Jul 1, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with 1 comment

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- সায়রী লাহা

 

সালটা ২০১৯ তখন আমি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী, সবে ভাবছি কোন পত্রিকায় লেখা দেবো। কোনো পত্রিকা যে আমার লেখা গ্রহণ করবে সে আত্মবিশ্বাস আমার একেবারেই ছিল না। আমার এক বোন নীহারিকার লেখা নেট ফড়িং এ প্রকাশ পাওয়ায় আমার খুব ভালো লাগে, কোনো অনলাইন মাধ্যমে এভাবে লেখা প্রকাশ পেতে পারে সেটা আমার ভাবনার বাইরে ছিল।

আমি নেট ফড়িং এর সম্পাদক বিক্রমের সাথে যোগাযোগ করি, লেখাও দি। এক সপ্তাহের মধ্যে নেট ফড়িং এ প্রকাশিত হয় আমার লেখা। জীবনের প্রথম অগোছালো, এলোমেলো হাতের লেখাকে প্রকাশ করেছিল নেট ফড়িং। স্থান দিয়েছিল, পরিচয় দিয়েছিল, খুব তাড়াতাড়ি আপন করে নিয়েছিল আমার অপরিপক্ক লেখনী।

নেট ফড়িং এর ‘বইমেলা সংখ্যা’ প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা বইমেলায় এবং নেট ফড়িং এর হাত ধরেই আমার প্রথম কলকাতা বইমেলায় আত্মপ্রকাশ। জ্বর গায়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ছুটেছিলাম ‘বইমেলা সংখ্যা’ সংগ্রহ করতে।

সময়ের সাথে সাথে অনেক পত্রিকার সাথে পরিচয় হলেও নেট ফড়িং এর প্রতি আপনজনের মতো অধিকার বসাই। বহু মাস কাটে লেখা হয়েই ওঠে না, যা এলোমেলো লেখা তাও নেট ফড়িং এর কাছেই পাঠাই আজও।

সময়ের সাথে সাথে নেট ফড়িং ও পা রাখতে চলেছে ২০০ সংখ্যায়। আগামীর অভিনন্দন তো আছেই, আছে অনেক ভালোবাসা। বাংলা ভাষাকে এভাবে দায়িত্ব নিয়ে দেশের কোনায় কোনায় পৌঁছে দিয়ে, বিভিন্ন অঞ্চলের অগণিত পাঠক, লেখক সম্পর্ক নিয়ে নেট ফড়িং প্রশস্ত ডানা মেলে উড়ে চলুক দিগন্তে।


Jun 29, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with No comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- পহেলী পাল

 

আমার মত গুছিয়ে কথা বলতে বা লিখতে না পারা মানুষটার অগোছালো কথাগুলোকে কবিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য নেটফড়িং-কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার তরফ থেকে। আমি পহেলী। নেটফড়িং পরিবারের একজন সদস্য, ঠিক কবে থেকে, তা সত্যিই আজ আর হিসেব করে বলতে পারবো না। আসলে চলতে চলতে পথ, সময় কিছুরই হিসেব থাকে না। আর সেই পথ যখন বিক্রমদার মত সৃজনশীল, বিনয়ী মানুষের সাথে চলা যায়, তখন সময়ের হিসেব করার সুযোগই থাকে না। প্রতি মূহুর্তে একটা নতুন চিন্তা, চেষ্টা, চমক দিয়ে নেটফড়িং - এর চিরাচরিত সাপ্তাহিক ধারাকে নিপুণ হাতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে বিক্রমদা সহ অ্যাডমিন প্যানেলের সকল সদস্য। আর তার ফলস্বরূপ, কিছু প্রবীণ গুণীজনের পাশাপাশি আমাদের মত কাঁচা হাতের লেখাও পাঠকদের রবিবারটাতে একটু সাহিত্যের রং মিশিয়ে দিতে ঠিক সময়ে পৌঁছে যায়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, অন্ততঃ যেটা আমার ব্যক্তিগতভাবে ভালো লাগে সেটা এখানকার শৃঙ্খলা, সততা আর অবশ্যই সকলকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। এককথায় খুব নিজের নিজের মনে হয়।

খুব শীঘ্রই ২০০ তে পা দিতে চলেছে নেটফড়িং। সবসময় পাশে আছি এবং আগামীতেও থাকবো।


Jun 27, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯৯

Edit Posted by with No comments

Jun 20, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯৮

Edit Posted by with 1 comment

Jun 19, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with No comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- নীলাদ্রি দেব

 

নেট ফড়িং, একটি আলোর নাম -

ভারতে ইন্টারনেটের আত্মপ্রকাশের প্রায় আড়াই দশক পেরিয়ে গেল। এই বছর পঁচিশের মধ্যে প্রযুক্তি প্রতিটি সেকেণ্ডে, প্রতিটি মুহূর্তে উন্নত থেকে উন্নততর হয়েছে. প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা থেকে সাহিত্য, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি ক্ষেত্র একটি নতুন দিশার দিকে এগিয়ে চলেছে। যে কোনো বিষয় চর্চা এবং প্রসারের পরিধি যেভাবে বিস্তৃত হয়েছে এবং হচ্ছে, তা অভাবনীয়। ঠিক এমনই এক আলোর ভেতর দাঁড়িয়ে বিভিন্ন অন্ধকারকে মুখোমুখি যুঝে নিতে হচ্ছে। প্রাককথনে এত ভনিতা হয়তো মানানসই নয়, তবু বলতেই হয়, নেটদুনিয়ায় দাঁড়িয়ে 'নেটফড়িং' একটি অনন্য উচ্চারণ। যার বৃত্তের ভেতর সৃষ্টির সম্ভার। লেখক ও পাঠক হিসেবে এর সাথে জড়িয়ে থেকে অনুভব করেছি এর আন্তরিকতা। প্রথম যখন লিখেছিলাম, আজ যখন লিখছি... উত্তাপটা একই রকম। নিয়মিত, ধারাবাহিক চর্চাকে কুর্ণিশ জানাতেই হয়। আর তা যদি প্রান্তিক এক শহরে বসে দাপটের সাথে হয়, তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধও জাগে. অভিনবত্ব আর অধ্যাবসায়... এও নেটফড়িং এর সম্পদ। তরুণ প্রজন্মের কত লেখককে স্পেস দিচ্ছে এই পত্রিকা, তা বিস্মিত করে। আসলে এগুলোই উৎসাহ, অক্সিজেন। এই প্ল্যাটফর্ম কাজকে গঠনমূলক দিকে নিয়ে যাবে, নিউক্লিয়ার সময়েও সমবেত বাঁচতে শেখাবে, চর্চায় রাখবে, পুষ্ট করবে জ্ঞান ও বোধকে এবং তা করছেও। এটাই তো আমাদের অনেকের চাওয়া. মানসিক সুস্থতা, যৌথতা এসবই সৃষ্টিসুখের সমান্তরালে, বাকি সব মিথ্যে। আলো, গদি, মঞ্চ, মাইক... সব। যারা বিশ্বাস করেন রিপুর বিপরীতেও স্রোত আছে, খালি চোখে দেখা প্রতিদিনের জীবনের বিপরীতেও স্রোত আছে, তাদের জন্য উল্লাস। এই উল্লাসের তীব্রতা আছে বলেই এখনও ফুল ফোটে, পাখি গায়। ফড়িং উড়ে বেড়ায়। যখন অন্তর্জালে এসে বসে... আমরা মুগ্ধতা আঁকি।

