Jun 5, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with 2 comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- মহাশ্বেতা বসু

 

শব্দটি আমার এক ভাই এর মুখে প্রথম শুনেছিলাম। তখন মনে হয়েছিলো, এরকমও হয় নাকি ? ডিজিটাল প্লাটফর্মে সাহিত্য সৃষ্টি, কখনও সম্ভব?

আমি আবার চিরকালই একটু সেকেলে মানুষ। আমার কাছে সাহিত্য মানেই হলো, তার সাথে বই-এর পৃষ্ঠার গন্ধটা ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকবে। মোবাইল বা ল্যাপটপ এর যান্ত্রিক হরফে সাহিত্য কি আদৌ জমবে ? প্রশ্নটা এসেছিল মনে।

কিন্তু না- আমার সমস্ত ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করে আমাদের সামনে এলো সাহিত্য সৃষ্টির এক নতুন মাধ্যম, এক সম্পূর্ণ নতুন মোড়কে।

অপূর্ব সাজে, দুর্দান্ত সব কাব্য-ভাণ্ডার নিয়ে হাজির হলো নেট ফড়িং।

তারপর দিন যত এগোল ক্রমশ সাক্ষী হয়ে রইলাম তার বিকাশে।

অনুভব করলাম ভিজে ঘাসে আলতো নাড়া দিয়ে ঠিক যেভাবে ফড়িংগুলো নেচে বেড়ায়, ঠিক সেভাবেই নেট ফড়িংও নেচে বেড়াচ্ছে পাঠকদের মনে।

এখন প্রতি রবিবার সকালেই অপেক্ষা করে থাকি কখন সম্পাদক ভাই নেটফড়িং এর সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশ করবে।

আমার নিজের কিছু সৃষ্টিও এখন জায়গা পায় নেট ফড়িং এর পাতায়। এর জন্য আমি সত্যি আনন্দিত ও গর্বিত। নিজের সৃষ্টিকে নেট ফড়িং এর মাধ্যমে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে।

তবে এর পেছনে যাদের মূল অবদান তাদেরকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। আমার বিশ্বাস ওদের এই নিরলস পরিশ্রম অনলাইন ম্যাগাজিন নেট ফড়িং-কে আরো শীর্ষে নিয়ে যাবে।।

Jun 4, 2021

"আইসক্রিমওয়ালা" - সায়ন বণিক

Edit Posted by with No comments

 


আইসক্রিমওয়ালা

সায়ন বণিক

 

“এই কুলপি-কুলপি— পাঁচ টাকা, দশ টাকা" চেঁচাতে চেঁচাতে গ্রামের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক বৃদ্ধলোক। বয়স কম করে বললেও ষাট-পয়ষট্টির অধিক না।

নদীর মাঝে পা রেখে যে দূর দিকের গ্রাম দেখা যায়, সেখান থেকে আরও ভিতরে গিয়ে দুই ক্রোশ পার হয়ে লোকটির বাড়ি। সে জায়গায় এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। দু-তিনটে গেরস্ত বাড়ির আলো আছে ঠিকই, কিন্তু মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ সংযোগ থাকে না। পাছে, গ্রামের মানুষগুলো গরমকালে একটু পাখার হাওয়া খেতে খেতে তাদের বাড়িতে বসে গল্প জমিয়ে ফেলে, এই ভয়ে বিদ্যুৎ থাকলেও তারা ‘না’ বলে ফিরিয়ে দেয়।

অসিত দাস। বামুন ঘরের মানুষ। তার বাবাও ছিলেন আইসক্রিম ব্যবসায়ী, তাঁর ছেলেটিও ধরেছে আইসক্রিমের ব্যবসা। গ্রামের মানুষেরা অসিতদা-অসিতদা বলেই তাকে ডাকে। খুব চেনা মুখ এই অসিতদা, যদিও ‘অসিতদা-র আইসক্রিম’ বলাই ভালো।

গরম পড়লেই, ছোট থেকে বড়োদের একটাই নাম জপ হতে থাকে— অসিতদার আইসক্রিম, অসিতদার আইসক্রিম। ছোট-ছোট শিশুরা তাকে না চিনলেও তার গাড়ির ওপর বড়ো করে ‘অসিতদার আইসক্রিম’ লেখাটি দেখে ঠিক চিনে ফেলে। তখন কেউ বা, কাকু কেউ বা দাদু এসব বলেই তাকে সম্বোধন করে। আর, গ্রামের দিনমজুর-কৃষক ওরা তো সবাই প্রায় তার কাছ থেকে আইসক্রিম নেয়— আবার কেউ কেউ তার বাবার কাছ থেকেও নিত একসময়।

সেই গ্রামের দিনেরবেলা যেমন চারিদিকটা ঝলমলে, সূর্যালয়ে ছোট ছোট শিশুরা খেলে, কৃষকেরা মাঠে চাষ করে, দিনমজুরেরা শহরে আসে বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করতে, ঠিক তেমনি রাতেরবেলাটা একদম অন্যরকম। রাতের গ্রামের পরিবেশটা এখানে খুব শান্ত হয়ে ওঠে— অবশ্য, শান্ত বললেও ঠিক মানায় না। ঝিঁ-ঝিঁ পোকাদের ডাকগুলি রাত হলেই কানের মধ্যে বাজা শুরু করে দেয় একভাবে। সেখান থেকে কিছুটা দূরেই একটা মরা নদী বয়ে গেছে গ্রামের ভিতর দিয়ে। বর্ষার সময় বড়ো নদীর জল এই নদীতে প্রবেশ করে আবার জীবন্ত করে তোলে। আবার বন্যা হলে গ্রামের মাঠে-ঘাটে জল উঠে যায়, চাষিরা চাষ করতে পারে না বাড়িতে বসে থাকে। কিন্তু তাদের কর্ম্মের শরীর, বাড়িতে বসে থাকলেই বা কি ! তাদের বউ-এর সঙ্গে কাজ-কর্ম্ম করতে থাকে। তাদের বউগুলিও যে বসে থাকে না, ওরাও কাজ করে— বাড়িতে বসে বিড়ি বাঁধে। সেই গ্রামে, দুপুরের পর বিকেলে গেলেই দেখতে পাওয়া যায় তাদের বৌয়েরা বিড়ি বাঁধতে বসে আছে।

“কাকু, কাকু ! কাঠি আইসক্রিম আছে তোমার কাছে?" বৃদ্ধ লোকটির আওয়াজ শুনতে পেয়ে এক বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বাচ্চা তার কাছে জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ, আছে। কত টাকার লইবা বাবা?"

“পাঁচ টাকারটা দাও।

গাড়ির ভেতরটা খুলে পাঁচ টাকার একটা আইসক্রিম বাচ্চাটির হাতে দিয়ে আবার হাঁকতে হাঁকতে চলে গেল। লাল রঙের একটি আইসক্রিম হাতে পেয়ে মহানন্দে খেতে খেতে বাড়ির দিকে আবার চলে গেল।

“অসিতদা ! কেমন আছেন?" আইসক্রিম ফ্যাক্টরির একটা লোক জিজ্ঞেস করল।

“এই আছি..." কিছু বলতে গিয়ে আটকে গেল।

“আপনাকে সেরকম একটা দেখা যাচ্ছে না— কি ব্যাপার বলুন তো! অন্যকোনো ফ্যাক্টরির সন্ধান পেলেন নাকি আবার" লোকটি বিকটরকম দৃষ্টিভঙ্গি করে অসিতবাবুর দিকে তাকালেন।

“না বাবা ! শরীরটা কয়দিন ধইরে দেখি খুব খারাপ যাইতেছে। আর এখন ব্যবসাও সেরকম একটা নাই।" ইতস্ততভাবে বলতে থাকলেন অসিতবাবু।

তার কথা শুনে নিয়ে লোকটি বলল, “শরীর খারাপ হলে বাড়িতে থাকতে পারেন তো। কেন ফালতু এতটা দূর প্রতিদিন শহর থেকে গ্রামে নিয়ে আইসক্রিম বেঁচেন !" তার কষ্ট দেখে লোকটিরও দুঃখ জাগলো।

“বেঁচিয়া যাইতে হয় এই পেটের দায়ে। আর তাছাড়া, আমাদের গ্রামের বাচ্চাগুলো খুব ভালোবাসে এই অসিতদা-র আইসক্রিম খাইতে।" কথা না বাড়িয়ে গাড়ি নিয়ে ফ্যাক্টরির ভিতর ঢুকল। গাড়ির ভিতর বরফ বসিয়ে আইসক্রিম ঢুকিয়ে নিয়ে ঢাকনাটা লাগিয়ে দিল।

“নিজের শরীরের একটু খেয়াল রাখবেন অসিতদা। দিন দিন যে শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে।"

"হ্যাঁ বাবা। আছিই তো আর কয়েকটা দিন— এখন আর সংসারটাই চলে না যে !" প্রথম কথাটা জোরে বলে নিয়ে, একাই একাই বলতে থাকল বাকি কথাগুলো।

গাড়িটা টানতে টানতে আবার গ্রামের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করল বৃদ্ধ লোকটি।

অসিতবাবুর বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন ‘পেপসি’ খুব চলত। থার্মোকলের বাক্সে রেখে ‘পেপসি-পেপসি’ বলে তার বাবাও চেঁচাতে থাকতো। বাবার হেঁকে যাওয়ার ধারাটাই পেয়েছে ছেলে। তার বাবার কাছে আইসক্রিম সেরকম একটা পাওয়া যেত না, পেপসিটাই বেশি রাখত। ভর্তি একটা ছোটো প্যাকেটের মধ্যে ফলের রসের মত তরলকে কঠিন বানিয়ে বিক্রি করত। সেই প্যাকেটের একটা দিক দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে, চুষে চুষে খেত ছেলেমেয়েরা।

অসিতবাবুর ক্লাস সেভেনে থাকাকালীন তার বাবা মারা যায়। তার ঠিক এক বছরের মাথাতেই মা মারা যায়। স্বাভাবিকভাবেই সংসারের হালটা তার মাথায় ধুপ করে পড়ে বসে। তার সাত বছরের একটা ছোট বোন ছিল। তার বোনটিও অসিতের অধীনে চলে আসে। বাবা মা-এর মৃত্যুর পর অসিত কাজের সন্ধানে এ জায়গায় - ও জায়গায় খুঁজতে থাকে। শেষপর্যন্ত তার পছন্দমত কাজ খুঁজে না পাওয়ায়, বাবার ব্যবসাটাই করতে শুরু করে। বোনকে ম্যাট্রিক পাশ করানোর পর বিয়ে দিয়ে দিতে হল। চার-পাঁচ বছর পর অসিতবাবু নিজেও কায়েস্ত ঘরের একটা মেয়েকে বিয়ে করে, বামুনের ঘরে আনলেন। অল্প অল্প করে ঘরের ভাঙ্গা ছাউনি ঠিক করলেন— সামনে বেড়া দিয়ে ঘিরে দিলেন। সেখানে তার আইসক্রিমের গাড়িটা রেখে দিতেন। তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্মাল, তাকে মানুষ করে, অল্প-কিছু লেখা-পড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়ে দিল। এমনভাগ্য অসিতদার, মেয়েটিকেও দূরে বিয়ে দিয়ে দিল— সেও এখন দেখতে আসতে পারে না তার বাবা-মাকে। কোনরকমভাবেই দিনযাপন করতে থাকে জীর্ণ বৃদ্ধ এবং আইসক্রিমওয়ালা।

“গিন্নি ! দিন-দিন যে অবনতি হইতেছে আমাদের। এই অসিতদা আর অসিতদা নাই গো— বাজারে নাকি এখন বড়ো বড়ো কোম্পানির আইসক্রিম আসিয়াছে। বলাবলি করছিল ফ্যাক্টরির লোকেরাই।”

“কও কি? আমাদের যে পেটে মরতে হইবে, তা হইলে !”

