Jul 16, 2026

মেসির জাদুকরী দ্বৈত অ্যাসিস্ট: ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করে চূড়ান্ত খেতাবি লড়াই-এ আর্জেন্টিনা

Edit Posted by with No comments


মেসির জাদুকরী দ্বৈত অ্যাসিস্ট: ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করে চূড়ান্ত খেতাবি লড়াই-এ আর্জেন্টিনা

✍🏽 অয়ন চট্টোপাধ্যায়

আমেরিকার জর্জিয়ার আটলান্টা স্টেডিয়াম তখন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও মহানাটকীয় উত্তেজনার সাক্ষী। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালের ব্লকবাস্টার মহাযুদ্ধে মুখোমুখি হয়েছিল ফুটবল বিশ্বের দুই পরম চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে থ্রি-লায়ন্সদের ২–১ ব্যবধানে স্তব্ধ করে জয় ছিনিয়ে নিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। মাঠের তীব্র শারীরিক-ট্যাকটিক্যাল লড়াই আর মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ও রেফারিং বিতর্কের প্রবল ঝড় মাড়িয়ে, টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন করল লিওনেল মেসির দল। আগামী রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মহাকাব্যিক ফাইনালে বিশ্বজয়ের মুকুট ধরে রাখার চূড়ান্ত মিশনে তারা মুখোমুখি হতে চলেছে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনের।

📋 রণক্ষেত্র সাজানোর ছক: দুই দলের শুরুর একাদশ

ম্যাচের শুরুতেই দুই দলের দুই মাস্টার-ট্যাকটিশিয়ান টমাস টুহেল এবং লিওনেল স্কালোনি যে রণকৌশল মাঠে নামিয়েছিলেন, তা ছিল নিম্নরূপ:

আর্জেন্টিনা (৪-৪-২): এমিলিয়ানো মার্টিনেজ; নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো; জিউলিয়ানো সিমিওনে, লেয়ান্দ্রো পারেদেস, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অলিস্টার; লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ।

ইংল্যান্ড (৪-২-৩-১): জডার্ন পিকফোর্ড; রিস জেমস, জন স্টোন্স, মার্ক গুয়েহি, ডিজেড স্পেন্স; ডেক্লান রাইস, এলিয়ট অ্যান্ডারসন; মর্গান রজার্স, জুড বেলিংহাম, অ্যান্থনি গর্ডন ও হ্যারি কেন।

⚔️ প্রথমার্ধ: শারীরিক ফুটবল ও ঐতিহাসিক বৈরিতার বিস্ফোরণ

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে মাঠের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বৈরিতা এবং তীব্র মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রথমার্ধে সুন্দর ফুটবল খেলার চেয়ে একে অপরকে শারীরিক শক্তি দিয়ে ব্লক করা ও ফাউল করার প্রবণতাই বেশি ছিল, যার ফলে প্রথম ৩০ মিনিটে কোনো পক্ষই পোস্ট লক্ষ্য করে অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি। প্রথম ৪৫ মিনিটে দুই দল মিলিয়ে মোট ১৯টি ফাউল করে।

ম্যাচের ৩২ মিনিটে প্রথম বড় সুযোগটি পায় ইংল্যান্ড। ডেক্লান রাইসের এক ফ্রি-কিক থেকে ডি-বক্সে বল পেয়ে জন স্টোন্স দারুণ হেডার নিলেও তা পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। এরপর রিস জেমসের একটি বিপজ্জনক ও বাঁকানো ফ্রি-কিক আর্জেন্টিনার বিশ্বস্ত দেয়াল এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দারুণভাবে পাঞ্চ করে ফিরিয়ে দেন। আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথমার্ধের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পেয়েছিলেন এনজো ফার্নান্দেজ; ডি-বক্সের বাইরে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া তাঁর এক জোরালো শট ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করলেও তা ক্রসবারের সামান্য উপর দিয়ে চলে যায়।

মাঠের এই আগ্রাসী মেজাজের কারণে ম্যাচের ৩৭ মিনিটে ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসন (আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে বিপজ্জনক ট্যাকল করায়) এবং ৪১ মিনিটে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে রেফারি হলুদ কার্ড দেখান। বিরতির আগে বল পজিশনে আর্জেন্টিনা ৫৬ শতাংশ বনাম ৪৪ শতাংশে এগিয়ে ছিল, যা প্রথমার্ধের খেলা ০-০ সমতায় শেষ করতে বাধ্য করে।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য: লিওনেল মেসির দীর্ঘ ও বর্ণময় ফুটবল ক্যারিয়ারে এটিই প্রথমবার, যেখানে তিনি কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৮৬ সালের মারাদোনার সেই বিখ্যাত "হ্যান্ড অফ গড" কিংবা ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড পাওয়ার মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর স্মৃতি আজও এই দুই দলের ফুটবলীয় লড়াইকে বিশ্বমঞ্চের সেরা আকর্ষণে পরিণত করে রেখেছে।

🚀 দ্বিতীয়ার্ধ: গর্ডনের গোল ও স্কালোনির সেই মাস্টারস্ট্রোক

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আচমকা কাউন্টার অ্যাটাকে ম্যাচের চিত্র বদলে দেয় ইংল্যান্ড। ৫৫তম মিনিটে হ্যারি কেনের নিখুঁত পাস থেকে ডি-বক্সের ডান প্রান্তে বল পান মরগান রজার্স। তাঁর বাড়ানো মাপা ক্রস থেকে ছয় গজের বক্সে দারুণ এক গতিময় দৌড়ে এসে বল জালে জড়িয়ে দেন অ্যান্থনি গর্ডন (১–০)। ইংল্যান্ড এগিয়ে গিয়ে ফাইনালের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পরেই আর্জেন্টিনার নিকোলাস গঞ্জালেসকে ডি-বক্সের ভেতরে স্লাইডিং ট্যাকল করে একটি নিশ্চিত গোল বাঁচান ইংলিশ ডিফেন্ডার ডিজেড স্পেন্স।