Jun 18, 2021

"দেশের আজব নিয়ম" - ইয়াকুব হোসেন

Edit Posted by with No comments

 


দেশের আজব নিয়ম

ইয়াকুব হোসেন

 

বৈশাখ মাস, প্রচণ্ড গরম দিনেরবেলা কোথাও বসে থাকা যায় না। তাই সবাই রাত্রিতে আড্ডা দেই। সেখানে বয়স্ক থেকে ছোট-ছোট ছেলেরাও উপস্থিত থাকতো। হঠাৎ একদিন দাদুর (ঠাকুরদা) মুখ থেকে এই কাহিনীটি শুনে আমি নিজের মতো করে লিখছি। এক গুরু তার শিষ্যকে নিয়ে ঘুরতে গেছেন এক দেশে। সেই দেশে তেলের দাম আর ঘি-এর দাম সমান। শিষ্য গুরুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কী দেশ গুরু তেলের দাম আর ঘি-এর দাম সমান। তার উওরে গুরু বলেছিলেন এই দেশের মানুষ সব শয়তান, তাই তাদের তেলের দাম আর ঘি এর দাম সমান। শিষ্য ঘি খেতে খুব পছন্দ করতো। তাই নিজের দেশে ফেরার সময় শিষ্য গুরুকে বলেছিলেন, ‘আপনি দেশে ফিরে যান, আমি যাবো না,’ গুরু বললেন ‘কেন যাবি না?’ উওরে শিষ্য বললেন, ‘আমি ঘি খাবো ও মোটা হবো। গুরু অনেক বোঝানোর পর একাই দেশে ফিরলেন।

কিছুদিন যাওয়ার পর সেই দেশে দু’জন চোর চুরি করতে গিয়ে দেওয়ালে চাঁপা পড়ে মারা যায়। চোরের পিতা রাজার কাছে নালিশ জানায় যে, তার দুটি সন্তান চুরি করতে গিয়ে দেওয়ালে চাঁপা পড়ে মারা যায়, আমি এর বিচার চাই। রাজা বললেন দেওয়ালটা কার বাড়ির ছিল। চোরের পিতা বললো লেবুর বাড়ির দেওয়াল ছিল। রাজা বললেন লেবু-কে ধরে নিয়ে আয়, ওর ফাঁসি হবে।

রাজার কথা মতো লেবুকে ধরে নিয়ে আসা হল এবং বলা হল তোমার ফাঁসি হবে। লেবু বললো ‘কেন?’, রাজা বললেন তোমার বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে দেওয়ালে চাপা পড়ে দুটি ছেলের প্রাণ গেছে, তাই তোমার ফাঁসি হবে। লেবু বললো দোষ তো আমার না, রাজা বললেন, ‘তাহলে কার দোষ?’ লেবু বললো, ‘দোষ মিস্ত্রির, কারণ আমি সিমেন্ট, বালু, রড ইত্যাদি সবই তো ঠিক দিয়েছি। মিস্ত্রি এখন হালকা করে দেওয়াল বানিয়েছে।’ রাজা বললেন, ‘তাহলে মিস্ত্রির ফাঁসি হবে।’ রাজার কথা মতো সেই মিস্ত্রিকে ধরে নিয়ে আসা হল এবং তাকে বলা হল তোমার ফাঁসি হবে। মিস্ত্রি বলছে ‘কেন?’ রাজা বললো, ‘তুমি লেবুর যে দেওয়ালটা হালকা করে বানিয়েছ, সেই দেওয়ালে চাঁপা পড়ে দুজন নাগরিকের প্রাণ গেছে তাই তোমার ফাঁসি হবে।’ মিস্ত্রি বলছে, ‘দোষ আমার না, দোষ হচ্ছে জোগাইলের। আমি জোগাইলকে পানি (জল) কম দিতে বলেছি, ও বেশি দিয়ে ফেলেছে তাই দেওয়াল হালকা হয়েছে।’ রাজা বললেন, ‘তাহলে জোগাইলকে ধরে নিয়ে আয় ওর ফাঁসি হবে।’ রাজার কথা মতো জোগাইলকে ধরে নিয়ে আসা হল এবং বলা হল তুমি মশলায় পানি কেন বেশি দিয়েছিলে তোমার ফাঁসি হবে। জোগাইলা বলছে, ‘ও দোষ আমার না, ও দোষ হাতি ওয়ালার। কারণ হাতি ওয়ালা হাতি ছেড়ে দিয়েছিল। সেই হাতি দৌড়ে যাওয়ার সময় হাতির পা লেগে পানির বালতি পড়ে যায়, তাই মশলায় পানি বেশি হয়েছিল, দোষ আমার না, দোষ হাতিওয়ালার।’ রাজা বললেন, ‘হাতিওয়ালাকে ধরে নিয়ে আয় ওর ফাঁসি হবে।’ রাজার কথা মতো হাতিওয়ালাকে ধরে নিয়ে আসা হল এবং তাকে বলা হল তুমি হাতি ছেড়ে দিয়েছিলে কেন, তোমার ফাঁসি হবে। হাতিওয়ালা বললো, ‘দোষ আমার না, দোষ হচ্ছে মহিলার। মহিলাটি পায়ে ঘুঘরা পড়েছিল, সেই ঘুঘরার ঝনঝন আওয়াজ শুনে আমার হাতি দৌড় মেরেছিল।’ রাজা বললো তাহলে মহিলাটিকে ধরে নিয়ে আয়, মহিলার ফাঁসি হবে। রাজার কথা মতো মহিলাটিকে ধরে নিয়ে আসা হল এবং মহিলাটি বললো, ‘দোষ আমার না, দোষ হচ্ছে বানিয়ার। কারণ বানিয়াই আমাকে এই ঘুঘরা বানিয়েদিয়েছে।’ রাজা বললো, ‘তাহলে বানিয়াকে নিয়ে আয়, বানিয়ার ফাঁসি হবে।’ রাজার কথা মতো বানিয়াকে ধরে নিয়ে আসা হল এবং বলা হল তোমার ফাঁসি হবে। বানিয়া হতবাক হয়ে বলছে ‘কেন?’ তখন রাজা সব ঘটনা খুলে বললো কিন্তু বানিয়ার কাছে কোনো উপায় না থাকায় ফাঁসি নিতে বাধ্য হয়।