“জানো, আজ পঞ্চাশটা টাকারও বিক্রি করতে পারি নাই। সারাদিন গাধার মত পরিশ্রম করিয়া, এদিক-সেদিক গ্রাম-গঞ্জে ঘুরিয়া যখন দুইজনের সংসারের জন্য খাওয়ার খরচটাই না ওঠে, তা হইলে তো একদিন না খাইতে পারিয়াই মইরা যাইব।”

বউ তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে দেয়। সেও যে নিরুপায়— বিড়ি বেঁধে কি আর সংসার চলে; স্বামীকে যে যথাসাধ্য উপার্জনটুকু করতে হয়। এমন কপাল তাদের, একটা পুত্রসন্তানও জন্ম দিতে পারেনি তারা। যদিও, সব ছেলেরাই যে বাবা-মাকে দেখে বেড়াবে, সেটাও নয়। তারাও যে এখন আধুনিক, নিজেরটা খুব বুঝে নেয়। যদি সেই পুত্রসন্তান-ও তাদের না দেখত, পিছে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিত। এইসব ভেবে, সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কষ্ট পেলেও তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে।

তিনি বললেন, “কখনও ভাবিনাই এই শেষ বয়সটায় আসিয়া আবার কষ্ট ভোগ করিতে হইবে।

আজকে ওই লোকগুলো বলাবলি করিতেছিল, ভ্যাদিলাল— কোলিটিয়ালস্ কি কি বা নতুন নতুন রকম কোম্পানির আইসক্রিম চলিতেছে বাজারে। গ্রামের লোকগুলাও নাকি এখন ওইসব কোম্পানির আইসক্রিম কেনে।

লোকাল আইসক্রিম যে আর চলে না গো— লোকাল আইসক্রিম যে আর চলে না। মানুষেরা ওই নতুন কোম্পানির আইসক্রিম পাইয়া এই লোকাল আইসক্রিমকেই ভুলিয়া গেছে। জানিনে গিন্নি, তোমার এই অসিতদা-র আইসক্রিম চলবে কিনা কখনও!”

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাওয়ার পাতেই কথাগুলো বলছিল অসিতবাবু। এদিকে তার গিন্নি মাথার ওপর পাখার হাওয়া করেই চলেছে। ভাঙ্গা বেড়ার ভিতরে রাখা ছিল তার আইসক্রিমের গাড়িটি। দূর থেকেও, তার ওপরে ‘অসিতদা-র আইসক্রিম’ লেখাটি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।


"তোমায় চাহি রে" - মিলন পুরকাইত

Edit Posted by with 1 comment

 


তোমায় চাহি রে

মিলন পুরকাইত

 

হুট করে ছোড়দির বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো। মেঘমালার হোস্টেলে ফোন এলো আর বাড়ি ফিরেই পিসির কাছে প্রশ্নের ঝুড়ি খুলে বসলো।

"কোথায় বিয়ে, কার সাথে বিয়ে" এই হাজার প্রশ্নের উত্তরে পিসি এক কাপ চা আর ডিমের পরোটা এনে পাশে বসলো

"তুই আসবি বলে আমি আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। দেখ তো খেয়ে কেমন হয়েছে "

পিসিকে জড়িয়ে হেসে উঠলো মেঘমালা "সেই ছোট থেকে এটাই করে এসেছো তুমি। যখন যখন উত্তর দিতে পারো না আমার প্রশ্নের তখনই এমনটা করো। কিন্তু আজ না বললে আমি কিচ্ছুটি মুখে দেবো না। যদিও আমার খুব খুব খিদে পেয়েছে "

এতেই কাজ হল।

পিসি উঠে জানলার ধারে চলে গেল।

বললো "সে অনেক বড় গল্প। শুধু এইটুকু বলে রাখি তোর ওই উদ্ধত, কারোর কথা না শোনা ছোড়দি কি করে কে জানে এমনটা বদলে গিয়ে এই বিয়েতে রাজি হয়ে গেলো, আমি তো কিছুই বুঝতে পারিনি, তুই যদি পারিস জিজ্ঞেস করে নিস!"

রহস্য আরো বেড়ে গেলো মেঘমালার কাছে। উঠে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো। আর পিসির চোখে জল দেখে আরো ঘাবড়ে গিয়ে বললো "ও পিসি তুমি কাঁদছো কেন, কি হয়েছে সব বলো আমায়"

পিসি হাত ধরে এনে বসালো মেঘমালাকে খাবার টেবিলের সামনে আর ছোট ছোট টুকরো ওর মুখে দিতে দিতে বললো "ছেলেটা চোখে দেখতে পায় না "

বলেই আঁচল ঠুসে নিজের মুখে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগলো।

"মানে !"

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো মেঘমালা।

"এসব কি বলছো তুমি, আমি এখনই যাচ্ছি ছোড়দির কাছে।"

ওর হাত ধরে বসালো পিসি।

জন্ম থেকেই এই বাড়িতেই আছে রিক্তা। কি করে কে জানে বিয়ে থা আর করা হয়ে ওঠে নি। বাবা, মা, দাদা-বৌদিরাও কম চেষ্টা করেনি কিন্তু রিক্তা একবারও রাজি হয়নি এ সংসার ছেড়ে অন্য কিছু নিজের জন্য ভাবার।

আজ বাবার শরীর খারাপ, কাল মায়ের বুকে ব্যথা। কোনদিন রান্নার লোক এলো, কোনদিন এলো না সবেতেই তো রিক্তা। একে একে দুই দাদার বিয়ে হলো। দুই বৌদি এসে কোনদিন বাড়িতে একজন ননদ বসে আছে বলে কোন অশান্তি করেনি।

বরঞ্চ একে একে তাদের ছেলে-মেয়ে হয়েছে আর দিব্যি "ও দিদি ভাই একটু তুমি দেখো, একটু তুমি পড়িয়ে দাও " করতে করতে রিক্তার ঘর পরিবর্তন হয়েছে।

ছোট ঘর থেকে বড় ঘর।

তাতে চার ভাইপো ভাইঝির টেবিল খাট ঢুকেছে। আর রিক্তা পিসি থেকে কখন যেন এদের মা হয়ে গেছে

তাহলে আবার সংসার কেন আলাদা করে নিজের জন্য। এই তো সব পেয়েছির দেশ তার কাছে।

ধীরে ধীরে কেউ কাজের জন্য কেউ বা পড়ার জন্য বাইরে চলে গেছে রিক্তার সেই বড় ঘর ছেড়ে। মেঘমালা ক্লাস এইটে পড়ার সময় একটা সাদা কাগজের বোর্ডে লিখে ঝুলিয়েছিল

"সোনা পিসির হোটেল" ।

সেইটা কি করে আজও থেকে গেছে।

জানলা থেকে ফিরে এলো পিসি আর আদরের ভাইঝির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো "তোর ছোড়দি জানিস তো ছোট থেকেই কেমন একগুঁয়ে, তোদের সবার চেয়ে আলাদা। মুখে যা আসে তাই বলে দেয়। কত বুঝিয়েছি সেই ছোট থেকে কিন্তু সেই এক কথা আমি অত রেখে ঢেকে বলতে পারবো না। অথচ মনটা ঠিক তালশাঁসের মতো নরম। কত মানুষকে কি ভাবে সাহায্য করে ও নিজেও হয়তো মনে রাখে না। "

থামলো পিসি, উঠে জল খেল আর মুখ মুছে আবার এগিয়ে এলো মেঘমালার পাশে।

" শুরু থেকেই সেই এক বন্ধু ওর মিতালী। সেই মিতালীর বাড়ি আসা যাওয়া একটু হঠাৎ বেড়েছিল। বৌদি মানে তোর মা বরাবর কারো সাতে পাঁচে থাকে না। তোর জেঠিমা সে তো আরো ব্যস্ত নিজের ঠাকুর ঘর নিয়ে। তা আমিই না পেরে আর রাতে যখন শুতে এসেছে আমার পাশে কথাটা তুললাম।

-তোর কি হয়েছে রে সোনাই, কিছুদিন ধরে বড্ড বদলে গেছিস। না চেঁচাস, না ঝগড়া করিস না শাসন করিস কাউকে-

তাতে মেয়ে একটিও কথা না বলে শুধু পাশ ফিরে শুলো। আমিও আর ওকে বিরক্ত করবো না ভেবে ওষুধ খেয়ে সবে হাত জোড় করে প্রার্থনা করছি দেখি উঠে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে।

তুই চলে যাবার পর থেকে ও ঘরে এখন আমরা দু’জনেই থাকি শুধু তাই একটু জোরেই বললাম - কি হয়েছে তুই কাঁদছিস কেন !

সত্যি বলতে ও মেয়েকে আমি কাঁদতে খুব কম দেখেছি !"