১ গোলে পিছিয়ে পড়ে যখন ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই ৮০তম মিনিটে ম্যাচে আর্জেন্টিনার ভাগ্য পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তটি নেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে উঠিয়ে অল-আউট আক্রমণের জন্য স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজকে মাঠে নামান।

এই আক্রমণাত্মক পরিবর্তনের পর আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে ৬৪ শতাংশে নিয়ে যায় এবং পুরো ম্যাচে মোট ১৪টি শট (৬টি অন-টার্গেট) মেরে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে চূর্ণ করে দেয়:

এনজোর সমতাসূচক গোল (৮৫ মিনিট): ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত ও চোখধাঁধানো দূরপাল্লার শটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ১–১ সমতায় ফেরান মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। এই অতিমানবীয় গোলের নেপথ্যে অ্যাসিস্টের কারিগর ছিলেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি।

লাউতারোর জয়সূচক গোল (৯০+২ মিনিট): খেলা যখন নিশ্চিতভাবে অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে (৯২ মিনিটে) আটলান্টা স্টেডিয়ামজুড়ে উল্লাসের সুনামি বয়ে আনে আলবিসেলেস্তেরা। মাঝমাঠ থেকে লিওনেল মেসির বাড়ানো আরেকটি জাদুকরী ও নিখুঁত পাস ধরে বক্সে ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ে ইংল্যান্ডের জাল কাঁপিয়ে দেন সুপার-সাব লাউতারো মার্টিনেজ (২-১)।

🎙️ মাঠের ভেতরের মহা-বিতর্ক: রেফারিং ও ভিএআর ড্রামা

এই হাই-ভোল্টেজ সেমিফাইনালটি মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি একাধিক তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে:

১. রেফারি নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ: ফিফা এই ম্যাচের জন্য মরক্কো বংশোদ্ভূত আমেরিকান রেফারি ইসমাইল এলফাতকে নিযুক্ত করায় ম্যাচ শুরুর আগেই ব্রিটিশ ফুটবল মহলে তীব্র ক্ষোভ ছড়ায়। কারণ, এলফাত এর আগে মেসির যে ৫টি ম্যাচে রেফারি ছিলেন, তার প্রতিটিতেই আর্জেন্টিনা জিতেছিল। ফুটবল ভক্তরা এটিকে আর্জেন্টিনার পক্ষে "সুবিধাজনক" রেফারিং বলে অভিযোগ তোলে।

২. অ্যান্ডারসনের লাল কার্ড বিতর্ক: প্রথমার্ধের ৩৭ মিনিটে অ্যান্ডারসন যখন মেসিকে বিপজ্জনক ট্যাকল করেন, তখন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা জোরালোভাবে লাল কার্ডের দাবি জানালেও রেফারি কেবল হলুদ কার্ড দিয়ে বিষয়টি মেটান।

৩. এনজোর গোলের অফসাইড চেক: ৮৫ মিনিটে এনজোর গোলের ঠিক আগের বিল্ড-আপে মেসির পাস দেওয়ার মুহূর্তে আর্জেন্টিনার একজন খেলোয়াড় অফসাইড পজিশনে ছিলেন বলে দাবি করে ইংলিশ ডিফেন্ডাররা মাঠে রেফারির ওপর চড়াও হন। তবে ভিএআর দীর্ঘ সময় পরীক্ষা করে গোলটি বৈধ ঘোষণা করে।

৪. ডিজেড স্পেন্সের পেনাল্টি দাবি: ইংল্যান্ড যখন ১-০ গোলে এগিয়ে, তখন ডি-বক্সের ভেতরে নিকোলাস গঞ্জালেসকে স্পেন্সের করা স্লাইডিং ট্যাকলটিকে পেনাল্টি দাবি করে রেফারিকে ঘিরে ধরেন আর্জেন্টাইনরা। কিন্তু রেফারি এলফাত পেনাল্টি না দিলে ডাগআউটে চতুর্থ রেফারির সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়াতে দেখা যায় স্কালোনিকে।

🌐 মাঠের বাইরের যুদ্ধ: ফকল্যান্ডের ছায়া ও কোটি মানুষের পিটিশন

মাঠের বাইরের রাজনৈতিক যুদ্ধ এই ম্যাচটিকে আরও বেশি বারুদ ঠাসা করে তুলেছিল। ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল সোশ্যাল মিডিয়া ‘X’-এ ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ঐতিহাসিক সামরিক বিরোধ টেনে এনে ইংল্যান্ড দলকে সরাসরি "জলদস্যু দখলদার" (Pirate Usurpers) বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর এই উগ্র রাজনৈতিক মন্তব্য ফুটবলীয় চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়।

এর পাশাপাশি, টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টানাক রেফারিরা অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে—এই গুরুতর অভিযোগে অনলাইন দুনিয়ায় বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষ একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানায়। তবে সব বিতর্ক, ক্ষোভ আর প্রতিপক্ষের প্রতিরোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ৯২ মিনিটের সেই জাদুকরী নাটকে আরও একবার বিশ্বজয়ের মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে ফাইনালের টিকিট বুক করল আলবিসেলেস্তেরা।

0 comments:

Post a Comment