বানিয়াকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে দড়ি নিয়ে আসা হল এবং বানিয়াকে ফাঁসিতে ঝোলানো হল, কিন্তু বানিয়ার গলা এতটাই চিকন যে দড়ি তার গলাকে ধরে রাখতে পারছেনা, সে দড়ি থেকে খুলে পড়ে যাচ্ছে। জল্লাদ বললো, ‘রাজামশাই আপনার হুকুম তো কার্যকরী হচ্ছে না !’ রাজা বললো ‘কেন?’ জল্লাদ বললো- ‘বানিয়ার ঘাড় খুব চিকন, দড়িতে আটকায় না।’ রাজা বললো, “এই দড়িতে যার গলা মিলবে তাকেই নিয়ে আয়।’ খুঁজতে খুঁজতে সেই শিষ্যকে পাওয়া গেল এবং তাকে ধরে নিয়ে আসা হল, তাকে বলা হল তোমার ফাঁসি হবে, শিষ্য বললো- ‘কেন আমি তো কোন অন্যায় করিনি।’ রাজা বললো, ‘তোর ঘাড় মোটা এই জন্য তোর ফাঁসি হবে।’ শিষ্য তখন নিরুপায়, রাজা তাকে বললেন, ‘তোমার কোন শেষ ইচ্ছে থাকলে বলো।’ শিষ্য বললেন ‘আমার শেষ ইচ্ছে হল আমি আমার গুরুর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

শিষ্যের কথা মতো তার গুরুকে চিঠি দেওয়া হল, সেই চিঠি পেয়ে গুরু সেখানে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায়। গুরুকে দেখে শিষ্য গুরুর পা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘গুরু আমাকে বাচান।’ গুরু তখন শিষ্যকে বললো ‘আমার বুদ্ধি মতো কাজ করবি...।’ শিষ্য বললো ‘ঠিক আছে।’ ফাঁসির দিন গুরু বলছে ‘আমারে ফাঁসি দেন, আমার শিষ্যকে ছেড়ে দেন’ ; শিষ্য বলছে ‘আমাকে ফাঁসি দেন, আমার গুরুকে ছেড়ে দেন।’ জল্লাদ বলছে ‘রাজা দু’জনকেই ফাঁসি দিয়ে দেই।’ রাজা বলছে ‘না, ফাঁসি হবে একজনের। জল্লাদ তুমি একটু থেমে যাও, দুজনেই ফাঁসি নিতে চাচ্ছে এর মধ্যে রহস্য আছে।’ রাজা সেই রহস্য জানতে চাইলে তারা কেউ বলতে চাচ্ছিলেন না, অনেক অনুরোধের পর গুরু বলতে শুরু করে যে আমি ওই দড়ির মধ্যে সব স্বর্গ (জান্নাত) দেখতে পাচ্ছি। এই দড়িতে যার ফাঁসি হবে সে স্বর্গ (জান্নাত) লাভ করবে। রাজা মনে মনে বলছে আমি জীবনে কত পাপ করলাম, আমি জানি আমি নরকে (জাহান্নামে) যাবো, আর যদি এই দড়িতে আমার ফাঁসি হয় তাহলে আমি স্বর্গ (জান্নাত) লাভ করবো। এই ভেবে জল্লাদ-কে বলে ‘ওদের ছেড়ে দিয়ে আমার ফাঁসি দে।’


Jun 13, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯৭

Edit Posted by with No comments

Jun 12, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with No comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- মনামি সরকার

 

নেট ফড়িং এর সাথে আমার বহু স্মৃতি আছে তবে তার মধ্যে অন্যতম হলো তখনও আমি মোবাইলে বাংলা টাইপ করতে পারি না। যেটুকু যা লেখালিখি কাগজ কলমে করতাম। তাই কখনও কোনও অনলাইন ম্যাগাজিনে নিজের লেখা পাঠাতে পারতাম না। কিন্তু ইচ্ছেটা মনে ছিলই। একদিন ভাই বিক্রমের সাথে এই ব্যাপারে কথা হল ও বলল "ঠিক আছে ফটো তুলে পাঠাও দেখি কিছু করা যায় কিনা"? পরের সপ্তাহে নেট ফড়িং এর লেখক তালিকা যখন ফেসবুকে প্রকাশিত হল সেখানে নিজের নাম দেখে কি যে আনন্দ হয়েছিল বলে বোঝাতে পারবো না। ই-ম্যাগাজিন এ প্রথম আমার লেখা ছাপা হয়েছিল নেট ফড়িং এই। নেট ফড়িং এর জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

 


Jun 11, 2021

"তা সে যতই কালো হোক" - মিলন পুরকাইত

Edit Posted by with 3 comments

 


তা সে যতই কালো হোক

মিলন পুরকাইত

 

আমাকে দেখতে বড্ড খারাপ ছিল। বেশ কালো আর মুখশ্রী... না না কালো মেয়ের রূপ গুণের বিচার আলাদা দাঁড়ি পাল্লায় হয় তাই সে কথা থাক।

দুই বোন এক ভাই ছিলাম আমরা। দিদি রূপে গুণে একেবারে লক্ষী সরস্বতীর মতো ছিল। দাদাই তো ছেলে তাও সে খুব ফর্সা খুব লেখাপড়ায় ভালো ছিল।

বাকি আমি !! তো সবাই বুঝিয়েই দিতো কিন্তু কি আর করা যায়।

একমাত্র বাবাই আমাকে বড্ড ভালোবাসতো। আমাদের সংসারটা মোটামুটি বাবার আয়েই চলতো।

বাবার সব চেয়ে বড় দিদি বিধবা হবার পরে এ সংসারে তখন এসেছিল যখন আমি খুব ছোট। জেঠু-জেঠিমা একতলায় থাকতো, আলাদা রান্না খাওয়া হলেও তাদের ভারও বাবার ওপরই বেশিটা ছিল।

কারণ জেঠু যে কারখানায় ক্যাশিয়ারের কাজ করতেন সেটা বছরের ছ'মাস বন্ধ থাকতো কেন কে জানে। পিসি নিঃসন্তান ছিল  আর সারাদিন সংসারের কাজে মার সাথেই লেগে থাকতো।

বাবা খুব গুরু গম্ভীর মানুষ ছিল। অফিস যাওয়া আর বাড়ি আসা আর ফিরেই খবরের কাগজ বা বই মুখে বসে থাকা।

কেউ বিশেষ ঘেঁষতো না বাবার কাছে। অথচ আমি হা পিত্যেস করে বসে থাকতাম কখন ফিরবে বাবাই। আমার সারাদিনের গল্প, স্কুলের, দিদি-দাদার নামে নালিশ, সব নিয়ে আমি বসে থাকতাম বলবো বলে।

সব শুনে ডাক পড়তো তাদের।

কিছুই তেমন বলতো না বাবাই। শুধু যেদিন আমি লাল ফ্রক নেবার জন্য বায়না করেছিলাম আর জেঠি হেসে বলেছিল "এখানে যা করছিস করে নে, বিয়ের পর যেন শাশুড়ির কাছে আবদার করিস না আমাকে লাল শাড়ি কিনে দাও যেমন আমার কাছে করেছিলি" আর বলে খুব হেসেছিল ওরা সবাই মিলে সেদিন বাবাকে সব বলার পরে কেমন থমকে গেছিলো বাবা।

আর একটু পরে নিজের স্বভাব-বিরুদ্ধ কাজ করেছিল। চটি পরে আমার হাত ধরে নিজের বড় দাদার ঘরের দরজায় পৌঁছে গেছিলো।