আবার উঠে গেলো পিসি। ঘরের দরজা খুলে ছাদ বাগানে এসে দাঁড়ালো।

আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার, হয়তো অমাবস্যা আজ। রাস্তার ধারেই বাড়ি তাই গাড়ির আলো আর হর্ণের আওয়াজ মাঝে মাঝে অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা চিরে ছারখার করে দিচ্ছে।

কোথাও যেন রাত প্যাঁচা এক ভাবে ডেকেই যাচ্ছে। অনেক গাছের মাঝে কাঁচের বড় একোরিয়ামে রাখা মাছেরা ছোট ছোট সবুজ জলের গাছের মাঝে লুকোচুরি খেলছে। একটা গোল্ড ফিস বারবার পাথরের টুকরো মুখে তুলছে আর জলের বুদবুদের সাথে তাকে বাইরে ফেলছে।

মেঘমালা এসে বসলো চুপ করে পিসির পাশে।

পিসির মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না এখন। শুধু কখনও এক ছিটে আলো এলে বেশ বুঝতে পারছে মেঘমালা যে পিসি কাঁদছে।

"মিতালীর ছোট কাকার কাছেই পড়তো ওরা দুজন। জন্ম থেকে অন্ধ হলেও কি হবে সে লেখাপড়ায় কারো থেকে কম নয়। সারাদিন বাড়িতে ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে। দু'তিনটে  ইউনিভার্সিটিতে সপ্তাহে এক দুদিন যায় ক্লাস করাতে।

সেই কাকাইয়ের কাছেই মিতালী আর তোর দিদি বেশ কিছুমাস ধরে ইংলিশ পড়েছিল।

পরে চাকরি পাওয়ার পরে আর তেমন যেতো না কোনদিন ওদের বাড়িতে তাই দেখা সাক্ষাৎও কমে গিয়েছিল।

আবার গেছিলো তিনমাস আগে মিতালীর জন্মদিনে।

ঘরোয়া খাওয়া দাওয়ার পরে তোর ছোড়দিকে সবাই নাকি গান গাইতে বলেছিল। সে গানের সাথে হঠাৎ কখন যে মিতালীর কাকাই গলা মিলিয়েছিল সে কথা সোনাই নিজেও নাকি বোঝেনি। সেদিন বাড়ি ফেরার আগে সবার থেকে বিদায় নেবার সময়ে হঠাৎ একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল ওর কাকাই

"এই গানটা জানো আমারও সবচেয়ে প্রিয় গান"

আর বলেই চলে যেতে গিয়ে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

সোনাই স্বাভাবিক ভাবেই বলেছিল

"চলুন আপনাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসি"

তার উত্তরে পেছন ফিরে হেসেছিল অনিন্দ্য - মিতালীর কাকাই। আর বলেছিল "চোখে দেখি না তো তাই অনবরত হোঁচট খাই, ছোটবেলায় মা সবসময় সাথে ঘুরতো কিন্তু এখন সে নেই তাই অভ্যেস করে ফেলেছি হোঁচট খাওয়ার"

চলে গেছিলো অনিন্দ্য।

আর নিজের অজান্তেই একটা একরোখা উদ্ধত মেয়েকে সোনার কাঠির ছোঁয়ায় বদলে দিয়েছিল ওই কিছু কথায়।

বদলে গেছিলো সোনাই সেই মুহূর্ত থেকেই। যে সোনাই জন্মদিনের উৎসবে গিয়েছিল সে সোনাই ফেরেনি আর সেই হলুদ দোতলা বাড়ি থেকে।

রোজ রোজ যেতে না পারলেও প্রায়ই যাওয়া শুরু করেছিল সে।

মিতালী অবাক হয়ে বলেছিল

"তোর হলো টা কি ! আমি কিন্তু কাকী বলে ডাকতে পারবো না তোকে"

হাসে নি সোনাই শুধু বলেছিল "নিজের সাথে নিজের লড়াই চলছে এখন রে। মনের মধ্যে অনেক লোভ, অনেক হিংসে এতদিন ধরে পুষেছি জানিস, আজ বড় ইচ্ছে করছে কারো চোখের তারায় আলো জ্বালাতে "

কেঁদেছিল মিতালী তার এই পাগল বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে।

তারপর এ বাড়িতে বোঝানোর দায়িত্ব আমার কাঁধে চাপিয়ে তোমার ছোড়দি রোজ সকালে উঠে অফিস যাবার আগে পালা করে রান্না শিখেছে আমার কাছে।

একদিন বললাম "হ্যাঁ রে আমাদের তো কোনদিন রান্না করে খাওয়াসনি। "

তাতে মেয়ে বলে কি না "ও পিসি ওর খুব ইচ্ছে বিয়ের পরে বাইরে চলে যাওয়ার, অনেক ছোট থেকে নাকি ওই ইচ্ছে পুষে রেখেছে। তা সে সব দেশে কে এসব রান্না করে খাওয়াবে বলো ! আসলে এসব শুক্তো, পোস্ত, চচ্চড়ি খেতেই যে ভালোবাসে"

পরদিন রাতেই দেখা হলো ছোড়দির সাথে।

আমাকে দেখে জড়িয়ে নিয়ে বললো "এসেছিস, অনেক কথা আছে তোর সাথে !"

রাতে পিসিকে ঘুম পাড়িয়ে দুই বোন ছাদে এলাম।

প্রথমার চাঁদ আসবো কি আসবো না ভেবে সবে চোখের পাতা খুলেছে নীরবে।

দাঁড়ানো ছোড়দির কাঁধে হাত রাখলাম।

ফিরে তাকালো ছোড়দি। চোখ জলে ভরা অথচ কি অদ্ভুত শান্তি ছেয়ে আছে।

বললাম "এবার তুই খুশি তো ছোড়দি "

হাজার তারার আলো ছোড়দির চোখে মুখে ফুটে উঠলো।

হাসলো ছোড়দি, তাতে একটুও কষ্ট বা গ্লানি নেই। বললো

"মনে আছে তোর মেঘ, যখন কলেজের শেষ দিনে অরুণাভ আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এই বলে- আমি না কি ওর যোগ্য নই, আমার মতো এত কালো মেয়ের না কি স্বপ্ন দেখার কোন অধিকার নেই। অথচ ওই অরুণাভ তিন বছর আমার বানানো নোটস্, আমার বই আমার খাতা ব্যবহার করেছে এমনভাবে, এত ভালো ভালো কথা বলেছে এমন করে আমি তাকে ভালোবাসা বলে ভুল করেছি, সে নাকি আমার দোষ" থামলো ছোড়দি

"জানিস আমি তো গুটিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে, কত সম্বন্ধ এসেছে আমার, তারা খেয়ে-দেয়ে যাবার সময় বাবা-মার মুখের ওপর বলে গেছে- “ এ মেয়ের বিয়ে হওয়া খুব মুশকিল ”

অনিন্দ্য যেদিন প্রথম আমাকে ভালো লাগার কথা বলেছিল, আমি একেবারেই না বলেছিলাম। বলেছিলাম আপনি আমাকে না দেখে এসব বলছেন। আমি খুব কালো, আমাকে কেউ পছন্দ করে না আর আমি সে নিয়ে একটুও চিন্তিত নই। আমি সারাজীবন চাকরি করে এ ভাবেই কাটিয়ে দিতে চাই।

চুপ করে গেছিলো অনিন্দ্য আর আমার হাতের ওপর নিজের হাত আলতো ছুঁয়ে বলেছিল

"কালো সাদা কি হয় আমি যে জানি না শুধু জানি তোমার কাছে যে মনটা আছে সেটা ঠিক আমার মায়ের ঘুম পাড়ানি গানের মতো স্নিগ্ধ, সরল, সুন্দর। আমি তো চোখে দেখি না তাই সে ভাবে বলতে পারবো না তোমাকে। কিন্তু মনের চোখ কোনদিন ফাঁকি দেয় না। তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করবো না আমি, বাড়ি যাও। সবাইকে বলো। নিজে ভেবে দেখো তারপর যা হবে আমাকে জানিও।

আমি অপেক্ষা করবো না তোমার, তবু যদি ফিরে আসো জানবো আমার অন্ধকার চোখের তারার স্বপ্ন সত্যি হলো হয়তো"

কখন যে উঠে চলে গেছিলো ছোড়দি মনে নেই।

ছাদের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শুনলাম গাইছে ছোড়দি

"চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে"

ছোট থেকেই ছোড়দি বড্ড আলাদা, বড্ড একগুঁয়ে, সব সময় অন্য কিছু করার কথা ভাবে।

এবারেও তো জীবন দিয়ে বাজি খেলে গেলো।

এমন আলাদা, অন্যরকম ছোড়দি ভালো থাকিস তুই কারো চোখের তারা হয়ে - মনে মনে বলতে বলতে ঘুমন্ত পিসিকে জড়িয়ে আমি শুয়ে পড়লাম, বাতাসে ভেসে আসছে তখনও

"এখন তোমার আপন আলোয় তোমায় চাহি রে..."


Jun 3, 2021

"পারদ (সব খুন খুন নয়)" - আরিঞ্জয় ওয়াহিদ (আবু)

Edit Posted by with No comments

 


পারদ (সব খুন খুন নয়)

আরিঞ্জয় ওয়াহিদ (আবু)

 

পর্ব-১

মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায়

 

রাত্রি তখন ১২টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি, উত্তরের জানালাটা খোলা,আকাশে মেঘ তারার সাথে আলিঙ্গন করছে বৃষ্টি নামাবে বলে,মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে বাতাসের কলতান।

বালিশে হেলান দিয়ে একটানা ঘন্টা খানেক ধরে মোবাইলটা স্ক্রল করে যাচ্ছে অরি, চোখটা জাস্ট লেগে যাচ্ছিল মোবাইলের ডাটাটা অফ করে ঘুমোতে যাবে ঠিক এমন সময় মোবাইলের স্ক্রিনে হালকা আওয়াজে ভেসে উঠল একটা মেসেজ-'হাই'

বুড়ো আঙুলে মেসেজটা খুলতেই -দেখল নাম- স্মিতা রায়' অরি উত্তর দিলো- 'হম!কে বলছেন'

-কেন facebook এ নাম দেখায় না বুঝি'

-হম । কিন্তু কে আপনি?

-পরিচয় হতেই তো টেক্সট করলাম ।

-আচ্ছা ! বলুন।

-একটা কথা বলবে !

-কি।

-মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় ?

-মানে। কিছু বুঝলাম না কি বলতে চাইছেন ।

(এর পর আর কোনো Repaly এল না ফোনের ওপার থেকে)

অরি অনেক্ষন চিন্তা করতে করতে মোবাইলটা রেখে ঘুমোনোর চেষ্টা করলেও কিছুতেই আর ঘুমোতে পারছিল না , তার চোখের সামনে সেই লেখাটাই ভেসে আসছে বার বার-'আচ্ছা মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায়' !

হঠাৎ হুড় মুড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে মেয়েটার profile ঘাটতে শুরু করল তারপর যা দেখল তা দেখে সে অবাক ,

আরে এটাতো 'রিয়া'...!

