গ্লাসগোর মঞ্চে ‘গোল্ডেন গার্ল’ মীরাবাঈয়ের সোনালী হ্যাটট্রিক ও ভারতের জয়গাথা
অয়ন চট্টোপাধ্যায়
🏛️ গ্লাসগোর মঞ্চে ‘গোল্ডেন গার্ল’-এর পুনরাগমন ---
গ্লাসগোর আলোঝলমলে ইনডোর স্টেডিয়াম। চারপাশে হাজার হাজার দর্শকের অধীর অপেক্ষা, বাতাসে এক অদ্ভুত টানটান উত্তেজনা, আর ঠিক মাঝখানে সেই কাঙ্ক্ষিত ওয়েটলিফটিং প্ল্যাটফর্ম। ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের শুরুটা কেবল সাধারণ কোনো পদক জয়ের গল্প ছিল না; এটি ছিল আত্মবিশ্বাস, নিখুঁত কৌশল এবং অপরাজিত মানসিকতার এক রাজকীয় উপাখ্যান।
গ্লাসগো শহরটি ভারত এবং মীরাবাঈ চানুর জন্য এক গভীর আবেগের নাম। ঠিক ১২ বছর আগে, ২০১৪ সালের এই গ্লাসগোতেই মাত্র ২০ বছরের এক তরুণী হিসেবে তিনি রূপো জিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন। এরপর সময় গড়িয়েছে, ২০১৮-র গোল্ড কোস্ট এবং ২০২২-এর বার্মিংহামে সোনা জিতে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এবার ২০২৬ গ্লাসগোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অলিম্পিক পদকজয়ী বক্সার লাভলিনা বরগোঁহাইয়ের সাথে ভারতের জাতীয় পতাকা হাতে পুরো দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মীরাবাঈ। আর মূল প্রতিযোগিতার দিন মঞ্চে নেমে ইতিহাস গড়ে লিখলেন এক অনন্য হ্যাটট্রিক মহাকাব্য।
🏋️♀️ রেকর্ড ভাঙার খেলা ও নিখুঁত মাস্টারস্ট্রোক ---
মহিলাদের ৪৮ কেজি (কিছু রিপোর্টে ৪৯ কেজি উল্লেখ করা হয়েছে) বিভাগের ফাইনালে যখন মীরাবাঈ মঞ্চে উঠলেন, গ্যালারিতে তখন পিনপতন নীরবতা। স্ন্যাচ রাউন্ডের প্রথম প্রচেষ্টাতেই ঘটল অনভিপ্রেত অঘটন—বারবেল হাত থেকে ফস্কে যাওয়ায় প্রথম চেষ্টাটি ব্যর্থ হয়। তবে চ্যাম্পিয়নরা কখনো সাময়িক ব্যর্থতায় দমে যান না। দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ৮২ কেজি তুলে মঞ্চে নিজের দাপট পুনরুদ্ধার করেন। আর তৃতীয় প্রচেষ্টায় ঘটে সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্ত! দর্শকদের হৃদস্পন্দন থামিয়ে অবলীলায় ৮৫ কেজি তুলে নেন তিনি। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় পুরোনো সব নজির, তৈরি হয় নতুন কমনওয়েলথ গেমস রেকর্ড (CWG Record)। স্ন্যাচ রাউন্ড শেষেই নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৮ কেজির বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে যান মীরাবাঈ।
স্ন্যাচের এই বিশাল লিড মীরাবাঈকে দারুণ মানসিক স্বস্তি এনে দেয়। ক্লিন অ্যান্ড জার্ক রাউন্ডের শুরুতেই তিনি মঞ্চে নামেন ১০৫ কেজি তোলার লক্ষ্য নিয়ে। নিখুঁত টেকনিক ও অপরিসীম শক্তিতে দ্বিতীয় প্রচেষ্টাতেই তিনি তা তুলে ধরে হাসিমুখে ভারতের প্রথম স্বর্ণপদক নিশ্চিত করেন। তবে এটি ছিল শুধু গায়ের জোরের খেলা নয়, ছিল সূক্ষ্ম বুদ্ধির জয়। সামনেই সেপ্টেম্বর মাসে জাপানে আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস। তাই কোচিং স্টাফদের পরামর্শে নিজের সেরা রেকর্ড (২০৫ কেজি) ভাঙার বাড়তি ঝুঁকি না নিয়ে শরীরকে ইনজুরি-মুক্ত রেখেই অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে মোট ১৯০ কেজি তুলে গেমসের প্রথম সোনা ভারতের ঝুলিতে এনে দেন।