জেঠিমা শাঁখ হাতে ঠাকুরের সামনে বসেছিল আর জেঠু কি জানি কি বলছিল। আমার বুকের মাঝে ধড়াস ধড়াস করছিল আর মন বলছিল কিছু একটা খারাপ হতে চলেছে।

জেঠুর মেয়ে অনেক বড় ছিল আমার থেকে। কলেজের শেষ পড়া চলছিল তার তখন। কিন্তু কে জানে কেন ঝুমদি আমাকে খুব ভালোবাসতো। আমাদের দেখে একলাফে বাইরে এসে আমার হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে যেতে বললো "ও মা ও বাবা, কাকাই এসেছে আর তোমরা নিজেদের মধ্যে কি জানি কি কথা বলে চলেছো"

জেঠু-জেঠিমা মনে মনে কতটা বাবাকে পছন্দ করতো তা জানতাম না কিন্তু সামনে খুব ভালো ব্যবহার করতো।

বাবা কিন্তু এক পাও ভেতরে না রেখে খুব আস্তে আস্তে বললো "আচ্ছা বৌদি কোনদিন কি আমি বা আমার ছেলে-মেয়েরা তোমাকে কোন অসম্মান করেছে। সত্যি করে বলো তো ! আর মিতা ও তো তোমাকে নিজের বড় দিদির মতো ভালোবাসে। আজ তুমি মিমিকে যা বলেছো সেটা ও তোমার মেয়ে নয় বলে তাই না! আর একটা কথা বৌদি তুমি যেদিন বিয়ে করে এ বাড়ি এসেছিলে আমার মাকে তো সবাই বলেছিল, ওমন ফর্সা ছেলের এই এত শ্যামবর্ণ মেয়ে ! তোমার মনে আছে বৌদি আমার মা কিন্তু তীব্র প্রতিবাদ করেছিল সেদিন "বলেছিল মানুষের রং রূপ কতদিন থাকে, থাকে তার গুণ, তার স্বভাবের মিষ্টতা তাই না !

আজ বড্ড কষ্ট পেলাম তোমার ব্যবহারে"

দাঁড়ায়নি বাবাই আমার হাত ধরে ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে।

জেঠি আর জেঠু তারপর অনেক কিছু বলেছিল যদিও কিন্তু বাবা তারপর থেকে আর কোনদিন স্বাভাবিক হয়নি সেটা সবাই জানতো।

ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিলাম আমরা আর ঝুমদি সবার বড় হওয়ায় বিয়ে হয়ে যখন শ্বশুরবাড়ি চলে গেলো তখন আমি স্কুলের পড়া সবে শেষ করেছি।

রিয়া আমার দিদি আর ঝুমদি কিছু ছোট বড় ছিল বয়েসে।

জেঠিমা, জেঠু দু’জনেই ছেলেদের ভালোবাসতো। মেয়েরা যতই লেখাপড়া করে নিক আর কত বড় বড় চাকরি করুক না কেন তবু মেয়েরা তো মেয়েই হয়, ছেলেদের সাথে তাদের তুলনা করা একেবারে বৃথা এটাই মত ছিল দু’জনেরই।

আমার মা আর দিদি যদিও ওই আলোচনায় তেমন থাকতো না তবু কেমন যেন মনে হতো ওরা ওটাকেই সমর্থন করছে।

ঝুমদি বিয়ে হয়ে চলে যাবার পরে জেঠিমা বড্ড একা হয়ে গেছিলো। আমার দিদি নিজের পড়া আর আসন্ন বিয়ের কথা ভেবে নিজের রূপচর্চার পেছনেই বেশী সময় দিতো।

আমার কলেজে ভর্তির পরেও তখন ক্লাস তেমন শুরু না হওয়ায় আমি যখন তখন "ও মামণি কি করছো" বলে পৌঁছে যেতাম। খুব ছোট থেকেই কেন জানি না আমি জেঠিকে মামণি বলেই ডাকতাম।

ঝুমদি চলে যাওয়ার পরে কেমন যেন মনে হতো জেঠিমা আমার পথ চেয়ে বসে থাকতো।

প্রথম প্রথম যদিও তেমন কিছু বলতো না, নিজের মনে কাজ করতো, পরে একটু একটু করে বদলে গেছিলো জেঠি।

আমার পছন্দের খাবার বানিয়ে রাখতো, কখনো বা আমি গেলেই বলতো "যা না তোর মা আর দি'কেও ডেকে আন, আজ চা'টা সবাই মিলে এখানেই খাবো ভেবেছি !"

বাবা কিন্তু সেই সেদিনের পর থেকে মোটেই আর বদলায়নি। নিজের দায়িত্ব কর্তব্য সব করলেও বাবা একটু দূরে দূরেই থাকতো নিজের বৌদির থেকে। এমন নয় যে কথা বলতো না, বলতো কিন্তু তাতে প্রচ্ছন্ন অভিমান লুকিয়ে থাকতো।

বিয়ের পর ঝুমদির আসা যাওয়া একেবারেই ছিল না বললে চলে।

ফোনেও তেমন কথা হতো না কারো সাথে। আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করে কথা বলতো দি। যেই বলতাম "কবে আসবি 'দি !"

একটু চুপ করে থেকে বলতো

"মা-বাবা তো নিজের ছেলেকেই ভালোবাসে, কই আমাকে তো একবারও ফোন করে না তারা !"

এমন দিনেই জেঠির বড্ড শরীর খারাপ হলো। কি যে হলো কেউ বুঝতে পারছিল না। ডাক্তার ওষুধ সব চলছিল আর আমি সেই প্রথম দিন থেকেই জেঠির কাছে থেকে গেছিলাম।

মা, বাবা কোনদিন আমাদের কোন কাজে বাধা দেয়নি এবারও দিলো না।

ওপর থেকেই রান্না করে মা সব পাঠিয়ে দিতো। রিয়া'দি মাঝে মাঝেই আসতো কিন্তু আমি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে ওই জেঠির পাশেই থাকতাম।

দিন কাটছিল আর আমার কলেজ যাবার দিন এগিয়ে আসছিল। মা দেখা শোনা তেমন ভাবে করতে পারবে না বলে পিসির ওপর জেঠিকে দেখার ভার এসে পড়লো।

ভালো ছিল পিসি কিন্তু দু'জনের একদম বনি-বনা হতো না।

হাঁড়ির মতো মুখ করে পাশ ফিরে শুয়ে থাকতো জেঠি, পিসিও অন্যমনে নিজের বই বা সেলাই নিয়ে বসে থাকতো।

আমি কলেজ থেকে ফিরেই কিছু না খেয়েই পৌঁছে যেতাম জেঠির কাছে। পিসি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচতো। সোজা উঠে ওপরে নিজের ঘরে পৌঁছে যেত।

বছর ঘুরে আবার নতুন বছর আসার আগেই আমার বিয়েটা হঠাৎ ঠিক হয়ে গেলো।

আমি শুধু না আমার বাড়ির লোকেরাও খুব অবাক হলো যখন অভিমন্যুর মতো এত হ্যান্ডসাম ছেলে রাজি হয়ে গেছিলো আমাকে বিয়ে করতে।

