Jul 21, 2026

বুট জুতোয় ‘ঈশ্বর-কণা’ ও শর্টস পরা খোদা: ফুটবল-ভজন

Edit Posted by with No comments


 বুট জুতোয় ‘ঈশ্বর-কণা’ ও শর্টস পরা খোদা: ফুটবল-ভজন

✍🏽 অয়ন চট্টোপাধ্যায়

     মাঠের সবুজ ঘাসে ৯০ মিনিটের ফুটবল খেলা যখন শেষ হয়, গ্যালারির উন্মাদনা তখন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক থিয়েটারে রূপ নেয়। খেলাকে স্রেফ্ খেলা হিসেবে দেখার চোখ দুটো হারিয়ে গেলে যা হয়—পরিশ্রমবিমুখ মানুষ তখন কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা অর্জিত পারফরম্যান্সকে 'ঐশ্বরিক' ভেবে বসে। আর এই অন্ধ ভক্তি ও সস্তা থিওলজির সার্কাস নিয়েই আজকের এই ক্ষুরধার ব্যবচ্ছেদ।

👑 যখন ফুটবলাররাই ‘মেসিয়াহ’ ---

     আগে শুধু হিন্দুদের অবাস্তব অবতারবাদ দেখে করুণা হতো, এখন তো ক্রুশ ফেলে দেওয়া খ্রিস্টানদের দশা দেখেও মায়া লাগে! মেসি, রোনাল্দো কিংবা নেইমার—কাউকে না কাউকে ভগবানের আসনে না বসালে এদের রাতের ঘুম আসে না। লিয়োনেল মেসিকে রাতারাতি 'গড' বানিয়ে দেওয়ার এই যে হিড়িক, তা দেখে মনে হয় ফুটবল মাঠটা খেলার জায়গা নয়, বরং একটা গ্লোবাল উপাসনালয়।

     তারকাকে 'মেসিয়াহ' (Messiah) কিংবা 'ডিউস' (Dios) বানানোর এই সস্তা চেষ্টা দেখে ফুটবল দেবতারও বোধহয় এখন ভক্তির চোটে রিটায়ারমেন্ট নিতে ইচ্ছে করবে! সকলেই নিজ নিজ ঈশ্বরকে মাঠে নামিয়ে রীতিমতো শর্টস পরিয়ে দৌড় করাচ্ছে। এদের ভক্তি দেখলে মনে হয়, রেফারি পকেটে হলুদ আর লাল কার্ড নয়, আসলে স্বর্গের চাবি নিয়ে ঘোরেন!

● পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন: প্রিয় তারকা মাঠে বল ড্রিবল করলে নাকি মহাজাগতিক মিরাকল ঘটে, আর পা ছোঁয়ালে ঘাস থেকে নিঃসৃত হয় অলৌকিক ‘ঈশ্বর-কণা’! এই অন্ধভক্তির রোগটা যে কতটা সংক্রামক, তা আজকাল বড় বড় ফুটবল বোদ্ধাদের কণ্ডিশন দেখলেই টের পাওয়া যায়।

💧 ‘চরণামৃত’ বনাম অলিম্পাসের লুডু খেলা ---

     ভক্তকূলের অবচেতন অবতারবাদের দশা এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের প্রিয় তারকা যদি মাঠের মধ্যে বোতল থেকে জল খায়, এরা ওটাকেও ‘পবিত্র জল’ বা ‘চরণামৃত’ ভেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক ঠুকতে পারে! তারা পাস বাড়ালে সেটা কেবল একটা অ্যাসিস্ট নয়—সরাসরি স্বর্গ থেকে আসা আকাশবাণী! এমন কি, বক্সে ফাউল খেয়ে পড়ে গেলে এরা ওটাকে ভক্তদের জন্য ‘মাঠে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম’ বলে ভজনও গাইতে পারে! ভাইরে ভাই, খেলা চলছে, নাকি অলিম্পাসের দেবতারা হাফ-টাইমে নেমে ট্যাকটিক্স ঠিক করে দিয়ে লুডো খেলছেন ? হে ভক্তকূল! ভক্তির ঠেলায় নিজেদের সৃষ্টিকর্তাকে অন্তত রিটায়ার্ড ফুটবলার বানাবেন না!!!

