটা। তবে আমাদের বাড়িতে আমাদের এই সম্পর্কটার ব্যাপারে জানতো না। কারণ ওর পরিবার বিপক্ষে ছিল এই সবের আর আমিও জানতাম না আমার কি অবস্থা হবে বাড়িতে জানতে পারলে। অনেক হাসি-ঠাট্টা আর ভালোবাসায় কেটেছিল আমাদের এই বছরটা আর পরীক্ষা এলো আবার আর আমি উচ্চমাধযমিক পার করে স্কুল জীবন শেষ করলাম আর ও এলো এবার দ্বাদশে। আমি বাড়ির কাছাকাছি আশুতোষ কলেজে ভর্তি হলাম। ব্যাস এখন দেখা করার সময়টা একটু পাল্টে গেছিলো উমার সাথে আর সত্যি বলতে কিছুটা কমে গেছিলো। ওর ছিলো উচ্চমাধ্যমিক এর চিন্তা আর আমার নতুন কলেজ নতুন জীবনের, তবে দেখাটা ঠিক করে নিতাম। খুব জরুরি একটা অংশ হয়ে উঠেছিল আমার জন্য সে আর আমিও হয়তো তার জন্য। আমাদের কাহিনীতে শব্দ ছিলো কম তবে কথা ছিল অনেক বেশি।
এই সবের মাঝে পরীক্ষা চলে আসে ওর, আর পরীক্ষা চলাকালীন খবর আসে ওদের চলে যাওয়ার, শুনলাম ওর কাছে ওর বাবার বদলি হয়েছে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং জেলায় আর পরীক্ষার এক সপ্তাহ পরেই চলে যাচ্ছে ওরা সবাই। খুব কেঁদেছিল ও সেদিন, আসলে কিছু বলতে পারেনা তো তাই হয়তো কাঁদা ছাড়া আর কোনো কিছু ছিলো না করার। দেখতে দেখতে ওর যাওয়ার দিন এসে পরে। নাহ আমি বলতে পারিনি আমাদের সম্পর্কর ব্যাপারে কোনো বাড়িতেই। কোনো আয় উপার্জন ছিলো না আমার, কোন মুখেই বা বলতাম যে ওকে খুশি রাখবো, তাই সেদিন ও আমার উপর কিছুটা রাগ আর মনে অনেক ভালোবাসা নিয়ে চলে গেলো। ঠিক যেমন মহালয়ার আগমন সুরের মতন এসেছিলো ঠিক সেভাবেই দশমীর ভাসানের মতন সব ডুবিয়ে চলে গেলো সে, আমার "উমা"।
আমি কলেজ পেরিয়ে কাজ করতে শুরু করলাম, আর আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে লাগলো সেই দিনগুলো। তবে সব কিছু তো আর হারায় না কিছু জিনিস সব সময় মনে রয়ে যায়।
আজ আমার প্রথম বিবাহ বার্ষিকী, বাড়ীতে আমার স্ত্রী অপেক্ষা করছে । আমার আর আমার স্ত্রীর দেখা হয় কোম্পানির এক ক্যাম্পেইনে, প্রথমে কথাটা আমি শুরু করি আর আস্তে আস্তে আমাদের সম্পর্কটা সময় এর সাথে গভীর হয়ে যায়। বেশ ভালো লেগেছিল তাকে, আর দেখা এবং কথা হতে হতে ভালোবাসা আরো একবার এসেই গেলো আমার জীবনে। তার বাড়ি গরিয়াতে। চার মাস প্রেম করার পর বাড়িতে জানিয়ে দিলাম। ওর বাড়িতে মানেনি তাই পালিয়ে যাওয়াটাই ঠিক ভাবলাম। এখন মেনে গেছে সবাই, আসছে আজ রাতে ওর বাবা-মা আর ছোট ভাই আমাদের বাড়িতে। ছোটো একটা আয়োজন করেছি দু’জনে ওই দু-চারটে বন্ধু-বান্ধব আর পরিবারের লোকজন। আসলে ও এখন অন্ত:সত্ত্বা তাই বেশি ঝামেলা করিনি। ও! আমার নামটা বলাই হলো না, আমি নীল আর আমার স্ত্রীর নাম "উমা"। হ্যাঁ সেই যাকে একবার হারিয়ে ফেলেছিলাম। ক্যাম্পেইনের ওখানে ওকে দেখেই চিনে ফেলেছিলাম আর আমাকে দেখে ও যে কতটা খুশি ছিলো সেটা বলে বোঝানো অসম্ভব। বুঝতে পারলাম যে পাগলিটা এখনও আমায় ততটাই ভালোবাসে যতটা আগে বাসতো, সব মনে আছে ওরও, এক একটা কথা। চার মাসের সমযটা চেষ্টা ছিলো ওর বাড়িতে মানানোর, সেটাতেও যখন মানেনি, আর কিছু উপায় ছিলো না। একবার ওকে হারিয়েছিলাম আবার হারাতে চাইনা। দুজন বেশ খুশিই আছি। এই আমাদের গল্প, আমাদের রূপকথা।


