দোসর
শ্রী অয়ন চট্টোপাধ্যায়
রাত তখন প্রায় বারোটা। বাইরে শোঁ শোঁ
করে শীতের ঠান্ডা বাতাস বইছে, আর জানলার
শার্সিগুলো মৃদু শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে। জাফর সাহেবদের পুরনো বাড়িটা তখন একদম
নিস্তব্ধ;
কেবল দেয়ালঘড়ির পেণ্ডুলামের টিক্-টিক্ শব্দটাই সেই
নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলছিল।
জাফর সাহেব তাঁর সাত বছরের একরত্তি মেয়ে মিতুকে নরম কম্বলটা ভালো করে গায়ে
জড়িয়ে দিলেন। কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে টেবিল ল্যাম্পটা নিভিয়ে দরজার দিকে পা
বাড়াতে যাবেন, ঠিক তখনই মিতু খসখসে গলায় কাঁপা
কাঁপা স্বরে ডাকল, “বাবা... যেও না!”
জাফর সাহেব পেছন ফিরে তাকালেন। আধো
অন্ধকারে দেখলেন, মিতু বিছানায় শুয়ে
বড় বড় চোখ মেলে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর ছোট্ট মুখটায় এক অদ্ভুত, বুক কাঁপানো আতঙ্ক। মিতু ফিসফিস করে বলল, “বাবা, আমার খুব ভয় করছে।
খাটের নিচে কেউ একটা লুকিয়ে আছে... আমি স্পষ্ট ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।”
জাফর সাহেব স্নেহের হাসি হাসলেন।
বাচ্চাদের এই বয়সে এমন অমূলক ভয় হওয়া স্বাভাবিক। মেয়ের মনের আতঙ্ক দূর করার জন্য
তিনি অভয় দিয়ে বললেন, “পাগলি মেয়ে! খাটের
নিচে আবার কে থাকবে? দাঁড়া, আমি নিজেই দেখে দিচ্ছি।”
তিনি হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসলেন। খাটের ঝুলন্ত চাদরটা ধীরে ধীরে এক হাত
দিয়ে সরিয়ে তিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন নিচটায় উঁকি দিলেন।
কিন্তু পরমুহূর্তেই জাফর সাহেবের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে গেল।
চোখের পলক ফেলার ক্ষমতাটুকুও তিনি হারিয়ে ফেললেন।
খাটের নিচে, ধুলোমাখা মেঝের
একদম কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছে একটি ছোট্ট মেয়ে। পরনে হুবহু মিতুর সেই গোলাপি ফ্রক, চুলে একই রকম লাল ফিতে বাঁধা। অবিকল তাঁর মেয়ে মিতু—শুধু আতঙ্কে ওর চোখ দুটো কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, আর মুখটা ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে।
জাফর সাহেব বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ঠিক তখনই খাটের নিচের সেই মেয়েটি
বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শুকনো, থরথর গলায় ফিসফিস
করে উঠল—
“বাবা... খাটের ওপর ওটা কে শুয়ে আছে?”
জাফর সাহেব সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন।

0 comments:
Post a Comment