প্রাত্যহিক জীবনে সুভাষিতম্
শ্রী অয়ন চট্টোপাধ্যায়
বৃক্ষান্ ছিত্ত্বা পশূন্ হত্বা কৃত্বা রুধিরকর্দমম্।
যদ্যেবং গম্যতে স্বর্গে নরকঃ কেন গম্যতে॥
বঙ্গানুবাদ:
গাছপালা কেটে, পশুপাখি হত্যা করে এবং রক্ত ও কর্দমাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে যদি মানুষ মনে করে স্বর্গে (প্রগতি বা পরম সুখের স্থানে) পৌঁছানো যাবে, তবে নরকে যাবে কে? অর্থাৎ নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংসের পথে কখনোই মানুষের কল্যাণ বা স্থায়ী সুখ আসতে পারে না; বরং তা নিশ্চিত বিনাশ ডেকে আনে।
প্রাত্যহিক জীবনে এই শ্লোকের প্রয়োগ ---
১। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন রোধ ও বৃক্ষরোপণ: নগরায়ন বা গৃহনির্মাণের অজুহাতে অবাধে গাছ কাটা বন্ধ করা এবং নিজ বাসস্থান, ছাদবাগান ও এলাকায় নিয়মিত বৃক্ষরোপণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা।
২। জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীর প্রতি অহিংসা: বাণিজ্যিক স্বার্থ বা বিনোদনের নামে বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য নিরীহ জীবের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস না করে তাদের সাথে সহাবস্থানের মানসিকতা গড়ে তোলা।
৩। ভোগবাদ নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই জীবনযাত্রা (Sustainable Living): অন্ধ ভোগবিলাসের কারণে অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি, নদী-জলাশয় দূষণ এবং অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির অপচয় কমিয়ে একটি পরিবেশবান্ধব দৈনিক রুটিন মেনে চলা।
৪। ‘উন্নয়ন’-এর বিভ্রান্তিকর সংজ্ঞা পরিমার্জন: নদী ভরাট, পাহাড় কাটা ও অরণ্য ধ্বংস করে গড়ে ওঠা ক্ষণস্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে প্রকৃত 'উন্নয়ন' না ভেবে পরিবেশসম্মত টেকসই প্রগতির (Green Development) পক্ষে সোচ্চার হওয়া।
৫। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা: বর্তমানের বিলাসের জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বায়ু, জল ও মাটিকে বিষাক্ত না করে একটি বাসযোগ্য, নির্মল ও সবুজ পৃথিবী রেখে যাওয়ার ব্রত গ্রহণ করা।
৬। জল ও ভূগর্ভস্থ সম্পদের অপচয় রোধ: ব্রাশ করার সময় বা স্নানে অকারণে জল অপচয় না করা, গৃহস্থালিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting) এবং ভূগর্ভস্থ জলের ভারসাম্য রক্ষা করা।
৭। সবুজ উপহার ও পরিবেশবান্ধব উৎসব: সামাজিক অনুষ্ঠানে প্লাস্টিক বা কৃত্রিম সামগ্রীর বদলে চারাগাছ উপহার দেওয়া এবং উৎসব-অনুষ্ঠানে শব্দ ও বায়ুদূষণকারী আতশবাজি বা বিষাক্ত রঙের ব্যবহার বর্জন করা।
৮। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক (Single-use Plastic) বর্জন: বাজার ও কেনাকাটায় কাপড়ের থলে ব্যবহার করা এবং নিত্যদিনের জীবনে প্লাস্টিকের বোতল, স্ট্র ও প্যাকেটজাত বর্জ্য সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা।
৯। খাদ্য অপচয় রোধ ও কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাস: খাদ্য অপচয় বন্ধ করা; কারণ অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদনের সাথে বিপুল পরিমাণ বনভূমি ধ্বংস, জল অপচয় ও মিথেন গ্যাস নিঃসরণ সরাসরি জড়িত।
১০। বর্জ্য পৃথকীকরণ ও জৈব সার প্রস্তুতি (Waste Segregation): বাড়ির রান্নাঘরের পচনশীল বর্জ্য আলাদা করে গাছের জন্য জৈব সারে রূপান্তর করা এবং ‘Reduce, Reuse, Recycle’ নীতি প্রাত্যহিক রুটিনে পরিণত করা।
১১। শক্তি সংরক্ষণ ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার: অপ্রয়োজনে ফ্যান, আলো বা এসি চালিয়ে না রাখা এবং সম্ভব হলে সৌরশক্তি বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ানো।
১২। পরিবেশবান্ধব যাতায়াত (Green Commute): অল্প দূরত্বের যাতায়াতে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে হাঁটা, সাইকেল ব্যবহার অথবা নিয়মিত গণপরিবহন ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ কমানো।
১৩। নাগরিক প্রতিবাদ ও পরিবেশ সচেতনতা: পাড়া বা শহরের পুকুর-জলাশয় ভরাট এবং অকারণে শতাব্দীপ্রাচীন গাছ কাটার মতো স্থানীয় ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে সামাজিক স্তরে সোচ্চার হওয়া ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

0 comments:
Post a Comment