ছোট্ট পরিবারে অভিমন্যু ওর বাবা মা আর ওর ঠাকুমা থাকতো।

মেয়ে দেখতে ওর ঠাকুমা এসেছিল ওর বাবার সাথে।

সেদিন জেঠির শরীরটা বড্ড খারাপ ছিল। ঝুমদি এসেছিল আমাকে দেখতে আসবে শুনে। মা আর রিয়া'দি বারবার তাড়া দিচ্ছিলো আমাকে

"মিমি চল, ফেসপ্যাকটা লাগিয়ে নে, আর সময় নেই, ওরা পাঁচটা বাজলেই এসে পড়বে"

কিন্তু আমি যতবার জেঠিকে ঘুম পাড়িয়ে ঝুমদি আর পিসিকে বলে উঠতে যাচ্ছিলাম, জেঠি আমার আঙ্গুল শক্ত করে ধরে বলে উঠছিলো

"যাস না আমাকে ছেড়ে মামণি"

জ্বরের ঘোরে ভুল বকছিলো জেঠি। আজকাল রাতে দিনে যখনই বেশি শরীর খারাপ হতো জেঠি আমাকে মামণি বলেই ডাকতো কেন কে জানে !

একটু পরেই বাবাইকে দৌড়ে আসতে দেখেই বুঝে গেছিলাম, ওরা এসে গেছে কিন্তু আমার তো কিছুই করার উপায় ছিল না।

আমি কোন মেকআপ ছাড়াই বসে ছিলাম জেঠির পাশে।

আমার কালো কোঁচকানো চুল এলোমেলো হয়ে আমার কপালকে প্রায় ঢেকে রেখেছিল। চান করে সেদিন চার বছর আগে জন্মদিনে বাবাইয়ের দেওয়া লাল কুর্তি আর সাদা স্কার্ট পরেছিলাম আমি।

মা আর ঝুমদি মিলে আমার জন্য রানী রঙের সিল্কের শাড়ি আর গয়নাগাটি বের করে রেখেছিল পাত্রপক্ষের সামনে পড়ার জন্য। কিন্তু সেসব কিছুই আর পরা হয়ে ওঠেনি।

আমার কানে সব সময়ের পরে থাকা সেই লাল ডালিম পাথরের অল্প ঝোলা দুল আর গলায় তেমনই পেন্ডেন্ট ছিল। হাতে সেই ঠাম্মির দেওয়া সরু সোনার বালা ব্যস আরেক হাত একেবারে খালি।

বাবাইয়ের পেছনে এক এক করে সবাই ঢুকলো ঘরে। আমি জেঠির হাত ছাড়িয়ে উঠতে যাবার আগেই অভির ঠাম্মি বারণ করলো আমায়

"না না উঠো না। ওনার ঘুম ভেঙে যাবে !'

অভি দেখলো আমায় এক পলক। কে জানে কেন আমাকে তো এর আগেও কেউ পছন্দ করেনি তাই জানতাম এটাও তেমনই কিছু হবে।

আমি তো বড্ড কালো, আমি সাজতেও ভালোবাসি না।

তাই আমি নির্দ্বিধায় জেঠির হাতের থেকে হাত একটু ছাড়িয়ে হাত জুড়ে নমস্কার করেছিলাম।

কিন্তু পরে জেনেছিলাম শেষ বিকেলের কনে দেখা আলো সেদিন জেঠির ঘরের পশ্চিমের জানলার পর্দা ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমার মুখে নাকি কি একটা অপরূপ আলো ছুঁইয়ে দিয়েছিল।

আমার খোলা এলোমেলো কোঁচকানো চুলের মাঝে অভির ঠাম্মি নাকি নিজের কমবয়সের 'আমি'টাকে খুঁজে পেয়েছিল।

বিয়েটা হলো আমার ঠিক একবছর পরে কারণ রিয়া'দির বিয়েটা অনেক বছর ধরেই ঠিক ছিল ওর কলেজের বন্ধুর সাথে। বাবাই শেষ পর্যন্ত রাজি হতেই দি আর শুভাশিসদার বিয়েটা হয়ে গেলো।

জেঠি সুস্থ হলেও আমাকে কাছ ছাড়া করতে চাইতো না তেমন করে ।

"আর কদিন পরেই তো চলে যাবি আমাদের ছেড়ে তোর ওই নতুন সংসারে, আর তো এসে থাকবি না এমন করে, এই কটা দিন আর ওপর নীচ না করে আমার কাছেই থাক না হয় !" সারাক্ষণ এটাই বলতো জেঠি।

বিয়ের কেনাকাটা দিদিরা আর বাবাই করেছিল। গয়না মা আগেই তৈরি রেখেছিল নিজের দুই মেয়ের জন্য।

বিয়ের আগের দিন জেঠির ঘরেই আইবুড়ো ভাত খেয়েছিলাম আমি।

নিজে বসে সমস্ত রান্না করেছিল জেঠি আমার জন্য। কারোকে হাত লাগাতে দেয়নি তাতে তেমন করে রিয়া'দি ছাড়া।

সবার খাবার শেষে বাবাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল জেঠি। হাতে মস্ত বড় দু দুটো প্যাকেট দেখে বাবাই অবাক হয়ে সব ভুলে সেই আগের মতোই বলেছিল

"কি আছে গো বৌদি, আমার জন্য উপহার এনেছো তুমি !"

কেঁদে ফেলেছিল জেঠি আর প্যাকেট বাবাইয়ের হাতে ধরিয়ে বলে উঠেছিল

"ক্ষমা করে দিও ঠাকুরপো। সেই একদিনের কথা শূল হয়ে বিঁধে আছে তোমার বুকে জানি। কিন্তু বৌদিরা তো মা হয় তাই না। ক্ষমা করে দিও আমাকে !'

প্যাকেটে কি ছিল তা বিয়ের দিন আমি জেনে ছিলাম...

লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি আর অন্য প্যাকেটে জেঠির নিজের বিয়ের জড়োয়ার হার। লাল ছোট ছোট পাথরে সাজানো সে হার আমার ছোট থেকেই খুব পছন্দ ছিল।পাশে এসে বলেছিল জেঠি " মিমি পছন্দ হয়েছে তো !"

সাজাতে সাজাতে ঝুমদি ফিসফিস করে কানে কানে বললো

"ইশ এই হারটা মা তোকে দিয়ে দিলো, আমাকে দিলো না"

আমি গলা থেকে খুলতে যাচ্ছিলাম, মারলো দি আর ঝুম'দি আমার পিঠে।

"সব সময় খুব ভালো সাজতে ইচ্ছে হয় তাই নারে ! চুপ করে বসে থাক, বর এলো বলে !'

বিয়ে করে চলে আসার আগে কাঁদিনি আমি, আসলে কোন মেয়েরাই কাঁদে না মনে হয়। ওটা কান্না নয় আসলে...