রিয়া অরিত্রের মানে অরির প্রাক্তন প্রেমিকা, স্কুল জীবন থেকেই পরিচয় পরে ধীরে ধীরে সেটা সম্পর্কের রূপ পায় যদিও রিয়া প্রথমের দিকে অন্য কারোর সাথে সম্পর্কে থাকার জন্য অরির সাথে ওর সম্পর্কটা বন্ধুত্বের ছিল কিন্তু পরবর্তীতে কোনো কারণে ছেলেটা তার সঙ্গ ছাড়লে রিয়ার প্রতিটি মন খারাপের রাতে অরিই ছিল শেষ সম্বল আর এভাবেই তা পরে সম্পর্কের রূপ নেয় ।

কলেজ জীবনের পরবর্তীতে বেকার অসহায় গরিব অরিত্রের সাথে সম্পর্কটা মেনে নিতে চায়নি রিয়ার বাবা, আর তার জেরেই সম্পর্কের বিয়গ। বিয়ের ৩ বছরের মাথায় একদিন খবর পেয়েছিল অরি যে কিছু একটা মেয়ে ঘটিত রোগের কারণে রিয়া মারা যায় ।

সেদিন একাকাশ মন খারাপ নিয়ে তারা ভরা আকাশের দিকে চেয়ে রাত কেটেছিল তার ।

আসলে সম্পর্ক বড়ো কঠিন রোগ, একবার জড়িয়ে গেলে সারানোর ওষুধ খোঁজা দুষ্প্রাপ্য। সম্পর্কের যোগে অধিকার, বিয়োগে অনাধিকার, তাই হয়ত ছেড়ে আসার পর সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল সে । কিন্তু সেটা বিশ বছর আগের ঘটনা তাহলে আজ হঠাৎ ওর ফেসবুক একাউন্ট থেকে sms করল কে ?

এমন সময় দানবের চিৎকারের মতো আওয়াজ করে আকাশ ধেঁয়ে তুমুল বেগে বৃষ্টি নামল । জানালার পাল্লা হওয়ার বেগে দেওয়ালে আছার খেয়ে ফিরে ফিরে যাচ্ছে, ঠিক জানালার সামনেই রাখা চেয়ারটায় বসে সেই পঁচিশ বছর আগেকার কুড়ি বছরের রিয়ার প্রেমে মাতাল হয়ে অরি যেন পৃথিবীর সব কিছু ভুলে তাতেই মগ্ন হয়ে পড়ে রইল ।

 

পর্ব-২

সুইসাইড নোট

 

আকাশটা আজ বড্ড পরিস্কার,ঠিক যেন সদ্যস্নাত কোনো নারী খোলাচুলে রোদে কাপড় মেলছে। পূর্বের আকাশটা লাল হয়ে কিছুটা ছটা দর্জার ভাঁজে দাঁড়িয়ে।

বাইরে গলিতে সব্জি ওয়ালার চিৎকার আর পেপার ওয়ালার সাইকেলের বেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল অরির ।

এমন সময় দর্জার ওপার থেকে কথা বলতে বলতে ভিতরে প্রবেশ করল মণি।

-কি গো দিন দিন বয়স যেনো কমছে তোমার,রাত জাগার অভ্যাসটা এখন গেল না ।

টেবিলের উপর চায়ের কাপটা রেখে মনি বলল- রাতে মেডিসিন নিয়েছ ? উত্তরে অরি বলল-মন খারাপের যন্ত্রণা কি আর মেডিসিনে সাড়ে ! কটা বাজে ?

-সাতটা কুড়ি,কাল রাতে নীলুদার মেয়েটা সুইসাইড করে মারা গেছে ?

-নিলুদার মেয়ে মানে আমাদের তনয়ের সাথে যে মেয়েটা পড়ে ?

- হুম, গলায় ফাঁস ঝুলিয়ে, এই যুগের ছেলে-মেয়ে গুলো মাইরি যাচ্ছে তা, জানতিস ছেলেটা ভালো নয় মুখ কালা করার আগে একবার ও ভাবলি না, নিজে মরল আর এখন বাপ মাকে তার পাপ বইতে হবে, আমি এ জন্য বাবুকে বলেছিলাম ওসব মেয়ের সাথে না ঘুরতে, কে শোনে কার কথা।

বিছানার চাদরটা ঠিক করতে করতে মনি আবার বলল-এখনকার ছেলে-মেয়েদের তো স্বাধীনতা চাই, এই হল স্বাধীনতার হাল ।

অরি চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বলল

-আচ্ছা মনি মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় ।

অর্ধেক মেলানো চাদরে হাত ঝাপড়াতে ঝাপড়াতে হঠাৎ থেমে মনি বলল-এই জন্যই বলি রাতে পিল নিতে, বুদ্ধি শুদ্ধি লোভ পাচ্ছে তোমার দিন দিন- মানুষ মরলে কোথায় যায় জানোনা ?

-কোথায়? অরি বলল ।

-অবশ্যই ভগবানের কাছে,বাচ্চাদের মতো কথা

বলছ কেন ?

-ওহ তাইতো । সুইসাইডের কারণ তাহলে ছেলে সম্পর্ক ঘটিত ।

-তাছাড়া আর কি হবে। ওই যে ছেলেটা মাঝে মাঝে বাইকে করে নামিয়ে দিয়ে যায় ।

সিগারেটের প্যাকেটটা থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে প্যাকেটটা টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে অরি বলল-

-সে তো বন্ধুও হতে পারে !

অরির সদ্য ফুরিয়ে আসা চায়ের কাপটা হাতে নিতে নিতে মনি বলল-বন্ধু না ছাই, তুমি সব জায়গাকে নিজের কোর্ট ভাবাটা বন্ধ করো, লোকে বলাবলি করছিল "He also threatened to baby abort"ভাবো একবার, আমরা কোন যুগে এসে পৌঁছেছি ।

-হম সেটাই । পুলিশ এসেছিল ?

-হ্যাঁ পুলিশ এসেই তো দর্জা ভেঙে বডিটা বের করল ।

- কি বলল ?

- ওওদের মধ্যে একজন বলাবলি করছিল যে প্রি-প্ল্যানিং মার্ডার।

এই বলে মনি চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেড়োতে বেড়োতে বলল-তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে নিচে আসো, মাসি আসেনি ব্রেকফাস্ট সেরে বাজারে যেতে হবে, ঘরে আলু ছাড়া কোনো কাঁচা সবজি নেই ।

চেয়ার থেকে উঠে খোলা জানালার পাল্লাটা আরো ভালো করে বাইরের দিকে ঠেলে দিয়ে নিলুদার বাড়ির দিকে তাকাল অরি, জনা বিশেক লোক

উঠনে ভিড় করে, নিলুদা করিডোরে মাথা ঠেকিয়ে বসে, উঠনের সামনের রাস্তাটায় একটি এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে ।

ঘর থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে নীলুর বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে,পুলিশ ততক্ষণে বডি গাড়িতে তুলেছে।

অরি দেখল তার পরিচিত ইন্সপেক্টর দীপঙ্কর বাবু এসেছেন inspection এ। অরিত্রকে দেখে দীপঙ্কর বাবু এগিয়ে এসে বলল- কি অরিত্রদা বাড়ির পাশে এতবড়ো ঘটনা ঘটে গেল আপনি এতক্ষনে...!

অরি ততক্ষণে নিলুর পাশে গিয়ে বসে নিলুর হাতে হাতটা রেখে ইন্সপেক্টরকে উদ্দেশ্য করে বলল-

কি বুঝলেন ?

-সে রকম কিছু না।প্রাথমিক ধারণা তো সুইসাইড।

মোবাইলটা অরির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ইন্সপেক্টর বলল-দেখুন তো আপনি কিছু আন্দাজ করতে পারেন কি না ।

-মোবাইল খুললেন কি ভাবে ?

-No more privacy মনে হচ্ছে sms টা দেখানোর জন্যই খোলা রাখা হয়েছে ।

অরি হাত বাড়িয়ে মোবাইল নিয়ে sms টি পড়তে লাগল যা নিম্নরূপ-

||"মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় জানিনা,

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করলাম।

আমি দেখতে চাই মৃত্যুর পথ কতটা প্রসর,

আশাকরি মৃত্য তোমার থেকে বেশি কষ্টের হবে না,

আমি চললাম,তোমাকেও একদিন আসতে হবে "||

Sms টা পড়ার পর নিজেকে সামলাতে পারলনা অরি,

তড়িঘড়ি মোবাইলটা দীপংকর বাবুর হাতে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটলেন তিনি ।

অরি চলে যাওয়ার মিনিট দুয়েকের মধ্যে দীপঙ্কর বাবু বডি নিয়ে চলে গেলেন। ঘরে এসে নিজের ফোনে messenger খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ । কালকের সেই নম্বর থেকে আবার sms....

"আতঙ্কিত হবেন না মৃত্যুকে উপভোগ করুন"

 

পর্ব-৩

খুনির সন্ধানে

 

আজ অনেকদিন পর একা ছাদে বসে মদ খাচ্ছে অরি, রিয়াকে বলিয়ে বাজার থেকে নিয়ে আসা খাসির তেলের পাকোড়া সাথে । যদিও ডাঃ বলেছে এই বয়সে এই সব ইগনোর করতে, মনি প্রথমের দিকে খেতে দিতে চাইত না পরে অনেক কষ্টে তাকে মানিয়েছে অরি ।

ছাদের থেকে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই আলোচিত মেসেঞ্জার এর সাথে রিয়ার মৃত্যুর সম্পর্ক খুঁজতে লাগল সে । উকিল হওয়ার দৌলতে জীবনে অনেক কেস এর সমাধান করলেও আজ জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে এই ঘটনাটার কোনো কুল খুঁজে পাচ্ছে না সে ।।

বাবা আসবো.....!

মদের গ্লাসটা টেবিলে রেখে পিছনে তাকিয়ে অরি দেখল তনয় ।

-হুম আয় । অরি বলল ।

-আজ হঠাৎ,মন খারাপ নাকি । অরির সামনে থাকা টেবিলের ওপারের চেয়ারটায় বসতে বসতে বলল তনয়।

-না আজ হঠাৎ খেতে ইচ্ছে করল তাই ।

-খেতে ইচ্ছে করল নাকি পাপের প্রায়চিত্ত করার চেষ্টা করছ ।

-মানে । কি বলতে চাস । গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে বলল অরি ।

-বাবা তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমিও একজন উকিলের ছেলে । তোমার চোখ আজ মিথ্যা বলছে ।

-মিথ্যা বলছে মানে । কি বলতে চাস তুই , তুই তোর বাবাকে সন্দেহ করছিস ।

-অর্ধেক খাওয়া মদের গ্লাসটা  অরির নাগালের বাইরে  সরিয়ে তনয় বলল-স্মিতাকে তুমি চেনো ।

-চোখ গোল পাকিয়ে তনয়ের দিকে তাকিয়ে রইল অরি!