🛡️ 'শিরক' বনাম 'শর্টস্: লজিকের এক আপাত স্যালুট ---

     এই পুরো ঈশ্বর-কণার সার্কাসের মাঝে প্রথমার্ধে একমাত্র মুসলিম সমর্থকদের জন্যই কিছুটা স্বস্তি আর স্যালুট তোলা যাচ্ছিল। ইসলাম ধর্মে সৃষ্টিকর্তার সমকক্ষ কাউকে ভাবা বা 'শিরক' করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই খাতায়-কলমে তারা এখনো পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তাকে অন্তত 'প্লেয়ার' বানিয়ে দেয়নি। বরং, 

● ১১ বনাম ১১ জনের লড়াই: একমাত্র মুসলিমরাই ফুটবলকে অলৌকিক জাদুর থিয়েটার না বানিয়ে ১১ জনের মগজ আর বুটের লড়াই হিসেবে দেখে।

● সম্মানের সীমারেখা: তারা গোল হতে দেখলে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে মাঠের পারফরম্যান্সকে বাহবা দেয়, কিন্তু আবেগ যতই থাক—কখনোই কোনো মানুষকে আল্লাহ্-র আসনে বসানোর কথা মুখেও আনে না।

● খুতবার রেহাই: ভাগ্যিস তারা ফুটবলটাকে খেলাই মনে করে, নাহলে তো ভক্তদের মতো জুমার খুতবায় এলএমটেন (LM10) বা সিআরসেভেন (CR7)-এর নাম চলে আসত!

   তবে একটু দাঁড়ান! তারা মুখে অবশ্য 'শিরক' নিষিদ্ধ বলে খুব লজিক দেখায়, কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পেনাল্টি মারার আগে ঠোঁট নাড়লেই টিকটকে আবেগঘন স্ট্যাটাস ঠুকে দেয়—"রোনাল্ডো নাকি বিসমিল্লাহ বলে শট মেরেছে!" মোহাম্মদ সালাহ গোল দিলে এরা লিভারপুলের জার্সি গায়ে দিয়েই যেন জুমার খুতবা শোনার আধ্যাত্মিক ফিল পেয়ে যায়! মুখে কেউ আল্লাহ্-কে আর্জেন্টিনার 'কোচ' বা পর্তুগালের 'প্লেমেকার' বানাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু অবচেতনে মনে মনে ফুটবলারদের ঠিকই ধর্মের খলিফা বানিয়ে বসে আছে! এই সর্বজনীন অন্ধ অবতারবাদ দেখলে ফুটবল দেবতা এবার আর রিটায়ারমেন্টের আবেদন করবেন না, সরাসরি ইস্তফা দিয়ে দেবেন!

🎯 রেফারির শেষ বাঁশি ---

     বাকিদের ঈশ্বর ও খলিফারা নাকি আজকাল বুট জুতো আর শর্টস্ পরে মাঠে নেমে নিখুঁত থ্রু-পাস বাড়ায়, আর খোদা নেমে বাঁশিতে ফুঁ দেয়! একটা ৯০ মিনিটের খেলাকে যারা আক্ষরিক অর্থেই ধর্মগ্রন্থ আর পুজো বানিয়ে ফেলেছে, তাদের এই মগজহীন কণ্ডিশন দেখলে এখন আর রাগ হয় না, করুণা হয়। জার্সি, ধর্ম আর স্লোগানের লেবেলটা আলাদা হতে পারে, কিন্তু দিনশেষে মগজ গলে পচে যাওয়া অন্ধভক্তির এই সার্কাসটা সবার জন্যই একদম সমান!

0 comments:

Post a Comment