একটা গাছকে নিজের চেনা চেনা জায়গা ছেড়ে শুধু একটা অচেনা জায়গায় নতুন মাটিতে বসিয়ে দেওয়া !

একটা একটা করে শেকড় ছিঁড়ে যায় কেউ জানতে পারে না, কেউ স্পর্শ করতে পারে না তার কষ্ট।

অন্য জায়গায় আলো হাওয়া ভালোবাসা পেয়ে কেউ কেউ খুব সুন্দর হয়ে যায় আর কেউ বা কিছুদিন বেঁচে একটু একটু করে শুকিয়ে মরে যায়।

অভিকে প্রশ্ন করে ছিলাম বৈ কি

"এত সুন্দর সুন্দর মেয়ে থাকতে এই কালো মেয়েটাকে কেন পছন্দ করেছিলে তুমি ! জানো সত্যি বলছি আমি খুব অবাক হয়েছিলাম "

অভির বাড়ির ছাদে, বারান্দায় গাছের ভিড়ে আমি নিজের একটা কোনা বানিয়ে নিয়েছিলাম আমার মতো করে, শেকড় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে আমি নাকি সুন্দর হয়ে উঠছিলাম...

গোধূলির আলো সেদিনও আমার মুখে পড়েছিল বোধহয়। আলতো হাতে আমার কপাল থেকে চুল সরিয়ে অভি বলেছিল

"সেই ছোট থেকেই ঠাম্মির মুখে শুনে এসেছি রঙ রূপ সে তো মনের আয়না। অন্তরের আলো যখন হৃদয়ে নিজের জলছবি আঁকতে থাকে, সেই আলো মানুষের চোখে মুখে তার ছাপ ফেলে , তুমি যে কত সুন্দর তা তুমি আমার চোখে দেখে নিও !"

দূর ! আমি এত সব বুঝি না !

আমি শুধু জানি, নিজের মনের আলোয় অন্যকে একটু পথ দেখানো গেলে তাতে ক্ষতি কি !

আমি কালো, বড্ড কালো কিন্তু কি করি ওই ভালো হবার ইচ্ছেটা যে সেই ছোটথেকেই।

এই দেখো না বলতেই ভুলে গেছি ওই লাল বেনারসি আর জড়োয়ার হার পরে জেঠির পা ছুঁয়ে যখন বলেছিলাম " সাবধানে থেকো মামণি, আমি কিন্তু খুব চিন্তায় থাকবো তোমাকে নিয়ে!"

জেঠি কেঁদেছিল খুব, খুব জোরে।

বলেছিল "মামণিকে ক্ষমা করে দিস সোনামা !"

আমি কিন্তু দেখছিলাম, তিন বছরের একটা কালো মেয়ে পুজোর অষ্টমীতে লাল বেনারসী আর জড়োয়ার হার পরা জেঠির গলা জড়িয়ে কোলে বসে বলছে

"তুমি তো আমার মামণি, ঠিক এমন লাল শাড়ি আর হার দেবে গো আমাকে "

বড় হয়ে সবার মুখে হাজার বার শুনেছিলাম সে কথা।

সব ভাবতে ভাবতে

আমি হাত ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে চৌকাঠ ডিঙ্গিয়ে বাইরে বেরিয়ে বাগানের অনেক গাছের মাঝখান দিয়ে আলতা পায়ে চলে গেছিলাম টুকটুকে লাল বেনারসী পরে অভিমন্যুর সাথে... অনেক গুলো শেকড় নিঃশব্দে ছিঁড়তে ছিঁড়তে...

শত সহস্র হাজার হাজার মেয়েদের মতো... একটা ছায়া ছায়া মাটির সন্ধানে... বাকি জীবনটার জন্য !


"শোকসংবাদ" - সায়ন বণিক

Edit Posted by with No comments

 


শোকসংবাদ

সায়ন বণিক

 

ভোর থেকেই সেই একইরকমই ব্যস্ততা। ফিসফাস কথা, বিষণ্ণ চাহনি, পা টিপে টিপে চলাফেরা। এক তলায় সিড়ির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা ভাইবোন, দেবু আর দিয়াকে কান্নার কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। দিয়া তার দাদার গা ঘেঁষে সরে এসে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, দিয়ার মুখটা চেপে ধরে একটা হিস হিস করে উঠলো। তা সত্বেও দিয়া মুখটা ছাড়িয়ে বলে উঠলো, ঠিক মানুষের গলায় চেঁচাচ্ছে, নারে? আমার যেন কেমন কষ্ট হচ্ছে রে দাদা !

নিচের ঘরে তখন ওদের মা রূপালী, বাবা গিরীশ আর চাকর সুকুমার। ঘরে পাখা নেই তাই দোতলা থেকে স্ট্যান্ড ফ্যানটা আনা হয়েছে। সেই একটানা ভোমরা ডেকে যাচ্ছে। মেঝেয় সতরঞ্চিতে শুয়ে আছে একটা ল্যাব্রাডর কুকুর। পাখার হাওয়া তার ধূসর মেশানো সাদা লোমে কাঁপুনি তুলছে। গত তিন দিন ধরে প্রসবযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। "নেমো নেমো... লক্ষ্মীমেয়ে, সব ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তারবাবু তোমার কিচ্ছু ভয় নেই। সোনা আমার... আর একটু কষ্ট সহ্য করো তো মা।" নেমোর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে রূপালীর স্বর বেদনায় রুদ্ধ হয়ে এল।

"ইসস, পরশুদিনই ডাক্তারকে খবর দিলে ভালো হত।" গিরীশ আফশোস করল।

"ডাক্তারবাবুকে ফোন করেছিলে তুমি?"

"হ্যাঁ, করেছিলাম। বললেন যে পাঁচ দশ মিনিটের মধ্যে এসে পড়বেন।" মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে গিরীশ বলল।

সুকুমার চুপ করে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। গিরীশ তাকে বলল, "দেবু আর দিয়া যেন নিচে না নামে দেখিস। আর রান্নাবান্না আজ আর করে দরকার নেই। তুই বরং —" গিরীশ তাকাল রূপালীর দিকে।

"যা গরম পড়েছে, দই চিড়ে আর আম নিয়ে আসুক।" রূপালী বলল।

"আমিও তাই বলতে যাচ্ছিলুম। কাল ম্যাক্সিমাম ছিল, থার্টি নাইন পয়েন্ট ফোর, অসহ্যকর... রিচ রান্নাবান্না এখন থাক।"

"দেবু দিয়া, তোমরা কিন্তু এক তলায় একদম নামবে না, সিঁড়ি থেকে উঁকিঝুঁকিও নয়। যাও, ওপরে যাও। নেমোর বাচ্চা হওয়ার পর নামবে, তার আগে নয়।"

"বাবা, কখন হবে?" দেবু বলল।

"জানি না রে বাবা, ডাক্তারবাবুকে আনতে যাচ্ছি। দেখা যাক কী হয়!" উদ্বিগ্ন স্বরে গিরীশ বলল।

দোতলার বাথরুমের পাশে দিয়ে চলে গেলে পশ্চিমের বারান্দা। সেখানে দাঁড়ালে, কৃষ্ণচূড়া গাছের ডাল পাতার ফাঁক দিয়ে বাইক, সাইকেল এবং দু একটা স্কুল বাস যাতায়াত করতে দেখা যায়।

কিছু ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে দিয়া বলে উঠলো, "দাদা এবারও যদি গতবারের মতো তেমন বৃষ্টি হয়? মাছ ধরবি?"