-স্মিতা তোমার মেয়ে বাবা আর আমার...! পুরো কথাটা শেষ করতে পারলনা তনয়।

বেশ বড়ো একটা নিশ্বাস নিয়ে অনেকটা উঁচু গলায় অরি বলল-

-মানে । কি বলছিস তুই , কে স্মিতা, কিসের মেয়ে ।

 

মদের গ্লাসটা অরির দিকে ঠেলে দিয়ে তনয় বলল-

মানুষ কতটা চরিত্রহীন হলে নিজের বোনের সাথে বেড shere করে বাবা ।

নিজেকে যথেষ্ট সামলে নিয়ে অরি বলল - কি হয়েছে খুলে বলবি ।

ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা চেয়ারে ছাড়তে ছাড়তে তনয় বলল-

তোমার প্রাক্তন বান্ধবী রিয়া অসুখে মরেনি বাবা, সে সুইসাইড করেছে তার কারণ তুমি ! তুমি হয়ত জানোনা বাবা তোমার প্রাক্তন বান্ধবী তোমার ২মাসের বেবি পেটে নিয়ে বিয়েতে বসেছিল- বিয়ের ছ-মাসের মাথায় সব জানা জানি হয়ে গেলে তোমার বান্ধবীকে শশুর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় । স্মিতার জন্ম হয় তোমার বান্ধবীর বাপের বাড়িতে,স্মিতার জন্মের 2 বছর পর ওর দাদু মারা যায়, আর তার 1 বছরের মাথায় মানসিক অবসাধে নিজেকে মেরে ফেলে তোমার বান্ধবী যে মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী বাবা ! তুমি একটা খুনি...এই বলে কাঁদতে শুরু করল তনয়।

মিনিট পাঁচেকের জন্য সব যেন অন্ধকার হয়ে আসল অরির চোখের সামনে, এক মুহূর্তে জীবনের সব হিসেব যেন গুলিয়ে ফেলল সে । এত বড় ভুল হয়েছে তার দ্বারা তনয় এসব জানল কি ভাবে কার কাছে....!

তুই মিথ্যা বলছিস না তো!-অরি বলল ।

- পৃথিবীটা গোল বাবা । হাজার মানুষের ভিড়েও আমরা মানুষ খুবই অল্প সংখ্যক । তুমি জানতে চাইবে না তোমার মেয়ে কোথায় তার সাথে আমার কি সম্পর্ক ।

- হ্যাঁ !

-নিলুদার মেয়ে বাবলিকে চেনো , ও তোমার মেয়ে ।

তোমার বান্ধবী মারা যাওয়ার পর নিলুদা ওকে দত্তক নেয় ।

অরি শুধু তাকিয়ে আছে তনয়ের দিকে তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে শুধু, যে অশ্রুর কোনো শব্দ নেই, অভিমানও নেই আছে অনেকগুলো আক্ষেপ ও হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা ।

চেয়ার থেকে উঠে ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে মুখটা বাইরের দিকে ঝুঁকে  অরি বলল-

আর বাবলি মানে স্মিতার বলতে পারো তোমার সেই মেয়ে মানে আমার বোনের সঙ্গে চার বছরের সম্পর্ক ছিল আমার ।

পিঠ ঘুরিয়ে দ্রুত হেঁটে অরির পায়ের কাছে মাথা গেড়ে তনয় বলল- আমি কি করব বাবা আমরা সব সত্যতা জানার পর নিজেদের ক্ষমা করতে পারিনি,তার পরেও বাবলি আমার সন্তানের মা হতে চায় -তাই আমি

বাবলিকে খুন করেছি বাবা, তোমার পঁচিশ বছর আগে করে আসা ভুলের শাস্তি আজ আমাদের পেতে হল, কারন আমি আমার বোনের সন্তানের বাবা হতে পারব না ।

বাবলির মোবাইলের sms গুলো আর আমাকে সেই numbar থেকে sms গুলো কে করে ছিল...

-আমি.....তনয় বলল-

- মানে ওই সুইসাইড sms গুলো তোর লেখা ।

- হুম বাবা সেই sms গুলোর অর্থ আর একটু পর নিজেই বুঝতে পারবে ।

-তাহলে আমাকে sms করেছিস কেন ।

-সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ।।

এই বলে টেবিলের উপর একটা ছোট্ট চিরকুট রেখে

তনয় আবার ছাদের কার্নিশের দিকে চলে গেল...

চিরকুটটা খুলে অরি পড়তে লাগল...

||"সব খুন খুন নয় বাবা । কিছু খুন প্রায়চিত্তও করে,

তুমি খুন করেছো আর আমি প্রায়চিত্ত করলাম।

তুমি মৃত্যুকে উপভোগ করো.... তোমার বান্ধবীর,তোমার মেয়ের আর তোমার............||

হঠাৎ ছাদ থেকে ভারী কিছু সজোরে নিজে পড়ার আওয়াজ পেল অরি,নিচে থেকে রিয়া চেঁচিয়ে উঠে কান্না শুরু করল---"ও মা গো এ কি সব্বনাশ হল গো আমার ।।


May 30, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯৫

Edit Posted by with No comments

May 29, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with 2 comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- সৌমিত সরকার

 

একটা সময় ছিল যখন এত ছুটোছুটি ছিল না। সারাদিনে কিছুক্ষণ সময় পাওয়াই যেত গল্পের বই নিয়ে বসার। এখনকার মতো নয়। এখন তো নিঃশ্বাস নেবার সময়ও হয় না, বসে বই পড়া তো দূরের কথা।

এখনকার বাচ্চারাও বই পড়ে, তবে তা ছাপার অক্ষরে নয়, ই-বুক হিসাবে, মোবাইলে।

এদের বইয়ের নেশা নেই বা পড়ার নেশা নেই এরকম ভাবা কিন্তু ভুল। এরা আমাদের থেকে অনেক বেশি পড়ে। ইন্টারনেটের দৌলতে এখন সারা পৃথিবীর সাহিত্য এদের হাতের মুঠোয়।

কিন্তু ভেবে দেখুন, জীবনে সব ক্ষেত্রেই কি এটা সত্যি নয়। নতুন আসে, পুরোনো সরে দাঁড়ায় তাকে জায়গা করে দেবার জন্য, তবেই তো জীবন এগিয়ে চলে। আমরা নিজেরাও, একসময় জীবন নিজেদের শর্তে বাঁচি, তারপর কোন এক সময় জীবনের হাল অন্য কারুর হাতে তুলে দিই, আর তারপর একদিন স্রোতের মুখে ভাসতে ভাসতে চলে যাই অজানার উদ্দেশ্যে। আমরা সরে যাই, তাই অন্য কেউ এগিয়ে আসতে পারে, সুযোগ পায় নিজের জীবন নিজের শর্তে বাঁচার চেষ্টা করার।

তাই তো একদিন পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা পাবার জন্যে লোকে কলকাতায় থাকা বন্ধুকে বলতো কিনে পাঠাতে, আর আজ সেই বন্ধুকেই বলে যে প্রয়োজনে অনলাইনে অর্ডার করে নিজেই তার কাছে পাঠিয়ে দেবে – দু’জনের মধ্যে যে যেখানেই থাকুক না কেন।

এ কথা অবশ্যই সত্যি যে দিন বদলেছে, সময় পাল্টেছে। লোকের হাতে এখন বসে বই পড়ার মত সময় নেই, তাই আজ ই-বুকের রমরমা।

আমাদের উত্তরবঙ্গে কোচবিহারের মতো প্রত্যন্ত জেলাতে কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী যুবক-যুবতী স্বপ্ন-উড়ানের স্পর্ধা দেখিয়ে নেটফড়িং এর মতন অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা প্রতি সপ্তাহে প্রকাশ করে চলেছে। এই পত্রিকার প্রতিটি লেখকের লেখনী পাঠক মহলে ভিন্ন স্বাদের আস্বাদন দেবেই। নেটফড়িং এমন একটি অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা যেখানে অণুগল্প, ধারাবাহিক গল্প, নানা স্বাদের কবিতা ও বিভিন্ন বইয়ের সম্বন্ধে সঠিক ধারণা পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, রয়েছে বিভিন্ন শিল্পীদের তোলা আলোক-চিত্র। তরুণদের স্পর্ধা দেখানোর সাহস জোগায় এই সাহিত্য পত্রিকা। আমি এক তরুণ লেখক, লেখালেখির চেষ্টা করছি আর কী? আজ আমার লেখা নেটফড়িং এর মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিভার সঠিক বিচ্ছুরণ ঘটাতে আমার মতো হাজারো তরুণ-কে পথ দেখাচ্ছে নেটফড়িং সাহিত্য পত্রিকা। আমার বিশ্বাস এভাবেই অনেকটা পথ পাড়ি দেবে নেটফড়িং। আমি নেটফড়িং এর সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করছি। আশা রাখছি আগামীদিনেও ঠিক একইভাবে পাঠক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করবে নেটফড়িং। এভাবেই এগিয়ে যাক নেট ফড়িং।


May 28, 2021

"আবার ফিরে এসেছি " - অনাদি মুখার্জি

Edit Posted by with No comments

 


আবার ফিরে এসেছি

অনাদি মুখার্জি

 

অয়ন অনেকদিন ধরে একটা বাড়ি কেনার সন্ধানে রয়েছে, শেষমেশ একটা পুরাতন ফ্ল্যাট বাড়ি পাওয়া গেলো ! কিন্তু এই নতুন বাড়িতে আসার পর থেকে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে লাগলো, যা কল্পনাও করা যায় না ! রাত হলে একটা মেয়ের কান্না আওয়াজ পাওয়া যায়, একদিন রাতে সবাই মিলে বসে খাওয়া-দাওয়া করছে, তখন বাথরুমের জল পড়ার শব্দ শুনতে পায়, সেই শব্দ শুনে অয়ন বাথরুমে গিয়ে দেখে কল থেকে জল পড়ছে না, তবে কোথা থেকে শব্দ এল ? তার পর ছাদে কে যেন আওয়াজ করে বলছে আমাকে সুখে থাকতে দিলি না সবাই কে শেষ করবো! অয়ন এইসব শুনে একটু ভয় পেলো ! অয়নের বৌ মালা বললো দেখো কেউ আছে ছাদে  গিয়ে দেখে এসো ! অয়ন তখন ছাদে গিয়ে দেখে কেউ নেই শুধু একটা ঠান্ডা হাওয়া স্রোত বয়ছে  এতে অয়নের সারা শরীরের একটা  কাঁটা দিয়ে উঠলো ! নিচে নামতে আবার সেই কান্নার আওয়াজ এলো ! অয়ন ভাবলো পাশের বাড়ি থেকে এই কান্নার আওয়াজ আসছে, ঠিক দুই দিন পরে আবার সেই একই ঘটনা তবে এই বার কান্নার আওয়াজ নয় বরং কে যেনো বাইরের দরজার ধাক্কা দিচ্ছে, এত রাতে কে এল? বলে অয়নবাবু একমাত্র ছেলে সমু দরজা টা খুলে দেখে কেউ নেই তার পর হঠাৎ দমকা হাওয়ায় সব কিছু, ঘরের জিনিস-পত্র উড়ে যেতে লাগলো ! এই দৃশ্য দেখে অয়ন ও তার বৌ খুব ভয় পেয়ে  চেঁচিয়ে বললো কে তুমি বলো ? কেন এমন করছো ? হাওয়া তখন থেমে গেল !

