খাঁচাবন্দি হালান্দ আর জুডের বাজিমাত, অতিরিক্ত সময়ের থ্রিলারে ইংল্যান্ডের কিস্তিমাত!
✍🏽 অয়ন চট্টোপাধ্যায়
৯০ মিনিটের নির্ধারিত সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়াল, তখন মাঠের সবুজ ঘাস রূপ নিল এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্রে। একদল দীর্ঘ আট বছরের সেমিফাইনালের খরা কাটানোর জন্য মরিয়াতো অন্যদল বিশ্বমঞ্চে নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের চরম নাটকীয়তায় নরওয়েকে ২–১ ব্যবধানে স্তব্ধ করে শেষ চারের টিকিট ছিনিয়ে নিল থ্রি-লায়ন্সরা। আর এই মহাকাব্যিক জয়ের মহানায়ক আর কেউ নন—ইংল্যান্ডের নতুন রাজপুত্র জুড বেলিঙহ্যাম।
⚽ ওডেগার্ডের মায়াজাল ও বেলিঙহ্যামের পাল্টা আঘাত ---
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখেছিল ইংল্যান্ড। পুরো ম্যাচে ৫৩ শতাংশ বল পজিশন ধরে রেখে, ৯১ শতাংশ নিখুঁত দক্ষতায় ৬০৬টি পাসের এক নিখুঁত বুনন তৈরি করেছিল গ্যারেথ সাউথগেটের দল। বিপরীতে নরওয়ে ৪৭ শতাংশ বল দখল এবং ৫৩৭টি পাসের পুঁজি নিয়ে প্রতি-আক্রমণের রণকৌশল সাজায়। প্রথমার্ধে থ্রি-লায়ন্সরা মাঝমাঠে আধিপত্য দেখালেও ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটায় নরওয়েই। দলের ক্রাফটসম্যান মার্টিন ওডেগার্ডের এক জাদুকরী পাস থেকে নরওয়েকে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ।
গোল খেয়ে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ। নরওয়ের গোলপোস্টে একের পর এক কামড় বসাতে থাকে তারা। পুরো ম্যাচে ইংল্যান্ডের ১৪টি শটের মধ্যে ৮টিই ছিল লক্ষ্যে। প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে (৪৫+২ মিনিটে) আসে সেই বহুপ্রতিক্ষিত ক্ষণ। অ্যান্থনি গর্ডনের এক মাপা পাস থেকে নরওয়ের রক্ষণভাগকে চূর্ণ করে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ইংল্যান্ডকে ১–১ সমতায় ফেরান জুড বেলিঙহ্যাম।
🛡️ স্টোনস-গুয়েহির টাইটানিয়াম প্রাচীর এবং হালান্দের ট্র্যাজেডি ---
এই ম্যাচের অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্দ বনাম ইংল্যান্ডের ডিফেন্সের লড়াই। কিন্তু মিয়ামির রাতে হালান্দকে বোতলবন্দি করে রাখার এক মাস্টারক্লাস দেখালেন ইংল্যান্ডের দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার—জন স্টোনস এবং মার্ক গুয়েহি। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ কতটা মরিয়া ছিল, তা প্রমাণিত হয় তাদের ৪৪টি অবিশ্বাস্য ক্লিয়ারেন্স এবং ১৪টি ট্যাকেলের মধ্যে ১৪টিই জেতার (১০০% সাকসেস রেট) পরিসংখ্যানে।
ইংল্যান্ডের এই টাইটানিয়াম প্রাচীরের সামনে পুরো ম্যাচে হালান্দ মাত্র ১০ বার বল স্পর্শ করার সুযোগ পান, যা মাঠে থাকা যেকোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। নরওয়ের হয়ে নেওয়া ১৩টি শটের মধ্যে হালান্দ ৩টি শট নিলেও তার ২টি রুখে দেন ইংলিশ প্রাচীর জর্ডান পিকফোর্ড। ম্যাচের ১০৫তম মিনিটে যখন কোচ স্টেল সোলবাকেন ক্লান্ত ও নিষ্প্রভ হালান্দকে তুলে জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেনকে মাঠে নামান, তখন ডাগআউটে বসে পায়ে ম্যাসাজ নিতে দেখা যায় এই তারকাকে, যা তাঁর মৃদু ইনজুরির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এই গোলখরা স্রেফ নরওয়ের বিদায় ঘণ্টা বাজায়নি, বরং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে হালান্দের টানা ১৪ ম্যাচে গোল করার যে অলৌকিক বিশ্বরেকর্ড ছিল, তারও নির্মম অবসান ঘটাল।
💥 অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তা, ভিএআর এবং রেফারির ভুল ---
নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর, অতিরিক্ত সময়ের মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় (৯৩ মিনিটে) ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেন বেলিঙহ্যাম। মর্গান রজার্সের এক দূরপাল্লার বুলেট গতির শট নরওয়ের গোলরক্ষক ওরিয়ান নিল্যান্ড ঠিকমতো গ্রিপ করতে না পারলে, চিলির মতো ধেয়ে এসে ফিরতি বলে নিজের জোড়া গোল সম্পূর্ণ করেন বেলিঙহ্যাম (২-১)। নরওয়ে অবশ্য গোল শোধের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, এমনকি অতিরিক্ত সময়ে তাদের একটি গোল ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির মাধ্যমে বাতিলও হয়ে যায়, কারণ গোলটির বিল্ড-আপে হালান্দ ইংল্যান্ডের এক ডিফেন্ডারকে ফাউল করেছিলেন।
ম্যাচের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি ছিল ১১৭ মিনিটে, যা রূপ নেয় এক খাঁটি ড্রামায়। নরওয়ের একটি ইন-সুইংগিং ফ্রি-কিক গ্রিপ করতে গিয়ে নিজের সতীর্থ মর্গান রজার্সের সাথে ধাক্কা খেয়ে বক্সের ভেতর মাটিতে পড়ে যান এবং চোট পান ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিকফোর্ড। কিন্তু রেফারি ক্লেমেন্ট টারপিন ভুলবশত এটিকে নরওয়ের ফাউল ভেবে ইংল্যান্ডের পক্ষে ফ্রি-কিকের বাঁশি বাজান। এই চরম ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়ার তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করলে রেফারি তাঁকে হলুদ কার্ড দেখান।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায়—দুর্দান্ত লড়াই করেও এক বীরত্বখচিত দুর্ভাগ্যপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল নরওয়ে। আর দীর্ঘ ৮ বছর পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রেখে ফুটবলকে 'ঘরে ফেরানোর' স্বপ্ন আরও একধাপ বাড়িয়ে দিল থ্রি-লায়ন্সরা।

0 comments:
Post a Comment