🥇 স্বর্ণালী হ্যাটট্রিক ও পোডিয়াম চিত্র ---
এই জয়ের সাথে সাথে মীরাবাঈ চানু কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে ভারোত্তোলনে স্বর্ণপদকের এক অনন্য ‘হ্যাটট্রিক’ সম্পন্ন করলেন (২০১৮, ২০২২, ২০২৬)। সেই সাথে ২০১৪-র রূপো মিলিয়ে এটি তাঁর সিডব্লিউজিতে চতুর্থ পদক। এই ইভেন্টে মীরাবাঈয়ের ধারেকাছে কারও পৌঁছানোর ক্ষমতা ছিল না। ওয়েলসের নিকোল রবার্টস রূপো এবং কেনিয়ার জ্যানেট ওডুওর (স্ন্যাচে ৫৮ কেজি তুলে দারুণ পারফর্ম করে) ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন।
🥈 ডেবিউতেই নতুন নজির: ঋষিকান্তের রুপোলি লড়াই ---
মীরাবাঈয়ের এই ঐতিহাসিক সোনার পরেই দিনের দ্বিতীয় নাটকীয়তা উপহার দেন মণিপুরের তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল অ্যাথলেট ঋষিকান্ত সিং। পুরুষদের ৬০ কেজি বিভাগে এটি ছিল তাঁর প্রথম কমনওয়েলথ গেমস ডেবিউ। অনভিজ্ঞতার ছাপ মুছে ফেলে স্ন্যাচ রাউন্ডের তৃতীয় প্রচেষ্টায় ১২১ কেজি তুলে নতুন গেমস রেকর্ড গড়ে সবাইকে চমকে দেন এই ভারতীয় তারকা।
তবে সোনার লড়াইয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ান মালয়েশিয়ার শক্তিশালী প্রতিযোগী মোহাম্মদ আনিক কাসদান। স্ন্যাচে ঋষিকান্তের সাথে ১২১ কেজির সমতা থাকলেও, ক্লিন অ্যান্ড জার্কে মালয়েশিয়ার প্রতিযোগী অবিশ্বাস্যভাবে ১৫২ কেজি (নতুন রেকর্ড) তুলে মোট ২৭৩ কেজির নতুন গেমস রেকর্ডে সোনা জিতে নেন। অন্যদিকে ঋষিকান্ত প্রথম প্রচেষ্টায় ১৪৩ কেজি তোলার পর শেষ দুটি চেষ্টায় (১৫১ কেজি) সফল না হওয়ায় মোট ২৬৪ কেজি তুলে ভারতের জন্য এক গৌরবময় রৌপ্যপদক নিশ্চিত করেন। এই বিভাগে কেনিয়ার জোশুয়া মবোয়া ২৬০ কেজি তুলে ব্রোঞ্জ পান।
🥉 শক্তির মহড়া: প্যারা-পাওয়ারলিফটিংয়ে ঝন্ডুর ব্রোঞ্জ ---
ভারতের এই দুর্দান্ত দিনটিকে আরও বর্ণময় করে তোলেন প্যারা-পাওয়ারলিফটার ঝন্ডু কুমার। পুরুষদের হেভিওয়েট বিভাগে কোনো প্রতিপক্ষের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি নিজের সেরা শক্তি প্রদর্শন করেন। বারবেলে অবলীলায় তুলে নেন ১৯০ কেজি ওজন। তাঁর এই অদম্য শক্তির প্রদর্শনীতে চলতি গেমসে প্যারা-পাওয়ারলিফটিংয়ে ভারতের প্রথম ব্রোঞ্জ পদকটি নিশ্চিত হয়।
🇮🇳 গ্লাসগোতে তেরঙ্গার জয়জয়কার ---
গ্লাসগো ২০২৬-এর এই একটি দিনেই ভারতের অ্যাথলেটরা দেখিয়ে দিলেন কেন বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় ভারোত্তোলনের নাম আজ সসম্মানে উচ্চারিত হয়। পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এবং নতুন রেকর্ডের পথ ধরে ভারতের একের পর এক পদকজয় গেমসের পরবর্তী দিনগুলোর জন্য তৈরি করে দিল এক নতুন উদ্দীপনা ও আশার আলো।
🇮🇳 ভারতের পদক সংক্ষেপ ---
স্বর্ণপদক (🥇): মীরাবাঈ চানু (মহিলাদের ৪৮ কেজি ভারোত্তোলন)
রৌপ্যপদক (🥈): ঋষিকান্ত সিং (পুরুষদের ৬০ কেজি ভারোত্তোলন)
ব্রোঞ্জপদক (🥉): ঝন্ডু কুমার (পুরুষদের হেভিওয়েট প্যারা-পাওয়ারলিফটিং)

0 comments:
Post a Comment