পরে আর এই রকম ঘটনা আর হয়নি বলে অয়ন সেই ব্যাপার টা নিয়ে মাথা ঘামালো না ! একদিন রাতের বেলায় সবাই ঘুমিয়ে আছে সেই সময় এক বিকট চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেলো অয়নবাবু ছেলে সমুর, সেই শুনতে পেলো কান্নার আওয়াজ সেই আওয়াজ শুনে বিছানা ছেড়ে ছাদে এল, ছাদে ঘুটঘুটে অন্ধকার কিছুই দেখা যাচ্ছে না, হঠাৎ একটা ছায়া চোখে পড়তেই বলে উঠলো কে ? ওপর দিকে তাকিয়ে দেখে একটা মেয়ে দড়িতে ওপরে ঝুলছে, তা দেখে সমু ভয় পেয়ে বললো কে তুমি ? কেন এমন ভয় দেখাচ্ছ? তখন ঐ ছায়াটা ঝুপ করে তার সামনে এসে পড়লো !

সমু দেখলো মেয়েটার পড়নে নীল রঙের শাড়ি, তার মুখ খানিকটা কেমন যেন থেতলে দেওয়ার মতো, চোখের থেকে যেন লাল রক্ত ঝরছে, এই দেখে খুব ভয়ে কাঁপতে লাগলো সমু, ভয়ে ভয়ে বললো কে তুমি ? কি চাও ? ওই মেয়েটা তখন খুব হাসতে লাগলো আর বললো তোরা কেউ থাকবি না, তুই এখুনি মরবি বলে লম্বা একটা হাত বের করে সমুর গলা চেপে ধরলো !

সমু বললো ছেড়ে দাও আমাকে আমি কি অন্যায় করেছি ? মেয়েটা সমানে বলে যাচ্ছে আমি ফিরে এসেছি আমাকে এখানে মেরে ফেলেছে ওরা বলে বিকট শব্দ করে বললো আমার ইচ্ছা পূরণ হয়নি তাই তোকে মরতে হবে, আমি তোকে নিয়ে যেতে এসেছি, এখানে কেউ থাকবে না বলে সমু-কে ছাদের ওপরে আঁছাড় মারলো !

পরেরদিন সকালে অয়নবাবু ও তার বৌ ছাদে গিয়ে দেখতে পায় সমুর লাশ পড়ে আছে, মুখে রক্তের দাগ ও কপালের মধ্যে রক্তে লেখা আছে ‘আমি ফিরে এসেছি, আমার নাম মালা’! সেই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো দু’জনে !

সেদিন এক প্রতিবেশীর কাছে জানতে পারে একটা ঘটনা !

অনেকদিন আগে এই বাড়িতে মালা ও তার বাবা-মা থাকতো, মালার বয়স ছিল আঠেরো বছর। সে একটা ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, সেই বিয়েটা মেনে নিতে পারেননি মালার বাবা ও মা ! একদিন মালার বর কে পায়েসের সাথে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেললো মালার বাবা ! মালা তখন জানতে পারে তার বর-কে মেরে ফেলেছে তখন মালার কি কান্না ! সে কাঁদতে কাঁদতে বললো আমার সুখ ছিনিয়ে নিয়ে ভালো করোনি এর পরিণতি খুব খারাপ হবে ! তখন মালাকে ওপরের ছাদে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে দিল, তখন মালা বললো আমি কাউকে ছাড়বো না, এই বাড়িতে সবাই-কে মেরে ফেলবো, বলে ছাদ থেকে ঝাপিয়ে আত্মহত্যা করলো ! তার কিছুদিন পর মালার বাবা ও মায়ের লাশ পাওয়া যায় এই ছাদের মধ্যেই ! সেই থেকে মালার আত্মা ঘুরে বেড়ায় ঐ ছাদের মধ্যে !

সবকিছু শুনে অয়ন ও তার বৌ বুঝতে পারলো যে ঐ মেয়েটার আত্মা তাদেরকেও শাস্তি দেবে। এই ভয়ে পরের দিন ঐ বাড়িটি ছেড়ে দিল, আগে যদি এই ঘটনা জানতো তবে তার একমাত্র ছেলেকে হারাতে হতো না। বিধির কি বিধান, কে করলো অপরাধ আর তার শাস্তি কে পেলো ! সেই থেকে ওই বাড়িতে কেউ আসে না, পরে এলাকার লোকেরা ওই বাড়ির নাম দিয়েছে ‘আবার ফিরে আসবো’! মাঝেমধ্যেই ওই বাড়ি থেকে একটা আওয়াজ শোনা যায়, ‘আমি ফিরে এসেছি’ !

 


"দিদিভাই ও নিগমদা" - সায়ন বণিক

Edit Posted by with No comments

 


দিদিভাই ও নিগমদা

সায়ন বণিক

 

পশ্চিমের সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পথে। বাড়ির ঠিক ডান পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী করলা। জলপাইগুড়ি শহরটাকে যেন ভাগ করে রেখেছে এই নদী। তাও, এখন অনেক ব্রিজ হয়েছে। বড়দের মুখে শোনা অনেক আগে নাকি এপার-ওপার করতে নৌকো বা ভেলা পার হয়ে যেতে হত। ছ-সাত বছর আগে সেরকম একটা বাড়ি-ঘর ছিল না, তখন মা-বাবার সাথে আসতাম মাসির বাড়ি। রাত্রি হলেই নদীটার দিকে তাকালে ভয় করত। মনে হত, এই বুঝি জলের ভেতর থেকে কেউ উঠে আসে।

ঘন্টাখানেক হল মাসির বাড়িতে এসেছি। ওরা কেউ বাড়িতে ছিল না। ব্যাগদুটো ভেতরে রেখে নদীর পাড়টাতে দাঁড়িয়ে আছি। অস্পষ্ট দৃষ্টিতে দেখে চলেছি নদীতে জামা-কাপড় কেঁচে নিয়ে বাঁশের মধ্যে শুকোতে দিচ্ছে তিনজন মহিলা। আমার সামনে দিয়ে দুটো গোরু কোনো খাবারের খোঁজে পাশ দিয়ে চলে গেল। সামনের লেবু গাছটাতে এখনও তেমনভাবে লেবু ধরেনি— মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক পাখি তাদের বাসার দিকে চলেছে।

"এই গুড্ডু! এলি কখন তুই?"— আমার পিছন থেকে দিদিভাই আচমকা এসে আমাকে বলল। আমার মাসির বড় মেয়ে 'অদ্রিজা', বাড়িতে সবাই 'আইভি' বলেই ডাকে। ওর সাথে আমার খুব ভালো একটা সম্পর্ক, ছোট থেকেই। বছর তিনেকের বড় যদিও, তবুও আমাদের মধ্যে সমস্তরকম কথাই আলোচনা হয়।

আমি বললাম, "এইতো, প্রায় একঘন্টার মত হলো দাঁড়িয়ে আছি। ভেবেছিলাম, হঠাৎ তোমাদের বাড়িতে এসে সারপ্রাইজ দিব। কিন্তু, নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেলাম।" বলে হাসতে লাগলাম। দিদিভাই-ও হাসা শুরু করে দিল।

"আসলে শিলিগুড়ি থেকে আমার আসার কথা ছিল কালকে, আমার কাজটাও শেষ হয়ে গেল তাড়াতাড়ি, তাই ভাবলাম আজই চলে আসি তোমাদের বাড়ি। কিন্তু, এসে দেখি তোমরা কেউই নেই।"

"বাড়িতে যখন দেখলি যে কেউ নেই, ফোন করলি না কেন আমাদের কাউকে?"

"করতেই গেছিলাম। মোবাইলটা অন করে দেখি কিছুক্ষণ আগেই রিচার্জটা শেষ হয়ে গেছে।"

মাসিরা দুই বোনকে নিয়ে গেছিল ব্যাডমিন্টন খেলাতে। কিছুদিন বাদে ওদের টুর্নামেন্ট আছে, তাই তাড়াতাড়ি চলে গেছিল আজ। ওর দুইবোন যমজ, ক্লাস সিক্সে পড়ে। খুব ছটফটে।

গেটটা খুলে ব্যাগদুটো হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম। ঘরটা কেমন নতুন-নতুন লাগছে। মেঝেয় টায়েলস্ দিয়েছে নতুন, ঘরের রঙটাও নতুন করেছে। আগে যখন এসেছিলাম, তার চেয়ে এখন বেশি ভালো লাগছে। জ্বলজ্বল করছে ঘরের দেওয়ালের সুন্দর রঙগুলো।

পাশের বাড়ি থেকে সন্ধ্যাবাতির আওয়াজ কানে আসছে। কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম মাসিরা বাড়ি ফিরে এল দুইবোনকে নিয়ে। তাদের সাথে আলাপ-গল্প করলাম অনেকক্ষণ। রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ হয়ে আসল। আমরা ঘুমোতে গেলাম।

দিদিভাই আর আমি প্রতিবারই আলাদা একটা ঘরে শুই। খুব মজা হয় ওর সাথে রাতের বেলাটা। আমি বললাম, "দিদিভাই, তোমাদের রিলেশনশিপের ব্যাপারে কিছু বলো না! আগের বার পুরোটা শোনার সময়ই ছিল না। এবার তোমায় প্রথম থেকে বলতে হবে।"

দিদিভাই মাথা নেড়ে "আচ্ছা" বলল।

মশারি টাঙানো খাটের উপরে। বাইরের দেওয়ালের হলুদ নাইট বালব্টার আলো কমে এসেছে। মাথার ওপরের পাখাটা ভনভন করে ঘুরে চলেছে। আমরা ছোট্ট একটা খাটে শুয়ে উপরের ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি, আর পাখার ঘরঘর আওয়াজটা শুনে চলেছি।

"সেবার আমি ক্লাস ইলিভেনে পড়ি। কলকাতায় গিয়েছিলাম একটা সায়েন্স এক্সিভিশনের জন্য। আমরা একটা মডেল তৈরি করেছিলাম, দুই বান্ধবী মিলে।

যাই হোক। অনেকে দেখতে এসেছিল আমাদের মডেল। একটা ছেলে এল আমাদের মডেল দেখার জন্য। বেশ সুন্দর চেহারা, দাঁড়িগুলো ঠিকমত ঘন ছিল না— অগোছালো ধরনের। চুলগুলো ছোট ছোট করে কাটা। একটা হাফ শার্ট, আর জিন্সের প্যান্ট পরা ছিল।

আমায় বলল, তোমরা কি বানিয়েছ একটু বুঝিয়ে বলো।

তার গলার মধ্যে একটা গম্ভীর ভাব ছিল। কিন্তু, তার মধ্যেও কোথায় যেন একটা মিষ্টতা লুকিয়ে ছিল। তার চেহারা আর গলার আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম যে, বয়স কুড়ি-একুশের মাঝামাঝি।"

"কি সুন্দর রোমান্টিক গো তোমরা। আমার তো দারুণ লাগছে। তারপর?" আমি বললাম।

দিদিভাই লজ্জা পেয়ে হাসল। বলল, "আমি ওর নাম জিজ্ঞেস করলাম, ও বলল নিগম সরকার। কোনখান থেকে এসেছো জিজ্ঞাস করতেই, আমার মনটা প্রফুল্লিত হয়ে উঠল। ও বলল যে জলপাইগুড়ি থেকে এসেছে।

আমি বললাম, তুমি জলপাইগুড়ি থেকে এসেছ? আমিও তো জলপাইগুড়িতেই থাকি।

—তাই নাকি? কোন জায়গায় থাকো জলপাইগুড়ির?