করোনা

Edit Posted by with 1 comment


করোনা
শাকিলা খাতুন

চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে করোনার বিষ,
হাজার প্রাণ নিষ্পাপ থেকে সবাই নিঃশেষ
এই যেন ছোঁয়াধরার বাইরে বিরাজমান
অসম্ভব হলেও কিছু যোদ্ধা লড়ে যাচ্ছে আপ্রাণ
এদের কারোরই কেউ সন্তান, বাবা-মা নয়
তবুও অক্লান্ত পরিশ্রম জীবন হারানোর পায়না ভয় ;
থাকুক না হয় প্রিয়জনেরা অপেক্ষায়; যারা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এরাও তো কারো প্রিয়জন;
নেমেছে আজ জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধে হবোনা পরাজয়,
এমন শক্তি কাজে লাগিয়ে মনকে দিচ্ছে নিরাময়।।
এদের পায়ে শত প্রণাম শত ধন্য হোক এরা
নিজের প্রাণ হারানোর ভয় না পেয়ে লড়ে যাচ্ছে যারা।
যুদ্ধে যেমন আক্রান্ত যোদ্ধার দিকে চোখ তুলোনা কেউ,
বাকিরা এগিয়ে যাও পিছন ফেরেনা কেউ,
যাদের যোদ্ধা  উপমায় ভূষিত করছি আমরা
এরা কারোর প্রিয়জন ডাক্তার,নার্স, পুলিশ,স্বাস্থ্যকর্মীরা
মনে থাকবে এই মৃত্যুর স্রোতে লড়ছে যারা
তারাই যে ভগবান স্বরূপ মানবদানব আর কেউ না।
দেখা যাচ্ছে জীবন্ত শহিদ যারা লড়ছে এখনোও
তাদের জন্যই একটা সকাল হবে করোনা মুক্ত।।