দরজা ঠক্ ঠক্ করতে করতে সুকুমার বলে উঠলো, "বাবুরা, কি করছ এখানে মাথায় হাত দিয়ে বসে বসে?"

"আচ্ছা, এই করোনা ভাইরাসের জন্য তোমাদের স্কুল কতদিন বন্ধ থাকবে?"

জলের গ্লাস হতে নিয়ে দেবু বলল, "সরকার থেকে তো একত্রিশে মার্চ অবধি ছুটি ঘোষণা করেছিল। সেটাকে আরও বাড়িয়ে নিয়ে পনেরোই এপ্রিল পর্যন্ত করে দিয়েছে।"

নিচ থেকে রূপালীর ভেসে আসে দিয়ার কানে।

"সুকুমারদা, মা তোমাকে বোধহয় ডাকছে।"

—"সুকুমার, ওই সুকুমার।"

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সুকুমার বলে উঠল, "যাচ্ছি, বৌদিমণি।"

দু’জনে বারান্দার গ্রিল থেকে যতটা সম্ভব ঝুঁকে দেখল, সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেওয়া পাশের বাড়ির জগদীশবাবু রবারের নল দিয়ে তাঁর ছোট বাগানটিতে জল ছিটোচ্ছেন।

"নেমোর এবার ক টা বাচ্চা হবে বল তো দাদা?"

"আটটা।"

"এমনি, আন্দাজে, আগের বারও আটটা হয়েছিল না?"

"সব বিক্রি করে দিল। এবার বাবাকে বলবি একটা বাচ্চা রেখে দিতে।"

"তুই বলিস বাবাকে।"

"না।"

দেবু বোনের মুখের ভাব লক্ষ্য করে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলল, "এক একটা বাচ্চার দাম কত জানিস ? প্রায়, পনেরো কুড়ি হাজার টাকা।"

কিছুক্ষন পর, দিয়া খোশমেজাজে বলে উঠলো, "অ্যাই, একবার সিঁড়িতে গিয়ে দেখে আসবি?"

"বাচ্চা হল কি না?"

"হ্যাঁ।"

দিয়ার সঙ্গে দেবুও সিঁড়ি পর্যন্ত গেল। পা টিপে টিপে দিয়া সিঁড়ি দিয়ে নেমে ল্যান্ডিংটা ঘুরছে আর সঙ্গে সঙ্গে দাঁতচাপা গর্জন উঠল।

"বলেছি না একদম নামবে না। যাও, যাও। সুকুমার, দুটোকে ঘরে বন্ধ করে দিয়ে আয় তো।"

দিয়া দেবুর অনুযোগের দৃষ্টি রেখে বলল, "তোর জন্যই তো।"

দোতলায় এসে সুকুমার ওদের দুজনের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, "দাদা বৌদির এখন মাথার ঠিক নেই, বুঝেছ ? একদম শব্দটব্দ করবে না। করলে ডাক্তারবাবুর হাত নরে যাবে আর..."

"নেমো তাহলে মরে যাবে সুকুমারদা?"

দিয়া ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে। দেবু ঢোঁক গিলল।

"সুকুমার মাঝবয়সি, বারো বছর এ বাড়িতে কাজ করছে। দেবুর জন্ম হয় কাজ নেবার দু মাস পর। তার কোলে পিঠে করেই এরা বড়ো হয়েছে। দুজনের অবস্থা দেখে সুকুমার কষ্টবোধ করল।

"মরবে কেন। এমনিতেও, যা করোনা ভাইরাসের ছড়াছড়ি...। যাই হোক, দরজাটা ভেজানো থাক বেরিয়ো না কিন্তু।"

দরজা বন্ধ হওয়া মাত্র দিয়ার চোখ জলে ভরে এল।

দেবু উদভ্রান্তের মতো বলল, "তোর চোখে জল কেন? তুই কি কাঁদছিস ?"

দিয়ার কান্না আরও বেড়ে গেল। বিছানায় আছড়ে পরে সে বালিশে মুখ চেপে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।

বারান্দায় গিয়ে দেবু কৃষ্ণচূড়া গাছটার ফাঁক দিয়ে সে রাস্তার দিকে তাকাল। দু দিক থেকে দুটো বাইক এসে চলে গেল। গাছের ডালে বুলবুলি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করছে। শালিক আর কাকও সে লক্ষ্য করল কিন্তু কোন কিছুই তার মনের উপর বসছে না। ঘরে এসে, ঘামে সপসপে গেঞ্জিটা খুলে দেবু পা ছড়িয়ে বসল।

কিছুক্ষণ পর, দেবু বাথরুম থেকে আসার সময় হঠাৎই খেয়াল করল, জঞ্জাল এবং বালির স্তূপের উপর কয়েকটা প্রাণী কিলবিল করছে।

"দাদা, ওই দাদা?" চোখ মুঝতে মুঝতে জানালার ধারে এসে দাঁড়াল দিয়া।

"দেখ, বুনু দেখ – এক দুই, তিন... চার, পাঁচ... ছয়!"

"কোথা থেকে এল রে, এই কুকুরছানাগুলো ? কাল তো চোখে পড়েনি।"

কান লেজ আর পিঠের কিছু অংশ কালো, এমন একটা সাদা কুকুর ধীরে ধীরে ছানাগুলোর দিকে এগিয়ে এল। পেটটা ঝুলে রয়েছে। দেবু স্তনের বোঁটাগুলো দেখতে পাচ্ছে। কুকুরটাকে সে স্কুলে যাবার সময় রোজ দেখেছে। জুয়েল কেটারিং – এর দোকান থেকে সম্রাট সুইট্স পর্যন্ত পাঁচ ছটা বাড়ির সামনের রাস্তায় যে তিন চারটে কুকুর বসে থাকে, ঘুমোয় আর অন্য কুকুরদের সঙ্গে মারামারি করে, তাদের মধ্যে দেবু একেও দেখেছে। একে সে চেনে।

একদিন নেমোর ভিটামিন ট্যাবলেট ফুরিয়ে যাওয়ায় সুকুমার কিনতে যাচ্ছিল। দোকানে ওষুধ ছাড়াও অনেকরকম জিনিস বিক্রি হয়। আইসক্রিম, সফট ড্রিঙ্কস ইত্যাদি। মা র কাছ থেকে টাকা নিয়ে দেবু আর দিয়া সুকুমারের সঙ্গে যায়।

ওরা কাঠের চামচ দিয়ে খেতে খেতে বাড়ি ফিরছিল। পাশে পাশে হাঁটছিল একটা কুকুর। মজা করার জন্য দিয়া একটু আইসক্রিম চামচ থেকে উঁচু করে ফেলল। কুকুরটা তৈরি ছিল না, তাই রাস্তায় পড়ল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই চেটে নিল। এরপর আরও পাবার আশায় চলতে চলতে মুখ তুলে বার বার সে দিয়ার দিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু দিয়া আর ওকে খাওয়াতে রাজি নয়।

"দে না ওকে।" দেবু বলছিল।

"আহাহা, তুমি দাও না। এইটুকু তো কৌটো। একটা খেয়ে কি কিছু হয়?"