আমি ওর গম্ভীরভাবটা কাটিয়ে এতক্ষণে হাসি দেখতে পারলাম। কত সুন্দর করে সাজানো ওর দাঁতগুলো..."

"আরে হ্যাঁ, বুঝেছি। নিগমদাকে আমিও ভালোমতই দেখেছি।" আমি দিদিভাইয়ের কোথায় লজ্জা পেয়ে আটকে দিলাম।

"কেনো গুড্ডুভাই, খুব তো বলে চলেছিস আমাদের কথা শুনবি, এখন যখন বিস্তারিত বলছি তখন লজ্জা লাগছে?" আমাকে বলে নিয়ে দিদিভাই খিলখিল করে কোলবালিশটা জড়িয়ে হাসতে লাগল।

"তারপর, তোর নিগমদাকে সমস্ত কথা বলল আমায়। ও শুনলাম সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে, ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে।

ওকে তারপর চলে যেতে লাগল। কোনো দায়িত্বে ছিল বোধহয়, তার জন্যেই ভিজিটিং-এ এসেছিল।"

ওর চলে যাওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ ধরে একটা চিন্তা করতে থাকলাম। জানি না কেন ! আগেও তো অনেকের সাথে কথা বলেছি— আগে তো মনের ভেতরটা ওরকম হতে কখনও দেখিনি।"

বাইরের হাওয়াটা একটু জোরে বইছে। আমি নীচে নেমে পাখার স্পিডটা কমিয়ে আসলাম। পাশের ঘর থেকে সবার নাক ডাকার শব্দ কানে আসছে। টেবিলের ওপর রাখা বোতলটা থেকে জল খেয়ে বিছানায় ঢুকে বললাম, "তারপরে কি হলো দিদিভাই? তুমি তো ওর নম্বর নিলে না, তবে?" মশারিটা গুঁজতে গুঁজতে আমি বললাম।

দিদিভাই আমার দিকে পাশ ঘুরে বলল, "ভাগ্যে থাকলে যা হয়।

আমরা যথারীতি জলপাইগুড়ি চলে এসেছিলাম। এক সপ্তাহ, দু-সপ্তাহ এই করে একটা মাস কেটে গেল।

একদিন, আমরা বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে বেরিয়েছি রাজবাড়ী পার্কে। আমরা সবাই যে-যার মত গল্প করছিলাম, কেউ বা ওদের বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুরতে এসেছিল।

দূর থেকে আমি লক্ষ করলাম, সেই ছেলেটা ! কাছে এগিয়ে আসতেই ঝাপসা ভাবটা কাটিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম সেই ছেলেটাই। যাকে আমি কলকাতায় দেখেছিলাম, ও আমার মডেল দেখবার জন্য এসেছিল। আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে বললাম, তুমি নিগম না?

ও বলল, হ্যাঁ।

রাজবাড়ী পার্ক। চারিদিকে লোকজনেরা বসে রয়েছে। ছোট-ছোট বাচ্চারা খেলছে, কেউবা দৌড়াদৌড়ি করছে। আমার বান্ধবীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে। ও কি করল জানিস?"

আমি উৎসাহের সঙ্গে জানতে চাইলাম, "কী করল?"

"আমাকে সবার মাঝে প্রপোজ করে বসল"

"কী...?" আমি হাসব না লজ্জা পাবো, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। "তারপর?"

"তারপর আর কি, আমাকে সবার সামনে হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করল। তাও আবার, পাশের গাছ থেকে একটা ফুল ছিঁড়ে।

সেই ফুলটা আমার কাছে এখনও আছে। ডায়েরীর ভেতর রাখা।"

"আমায় দেখিও কিন্তু দিদিভাই। যাই হোক, পরে?"

"আমায় তো সবার সামনে প্রপোজ করে বসল। আর আমি মুখে হাত দিয়ে লজ্জায় হাসছিলাম।

আমি ওর কাছ থেকে ফুলটা নিলাম। আমি ওকে বললাম, আমি ভেবে নিয়ে তোমায় জানাব।

যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। সারাটা সন্ধ্যা ওর কথা ভেবে রাত্রিবেলা মা-র ট্যাবটা হাতে নিলাম। হোয়াটস্অ্যাপটা খুলে ওর নম্বরটা সেভ করে, হাই লিখে পাঠালাম।"

"তুমি ওর নম্বরটা কীভাবে পেলে?"

"আমি তখনই ওর নম্বরটা নিয়েছিলাম। বলেছিলাম যে, তোমার নম্বরটা আমায় দিয়ে দাও বাড়িতে গিয়ে ভেবে বলবো।

ব্যাস ! সারাটা রাত ভাববার পরে আমি ওকে হ্যাঁ বলে দিলাম।"

ঘড়ির কাঁটার আওয়াজটা আসতে আসতে তীক্ষ্ণ হয়ে আসছে। বাইরে হাওয়াটা এতক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। রাত্রি দুটো বাজে তাকিয়ে দেখলাম। দিদিভাই-এর গল্প শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, বুঝিনি।

সকালের পাখিদের ডাকে ঘুমটা ভেঙে গেল। দুটো সপ্তাহ জলপাইগুড়িতে কাটিয়ে আমি নিজের বাড়ি চলে আসলাম।

নিগমদা-র সাথে কথা বলে আমার খুব মজা লাগে। এত সুন্দর ওদের লাভ স্টোরি, এত সুন্দর ওদের মজাদার কথাবার্তা।

আগের বছর যখন ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, দিদিভাই আমাকে নিয়ে বের হত ওর সাথে দেখা করবার জন্য। আমি দূর থেকে লক্ষ করতাম, ওরা হাঁটছে— দু’জনে গল্প করছে।

ওরা একে অপরকে এতটা ভালোবাসে, যে বলাই বাহুল্য।

আমি ওদের সবসময় একসাথে দেখতে চাই, ওরা যেন পরক্ষণেও আলাদা না হয়ে থাকে। এসব আমি দূর থেকে লক্ষ করতাম।

একদিন তো দুজনকেই বলে বসেছিলাম, এই তোমরা বিয়েটা কবে করছ গো?

দুজনেই লজ্জা পেয়ে গেছিল। নিগমদা বলল, আমার তো কোনো ব্যাপার না রে, আমার এখন চাকরিটাও হয়ে গেছে, মা-ও সমস্ত কথা জানে। খালি বাবাকেই...ওই আর কি ! তোর দিদিকে বল—

দিদিভাই বলে যে, এখন তো আমি তোর সাথে বিয়ে করছিই না— গান্ডু কোথাকার !

দিদিভাই, নিগমদার সাথে বহু জায়গায় ঘুরতে গেছি একসঙ্গে। 'ডমিনোস্', 'গল্প'— বড় বড় রেস্টুরেন্টে। তাছাড়াও, তিস্তা স্পারে তো আমরা প্রায়শই আড্ডা দিতাম। ওখানে 'টাওয়ার' বলে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, নদীর চরের মধ্যে। খুব সুন্দর করে সাজানো নদীর ওপরের ছোট্ট রেস্টুরেন্টটা।

দিদিভাই আর নিগমদার মধ্যে কথাকাটাকাটি খুবই কম হত। বড়জোর একটা দিন, বা একটা রাত্রি। সকালে উঠেই আবার তারা এক হয়ে যেত। এমনভাবে তারা পরের দিন বা নতুন দিনটিকে শুরু করত, যেন তাদের কোনো ঝগড়ার কথাই মনে থাকত না।

প্রতিটা বছরই ভ্যালেন্টাইনস্ ডে তে দুজন দুজনের হোয়াটস্অ্যাপে স্ট্যাটাস দেয়। খুব সুন্দর লাগে সেইগুলো পড়তে, আর একসাথে তোলা ওদের ছবি দেখতে। ওরা বাড়ির সমস্যার জন্য দেখা না করতে পারলেও ফোন কল, ভিডিও কলের মধ্যে দিয়ে তারা একে অপরকে ভালোবাসার বার্তা জানাতো।

ভ্যালেন্টাইনস্ ডে-র ঠিক চার-পাঁচ দিন পর, আমার ফোন একটা মেসেজ এল। হোয়াটস্অ্যাপটা খুলে চেক করতেই দেখলাম দিদিভাই লিখেছে, "গুড্ডু, আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা আর নেই রে!"