Mar 29, 2020

নেট ফড়িং সংখ্যা ১৩৪

Edit Posted by with No comments

Mar 26, 2020

পাহাড়ি বালিকা

Edit Posted by with No comments


পাহাড়ি বালিকা
আলি মোস্তাফা

চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট একটি দেশ। সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কোথাও পাহাড়ী স্রোতসীনী ঝরণা হয়ে দূর নদীতে মিশে যায়। ছোট বড় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট বড় পাহাড়ি নদী। সেই পাহাড়ী দেশের রাজাও ছিলেন বৃহৎ পাহাড়ের মত বড় মনের, ছিলেন ভীষণ প্রজাবৎসল । দেশের বড় বড় সব প্রতিষ্ঠানই ছিল রাজ পরিবারের সদস্যদের। সর্বত্র ছিল রাজ পরিবারের আধিপত্য কিন্তু তা সত্বেও প্রজারা ছিল সন্তুষ্ট। অল্প সংখ্যক প্রজাদের সেই দেশে তারা খুব সুখে শান্তিতেই বসবাস করছিল। এমন প্রজাবৎসল রাজা যিনি প্রজাদের সুখ-শান্তির দিকে খুবই তীক্ষ্ণ খেয়াল রাখেন। নিজের বিরাট পরিবার, মন্ত্রী-পারিষদমণ্ডলী আর প্রজাদের নিয়ে রাজা নিজেও ছিলেন ভীষণ সুখী।
ছোট্ট পাহাড়ি দেশের সেই রাজা একদিন নিজের পরিবার, কিছু বন্ধুবান্ধব ও তাদের পরিবার নিয়ে ভ্রমণে গেলেন। বড় একটি রাজ পরিবার রাজার। চারজন স্ত্রী ও অনেক ছেলেমেয়ে নিয়ে রাজার সুন্দর পরিবার । তার মধ্যে এক সুদর্শন পুত্রকে তিনি খুবই ভালবাসতেন। সেই পুত্রের বয়স তখন ১৬ পেরিয়ে ১৭ এর কাছাকাছি। পুত্রের প্রতি অগাধ ভালবাসা, তাই রাজপুত্রকে কিছুতেই চোখের আড়াল করতে চাইতেন না। কিন্তু যে ছেলে দূরন্ত কৈশোরে পা দেয় তাকে কি ঘরে আটকে রাখা যায়? একটা ১৬ বছরের কিশোরকে কি আর সবসময় চোখের সামনে রাখা যায়? সেও এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে ভাইবোনদের সাথে, সভাসদ, বাবার বন্ধুদের ছেলেমেয়েদের সাথে খেলছে, ঘুরছে উৎফুল্ল হয়ে ছুটছে দিকবিদিক। রাজ রক্তের উচ্ছ্বাস যেন বয়ে বেড়াচ্ছে শরীরে সর্বত্র ।
অনেকগুলো ছেলে মেয়ের মাঝে কোন এক অপরূপা বালিকার দিকে চোখ আটকে যায় রাজপুত্রের। সবাই তাকে পেমা নামেই ডাকে। বয়স তার ৬ পেরিয়ে ৭ এর কাছে। রাজপুত্রের সাথে পেমার প্রথম পরিচয় হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। আজ যেন রাজপুত্র পুরো পৃথিবীকে পেয়েছে। একসাথেই খেলছে, ঘুরছে, গল্প করছে, যেন এক অন্যরকম পূর্ণতা এসেছে । এক শিশু কণ্যা আর কিশোর রাজপুত্রের এমন দহরম মহরম দেখে সবার মাঝে হাসিঠাট্টারও কমতি নেই।
ভ্রমণের দিনগুলো ফুরিয়ে এসেছে। সবকিছু গুছিয়ে রাজার সাথে সেই রাজপুত্র ফিরবে প্রাসাদে। জ্বলজ্বল চোখে পেমা দূর হতে দেখছে। রাজপুত্র ছুটে চললো, বালিকাটি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না হঠাৎ জড়িয়ে ধরলো রাজপুত্রকে। রাজপুত্রের বুকে মাথা রেখে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, "আমি আবার আসবো তোমার কাছে…"
রাজপুত্রের ভেতরটা যেন হঠাৎ কেমন করে উঠলো। বালিকার আহ্লাদী কাণ্ড দেখে বিমোহিত রাজপুত্র। বুকে জড়িয়ে ধরে রাজপুত্রের মনে হচ্ছিল যেন সে তার পরম বন্ধুকে পেয়ে গেছে। এ যেন তীব্র বিরহের মাঝে প্রিয়তমাকে ফিরে পাওয়া। স্নিগ্ধ হৃদয়ে যেন সে চিরকালের সহযোগী পেয়ে গেছে। আবেগের সুরে বলে উঠলো, হ্যাঁ, নিশ্চয়। তুমি আমার কাছেই আসবে…। তুমি আমার কাছেই থাকবে…। তুমি যখন বড় হবে, যদি আমাদের আবার দেখা হয় তবে দেখবে আমি অপেক্ষমাণ হয়ে থাকবো দূর পাহাড়ের পাদদেশে। ঝংকারে বেজে উঠা বাঁশির সুর শুনে তুমি আমাকে খুঁজে নিও। তখন আমি যদি অবিবাহিত থাকি, আর তুমিও যদি অবিবাহিত থাকো, আমি তোমাকেই আমার জীবনের পরম সাথী বানাবো…।
খুশি আর লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিল বালিকা… সেই বালিকাটি ছিল রাজার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ধোন্দুপ এর মেয়ে। তিনি সেই দেশের পূর্ব সীমান্তের এক গ্রামের মোড়ল। এলাকার সবাই তাঁকে খুব ভক্তি করেন। এদিকে রাজপুত্র আর বালিকার সেই বন্ধুত্বের কথা আর গোপন রইলো না। রাজপুত্রের প্রতি বালিকার আকর্ষণের কারণে বালিকাটির বাবা ধোন্দুপ কিছুটা লজ্জিত ও ভীতসন্ত্রস্ত। কোথায় রাজপুত্র আর কোথায় মোড়লের মেয়ে, এ যেন আকাশ কুসুম ভাবনা বৈ কিছু নয় । কিন্তু রাজামশাই ওগুলো আমলে নিলেন না। বন্ধুদের মাঝে হাসতে হাসতে বললেন, বাচ্চাদের মধ্যে ওরকম একটু আধটু বন্ধুত্ব থাকতেই পারে। এ আর এমন কি? অবুঝ মনে ভাললাগা আর ভালবাসা বলতে কিছু আছে?