আমি ভাবলাম আমার সাথে মজা করছে। আমিও হাসির ইমোজি সেন্ড করলাম, কিন্তু কোনো রিপ্লাই আসল না। আমি সত্যিটা জানার জন্য নিগমদাকে মেসেজ করলাম, তার কাছ থেকেও একই উত্তর এল।

কিছুক্ষণের জন্য চোখ বড়ো হয়ে মুখে হাত চলে গেছিল। হৃৎপিণ্ডের শব্দটা যেন নিজের কানে শোনা যাচ্ছিল। আমি স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম। আমার নিজের হাত-পা কাঁপা শুরু হয়ে গেছিল।

আমার চোখে দেখা সবচেয়ে ভালো জুটি কেউ দেখতে চাইলে, আমি সোজাসুজি ওদের নাম বলে দিতাম। আর, এটা সত্যিই অসম্ভব যে ওদের আলাদা হয়ে যাওয়াটা।

আমি দু’জনের সাথে কথা বলে যতটুকু বুঝতে পারলাম, ওদের আলাদা হয়ে যাওয়াটা বা থাকাটা কোনো স্বাভাবিক ব্যাপারে নয়। বরং, সাময়িক আনন্দের জন্য তাদের আলাদা হয়ে যেতে লাগলো।

দিদিভাই আর নিগমদা জলপাইগুড়িতে দেখা করা সত্ত্বেও, শিলিগুড়িতে দেখা করত। কিন্তু, শিলিগুড়িতে দেখা করার উদ্দেশ্যটা একটু আলাদা ছিল। আর সেই উদ্দেশ্যের জন্যই হয়তো তাদের সম্পর্কটা আজ বিচ্ছিন্ন।

সেবার, শিলিগুড়িতে ওরা দু’জন দেখা করে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। ওরা অন্ধকার ঘরে, ভালোবাসায় ভেসে গেছে। ওরা যৌনতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, তিন বছর আগের নতুন যৌবন আবার ফিরে পেতে চেয়েছে।

ওরা কোনো খারাপ করেনি। ওরা প্রাপ্তবয়স্ক। ওদের স্বাধীনতা, নিজের চাওয়া-পাওয়া, মন, ইচ্ছা, আনন্দ বলেও কিছু একটা আছে। কিন্তু হ্যাঁ, বিশ্বাস হারিয়ে গেলে পাওয়াটা খুব কঠিন হয়ে যায়।

আর ঠিক, সেরকমটাই হল ওদের সঙ্গে। কোনরকমভাবে নিগমদার মা জেনে গেছিল, সঙ্গে ওর বাবা-ও। আর, তারপরেই তৈরি হলো ওদের মধ্যে ভাঙনের বাঁধ। যেই মা নিজের ছেলেকে এবং সঙ্গে দিদিভাইকেও এতটা বিশ্বাস করেছিল, সেও কিনা আজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাল ছেড়ে দিল !

সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছিল, নিগমদা-র বাবা। তিনি যেমনভাবে প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্তে কথা শুনিয়ে যেত, ওর বেঁচে থাকাটাও যেন দায় হয়ে উঠেছিল। শেষমুহূর্তে, দু’জনেই একসাথে ভালোভাবে কথা বলে নিয়ে সম্পর্কের দড়িটা কাঁচি দিয়ে কেটে দিল। দু’জনের মুখেই হাসি— দুজনেরই একই মন্তব্য, 'তুমিই আমার প্রথম ভালোবাসা এবং সারাটা জীবন এভাবেই থেকে যাবে। সত্যিটা এটাই যে, ভালোবাসা কাকে বলে এই তিনটা বছরে আমরা বুঝেছিলাম— আর এটাও ঠিক যে, তুমিই প্রথম তুমিই শেষ।'

তাদের দুজনের কথার ভাঁজটাও একইরকম— ওরা আজও প্রতিটা রাতে নিজের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে দেয়। একাকীত্ব বোধ করে ওরা দুজনে। ওরা নিজেরাও জানে না যে, তাদের পরবর্তীতে আদৌ মিলন হবে কিনা !


May 26, 2021

"বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন" - অগ্নিমিত্র

Edit Posted by with No comments

 


বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন

অগ্নিমিত্র

 

ছোটবেলা থেকেই বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন আমার খুব ভালো লাগে। আমি এই ধর্মের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পাই। কোনো ধর্মকে ছোট না করেই এ কথা বলছি।

কলকাতার ঢাকুরিয়া লেকের পাশে জাপানী বুদ্ধমন্দিরে মাঝে মাঝেই চলে যেতাম ছোটবেলায়। সেখানকার পরিবেশ আমার খুব ভালো লাগতো। এরকম আরো পাঁচটি বৌদ্ধ মন্দির আছে কলকাতায়।

বৌদ্ধ ধর্ম শান্তি, অহিংসা ও সত্যের প্রতীক। যদিও এই ধর্মেও হীনযান ও মহাযান, এই দুই ধারা রয়েছে। ধারা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত। বেশির ভাগ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত মানুষই মহাযান ধারা মেনে চলেন। রয়েছে তন্ত্রমন্ত্রের প্রভাব। গেলুকপা, লোটাস সূত্র প্রভৃতি আরো উপধারা আছে। যদিও গৌতম বুদ্ধ এই সব বলে যাননি। তিনি কামনা বাসনা ত্যাগ করে 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ' ধরে চলতে বলেছিলেন। গৃহীদের বলেছিলেন জীবনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে।

দুনিয়ায় বৌদ্ধধর্মের গেলুকপা ধারার প্রধান দলাই লামা।

আজকের এই সমস্যাবহুল জীবনে বুদ্ধের এই বাণী বিশেষ দরকার। এতে মন সুস্থিত থাকবে। আর কোনো ধর্মের ভালো কিছু নিলে কোনো লজ্জা নেই।।


May 23, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯৪

Edit Posted by with No comments

May 22, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with No comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- অনৈতা রক্ষিত

 

বেশিদিন আগের কথা নয়। গুরুতরভাবে মন, শরীর সব জখম হয়ে পড়ে আছি। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ার মতো নেট ফড়িং কোত্থেকে যেনো উড়ে এল। আমার মৃতপ্রায় মানুষকে এভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হবে আমি কোনদিন ভাবিনি। ভাবনা চিন্তা ধীরে ধীরে আরো বিস্তৃতি পেলো, চলতে চলতে আরো অনেক বলতে শিখলাম, জানতে শিখলাম। প্রত্যেকটা মুহূর্তে নিজের সৃষ্টিগুলো পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার অনুপ্রেরণা পেলাম। সবমিলিয়ে ভালোবাসা দিয়ে আমাকে নতুন 'আমি' করে তুলেছে নেট ফড়িং। নেট ফড়িং এর জন্যে রইলো একরাশ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

May 20, 2021

"শুধু তুমি আর আমি" - অনাদি মুখার্জি

Edit Posted by with No comments

 


শুধু তুমি আর আমি

অনাদি মুখার্জি

 

মেঘনা ঠিক করেছে আজ বিয়েবাড়িতে শাড়ি পড়ে যাবে। দ‍রজা লাগিয়ে সেই দুই ঘন্টা ধরে শাড়িটা খুলছে আর পড়ছে ! কিছুতেই শাড়িটা ঠিক মতো গুছিয়ে পড়তে পারছে না, শেষে বিরক্ত হয়ে বলে- ‘ধুর !’

এমন সময় শুভ দরজা ঠেলে ভেতরে এসে বললো- ‘কি হল মেঘনা? এখনও তুমি রেডি হওনি ?’

মেঘনা বললো- ‘এই শাড়িটা কিছুতেই গোছ করে পড়তে পারছি না !’

সেই কথা শুনে শুভ খুব হাসতে লাগলো, মেঘনা শুভর মুখের হাসি দেখে বললো- ‘শয়তান, বলেই তার মুখের উপর শাড়িটা ছুড়ে বললো- যাও তুমি একা, আমি যাবো না।’ শুভ তার কাছে এসে বললো- ‘মেয়েদের আসল রুপ শাড়িতেই প্রকাশ পায়। নাও তুমি পড়ে নাও আমি দেখিয়ে দিচ্ছি !’

মেঘনা আবার শাড়িটা পড়লো তা দেখে শুভ বললো- ‘এমন করে কেউ শাড়ি পড়ে ? খোলো আমি তোমাকে পড়িয়ে দিচ্ছি।’ বলে শুভ বেশ সুন্দর করে তাকে শাড়িটা পড়িয়ে দিল। তা দেখে মেঘনা শুভর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললো- ‘তুমি তো দেখি সব কিছুই জানো।’

শুভ মেঘনাকে কাছে টেনে জড়িয়ে বললো- ‘হুম গো !’ মেঘনা বললো- ‘ছাড়ো চলো, বিয়ে বাড়িতে দেরি হচ্ছে না?’ তারা যখন বিয়েবাড়িতে এসে খেতে বসলো, মেঘনার দুই হাতে মেহেন্দি লাগানো। তাই সে খেতে পারছে না ! শুভ তখন তাকে খাইয়ে দিতে লাগলো, সেই সময় টুম্পা বলে উঠলো- ‘এই মেঘনা তোর কি ভাগ্য ভাল, তোর বর তোকে খাইয়ে দিচ্ছে !’

রাতেরবেলায় যখন তারা বাড়ি এল তখন শুভ মেঘনাকে বললো-‘দাও তোমার শাড়িটা খুলে দিই।’ তা শুনে মেঘনা বললো- ‘তুমি খুব দুষ্টু। এক নম্বর !’ শুভ বললো- ‘কেনো গো?’ মেঘনা মুচকি হাসি দিয়ে বললো- ‘সবসময় তুমি আমার খুলে দেখতে চাও তাই না? খুবই দুষ্টু তুমি !’ শুভ তখন মেঘনা কে বললো- ‘জেনে রাখো তুমি আমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছো, তোমার সব কিছুই আমার, আমি দেখবো না তো কে দেখবে?’ শুভ মেঘনাকে বললো- ‘জানো আমাদের বিয়ের আগে যেদিন তুমি খুব বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিলে ! সেই দিন তোমার পোশাক খুলে আমার জামাটা তোমাকে পড়তে দিয়েছিলাম !’ মেঘনা বললো জানি- ‘তুমি তখন দুষ্টু চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিলে ! এই, তোমার এই কথাটা মনে আছে?  যেদিন তোমার বাবা মারা যায় হাসপাতালে, সেদিন তোমার সাথে সারারাত আমি হাসপাতালে ছিলাম তোমার পাশে ! পরেরদিন তোমার মন খুব খারাপ ছিল সেই সময় আমি তোমার পাশে সারাদিন বসেছিলাম !’

‘জানি’ বলে শুভ মেঘনাকে বুকে মধ্যে টেনে বললো- ‘তুমি আমার আর আমি তোমার ! তুমি যদি মেঘ হয়ে ওঠো আমি হবো বৃষ্টি।’ বলে একটি চুমু খেতে চাইলো, মেঘনা বললো- ‘এই অসভ্য আজ ছাড়ো ঘুমাতে চলো !’ বিছানায় শুয়ে শুভ ঘুমিয়ে পড়লো শান্ত ছেলের মতো। মেঘনা তার পাশে শুয়ে দেখছে শুভকে ! আর ভাবছে শুভ তুমি শুধু আমার ! আমি খেলে তুমি খাবে, আমি হাসলে তার কারণ তুমি হবে ! তোমার খুশিতে আমি সুখি ! আজ জানো শাড়ি কেন পড়লাম ? শুধু তোমার জন্যই ! তুমি শুধু আমার।