কিন্তু সেদিনের বন্ধুত্ব যেন তাদেরকে এখন প্রণয়ে বেঁধে ফেলেছে। সময় তার আপন গতিতে চলছে অবিরত। তারা বড় হতে লাগলো এবং ধীরে ধীরে প্রেম যেন গাঢ় হতে লাগলো। কখনো রাজপুত্র ছুটে যায় পূর্ব সীমান্তের সেই গ্রামে। কোন এক অন্তীত বন্ধন যেন বেঁধে ফেলেছে অজান্তেই। এভাবে মাঝে মাঝে দেখা হয় খুনসুটি গল্পে সময় বয়ে যায়।পারিবারিক ভ্রমণে যাওয়া হয় একসাথে। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো।
এদিকে রাজার বয়স ক্রমেই বাড়ছে, ভরা যৌবনে পৌড়ত্ব এসে যেন ঘিরে ধরেছে রাজাকে। তিনি আর খুব বেশী ঘোরাঘুরি করতে পারেন না। নেই সেই ক্ষীপ্রতা। বয়সের ভার যেন পৌড়ত্বকে ক্রমশঃ বৃদ্ধি করছে। বার্ধক্য যেন সবকিছুকে থামিয়ে দিচ্ছে। আগের মত শাসনকার্য চালাতেও পারছেন না। প্রজাদের সুখ-শান্তির কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি এবার বিশ্রাম নেবেন এবং তার সেই আদরের পুত্রকেই রাজা বানাবেন। সেই পুত্র এখন ২৭ বছরের তরতাজা যুবক। তিনি জনগণের সুখ শান্তির দিকে বেশী খেয়াল রাখতে পারবেন বলেই মনে হলো রাজার। সেইমত সবার সাথে আলোচনা করলেন এবং ঘটা করে রাজা হিসেবে অভিষেক করা হলো রাজপুত্রকে।
সেই রাজপুত্র এখন রাজা এবং সেই পেমা নামের সেই বালিকা এখন আর বালিকা নেই। ভরা তারুণ্যের সে যেন রূপ লাবণ্যকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ১৭ বছরের কিশোরী যেন দুর্বার আঠারো কে হাতছানি দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে। কিন্তু সে এদেশে নেই। পড়াশোনার জন্য ভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছে। রাজপুত্র দেশ চালাতে লাগলেন আর পেমা পড়াশোনার জন্য ভিন দেশে । কখনো ছুটি হলে সে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না ফিরে আসে তার স্বপ্নের কুমারের কাছে। পড়াশোনার ফাঁকে বাড়ি ফিরলে দেখা হয় দুজনের। এভাবেই কেটে বছর পাঁচেক।
রাজপুত্রের এখন ৩১ এ পা দিয়েছে। সে এখন অনেক পরিণত । আর পেমা ২১ বছরের পূর্ণ যুবতী। এভাবে কতদিন বিরহকে বৃদ্ধি করা যায়? পেমাকে ছাড়া যেন এখন সময়ই যেতে চায় না। কিন্তু কিভাবে পাবে সে পেমাকে? সে তো বিরহ যন্ত্রণা তীব্র করে ভিনদেশে পার করছে দিন। রাজপুত্রের মনে হলো এবার তাকে কাছে নিয়ে আসা উচিৎ। আর যে তাকে ছেড়ে থাকতে একটুও ইচ্ছে করে না। তাকে এবার কাছে রাখা উচিৎ। আর দেরি করতে চাইলেন না। রাজ সভাসদদের ডেকে সেই অনুযায়ী সবার সাথে আলোচনা করলেন। সব ঠিক হল। রাজবাড়ি সাজলো রঙ্গিন সাজে। পেমাকে বরণ করে নিতে রাজবাড়ি যেন উৎসুক হয়ে আছে। তারপর ঘটা করে তাদের বিয়ের আয়োজন হল। হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত থাকলেন রাজার বিয়েতে। উপস্থিত থাকলেন ভিন দেশের প্রতিনিধিরাও। চারদিক থেকে, শুভেচ্ছা আর উপহারের বন্যা।
কিন্তু নতুন রানী কি নিজ দেশে থাকবেন? তিনি তো অন্য দেশে পড়াশোনা করছেন। তিনি কি তাহলে আবার বিদেশে চলে যাবেন? আশঙ্কা প্রজাদের, চিন্তিত সবাই । পেমা ভাবলো আমি তো এখন আমার নিজের নই, আমি এখন রাজার, আমি তো এখন রাজ্যের, আমি তো প্রজাদের! নিমিষেই যেন জীবনের সব স্বাধীনতা থমকে গেল! কিন্তু পেমা জানে এটা স্বাধীনতার হরণ নয় বরং এটা দায়িত্বের বাস্তবতা। রাজার কথা ভেবে, প্রজাদের কথা ভেবে রানী পেমা বিদেশের পড়াশোনা স্থগিত রেখে দেশেই রয়ে গেলেন। তারপর থেকে রাজা ও রানী, পরিবারকে নিয়ে, প্রজাদেরকে নিয়ে সুখেই দিন কাটাতে লাগলেন…
নাহ, এটা আসলে কোনো কল্পগল্প নয়। আসলে বাস্তব কাহিনী। এখানে সেই রাজা হলেন ভুটানের পূর্বতন রাজা জিগমে সিঙ্ঘে ওয়াংচুক, রাজপুত্র হলো ভুটানের বর্তমান রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক এবং সেই বালিকাটি হলো বর্তমান রাজার স্ত্রী জেতসুন পেমা।

[প্রথম প্রকাশ: নেট ফড়িং, সংখ্যা ১২৮, ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০]


Mar 22, 2020

নেট ফড়িং সংখ্যা ১৩৩

Edit Posted by with 1 comment

Mar 18, 2020

(ই-বুক) কাব্য সংহিতা - শুভাশীষ গোস্বামী

Edit Posted by with No comments
নেটফড়িং ও কল্পতরু প্রকাশনীর তরফ থেকে প্রথম উদ্যোগ হিসেবে কিশোর ও উদীয়মান কবি শুভাশীষ গোস্বামী-এর একটি কাব্য সংকলন প্রকাশ করা হলো.

শুভাশীষ গোস্বামী
জন্ম- ১১। ১২। ২০০১ সালে, 
হুগলী জেলার গোস্বামী মালিপাড়া গ্রামে ।
  শিক্ষা – প্রথমে গোস্বামী মালিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে
পরে দ্বারবাসিনী কুমার রাজেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে ,
বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণীর কলা বিভাগের ছাত্র । 
ছোট থেকই সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা।
ও তার প্রথম লেখা ছাপা হয় স্কুল ম্যাগাজিনে ২০১৮ সালে।
   ইতিমধ্যেই অক্ষর সংলাপ, শব্দসাঁকো, কলম পত্রিকা,
কবিতা কুটির , ৯ নম্বর সাহিত্য পাড়া লেন 
পথচলা ও আরও বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লিখেছেন ,
   তার সম্পাদিত পত্রিকা – হিয়ার কথা,  ও প্রকাশিত বই স্নিগ্ধবন্যা ।
 অবসর সময়ে কবি বই পড়তে ও লিখতে ভালোবাসেন ।

Mar 15, 2020

নেট ফড়িং সংখ্যা ১৩২

Edit Posted by with No comments

Mar 9, 2020

নেট ফড়িং সংখ্যা ১৩১

Edit Posted by with No comments

রাঙিয়ে দিয়ে যাও

Edit Posted by with No comments


রাঙিয়ে দিয়ে যাও
বিক্রম শীল

এ বছর মার্চ মাসের ৮ তারিখ দোল-পূর্ণিমা আর তার পরেরদিন অর্থাৎ ৯ই মার্চ হোলি উৎসব সারা ভারতবর্ষ জুড়েই হোলি উৎসব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সার্বিকভাবে পালন করা হয়। দোলযাত্রা একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। বহির্বঙ্গে পালিত হোলি উৎসবটির সঙ্গে দোলযাত্রা উৎসবটি সম্পর্কযুক্ত। এই উৎসবের অপর নাম বসন্তোৎসব। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। দোল যাত্রা নিয়ে পৌরাণিক অনেক কাহিনীর মধ্যে অন্যতমটি হল একবার শ্রীকৃষ্ণ মা যশোদার কাছে অনুযোগ করেন যে রাধা কেন এতো ফর্সা অথচ তিনি কালো। তখন মা যশোদা রাধাকে রং দিয়ে রাঙিয়ে দেওয়ার নিধান দেন। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সাথে রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। দোলযাত্রার দিন সকালে তাই রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ আবির স্নাত করে দোলায় চড়িয়ে কীর্তন গান সহকারে শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর ভক্তেরা আবির নিয়ে রং খেলায় মেতে ওঠেন। দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এই দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়। দোলের আগের দিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্ন্যুৎসবের আয়োজন করা হয়। এই বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া নামে পরিচিত। উত্তর ভারতে হোলি উৎসবটি বাংলার দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। সেই সাথে সারা ভারত বর্ষেই সারম্বরে দিনটি উদযাপন করা হয় রং খেলার মাধ্যমে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তে বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচতেই এই রং খেলার উৎপত্তি। তবে রং খেলায় চোখে-মুখে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। পরিশেষে বলতেই হয় খেলবো হোলি রং দেবো না তাই কখনো হয়?



Mar 1, 2020

নেট ফড়িং সংখ্যা ১৩০

Edit Posted by with No comments