ঠিক এই সময়ই দেবু হোঁচট খেল, একটা ইঁটে আর পড়তে পড়তে নিজেকে সামলালেও আইস্ক্রিমের প্লাস্টিকের কৌটোটা হাত থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ল। সবাই দাঁড়িয়ে গেছে। কুকুরটাও। কিন্তু তাড়াতাড়ি চেটে খেতে নেবার বদলে সে দেবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। সেই সময় দেবু কুকুরটার চোখে কেমন একটা দুঃখ পাওয়ার মতো ভাব যেনো দেখতে পায়। তখন ছুটে এসে আর একটা কুকুর জিভ দিয়ে আইসক্রিমটা চেটে নিতে নিতেই গোঁ গোঁ শব্দ করে ভয় দেখাল। কেউ যেন, এমনকী অন্য কুকুরটাও যেন তার খাবারে ভাগ না বসায়।

সুকুমারের কাছে টাকা ছিল, সে দোকানে ফিরে গিয়ে আর এক কৌটো আইসক্রিম কিনে এনে দেবুর হতে দেয়। দিয়া তখন আকাশের দিকে মুখ তুলে বলেছিল, "দাদা তো কৌটোটা শেষ করেই ফেলেছিল, তাহলে আবার একটা নতুন কেনার কী দরকার।"

"মোটেই শেষ করে ফেলিনি। আদ্দেকেরও কম খেয়েছি। আচ্ছা তুই একটু নে।"

দিয়া আপত্তি করেনি। দেবু লক্ষ্য করল তখনও কুকুরটা তাদের সঙ্গ ছাড়েনি। দিয়া বলল, এবার তুই ওকে দে।

"দেবই তো।"

ঝুঁকে নিচু হতে দেবু কৌটোটাই ওর মুখের কাছে ধরল। মুখ সরিয়ে নিল কুকুরটা, অপ্রতিভ যতটা নয় তার থেকেও বেশি অবিশ্বাসভরে।

"খা খা, খেয়ে নে।"

এদিকে বাবা অফিস থেকে ফিরে এসে রূপালীর ঘরের দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলে যেতেই সে ঘরে ঢুকে রূপালীকে জড়িয়ে ধরল।

"একি, একি ! ঘরের মধ্যে নয়। ওরা চলে আসতে পারে !"

গিরীশ দরজার ছিটকিনি লাগাচ্ছিল এবং বিছানায় রূপালী হলুদ আঁচলটাকে সরিয়ে কমলা রঙের অর্গান্ডির ব্লাউজটা খুলে, সাদা ব্রেসিয়ারটা খুলতে শুরু করেছিল।

গিরীশ মুচকি হেসে রূপালীকে বিছানায় শোয়াতে শোয়াতে বলল, "নেমে তো আছেই ওর আওয়াজেই বোঝা যাবে।"

এরপরে সে কেমন একটা লাজুক লাজুক ভঙ্গিতে সে প্রথমে জিভ দিয়ে একটু চাটল, তারপর কৌটোয় জিভ ঢুকিয়ে কয়েক সেকেন্ডেই সাফ করে দিল।

এরপরও সে ওদের পিছন পিছন চলছিল। দেবু ধমক দেয়, "আর নয়, আবার এখানে থাম।" কুকুরটা আর এগোয়নি।

"ও দিদিভাই – দাদাভাই, তোমরা এখানে কী দেখছ, জানালার ধারে দঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?" সুকুমার খাবারের থালাগুলো হতে নিয়ে বলল।

"আরে সুকুমারদা, মনে আছে সেই সাদা কুকুরটার ? যে আমাদের পিছন পিছন আসছিল...।" দিয়া বিছানায় বসে বলল, "ছার না... এখন এসব কথা থাক।"

"তোমাদের খাবার দিয়ে গেলাম। ওপরে বসেই খেয়ে নিও। নেমোকে আর বাঁচানো গেল না।"

ভাইবোন কিছুক্ষণ পরস্পরের চোখের দিকে অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে জীবনের প্রথম শোকসংবাদটা থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখল।


Jun 10, 2021

"অ্যা নাইট ইন থর ডেসার্ট (৪ঠা অক্টোবর ২০১৪)" - তীর্থংকর দে

Edit Posted by with No comments

 


অ্যা নাইট ইন থর ডেসার্ট (৪ঠা অক্টোবর ২০১৪)

তীর্থংকর দে

 

পাধারো সা - স্বাগতম আপনাকে থর মরুভূমিতে আজকের রাত্রিযাপনে। গতকালই রাত ১০টা নাগাদ জয়সালমীর পৌঁছেছি। আজ সারাদিন সোনার কেল্লায় কাটিয়ে বিকেল ৪:৩০ মিনিটে আমরা থরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম।

জয়সালমীর শহর থেকে থর মরুভূমি প্রায় ৪৫ কিমি। শহর ছাড়িয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে আরব্য রজনীর পরিবেশে। এই পথেই উটের পিঠে মাল যেত সারা মধ্য প্রাচ্যে। প্রায় ২০ কিমি যেতেই পান্নালাল জি গাড়ি ঢুকিয়ে দিলেন ভাঙ্গাচোরা ইট আর মাটি দিয়ে তৈরি একটা রাস্তায়। গাড়ি টার্ন করার পর আমি কিছু বলার আগেই উনি বললেন সামনে কুলধ্রা গাঁও। এখানকার শাসকের কু নজরে পড়েছিল এই গ্রামেরই গ্রাম প্রধানের মেয়ে। স্বজাতির সেই মেয়ের সন্মান বাঁচাতে  সারা গ্রামের মানুষ একরাতে একসাথে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। তারপর থেকেই এই গ্রাম একাকী সেই ইতিহাস বুকে নিয়ে দিনাতিপাত করছে। ঘুরে দেখলাম পরিত্যক্ত গ্রাম কুলধ্রা।

আবার গাড়ি ছুটতে শুরু করলো। চারিদিকে ধু-ধু বালুরাশি। একদম জনমানবহীন। অনেক পরে রাস্তায় একটি মিলিটারি গাড়ি দেখলাম। এই রাস্তাটি ইন্ডিয়ান আর্মির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। কিছু দূর গিয়ে দেখলাম ফাকা মাঠে একটি জিপ গাড়ির সাথে দড়ি বেঁধে প্যারাস্যুট ডাইভিং ছচ্ছে। যদিও এক্ষেত্রে আমি সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারিনি।

আরো কিছুটা যাবার পর একটা পয়েন্টে দেখি অনেক জিপ গাড়ি দাড়িয়ে রয়েছে। পর্যটকদের গাড়ি দাড় করিয়ে করিয়ে ওরা ডাকছে ১০০০ টাকায় জিপ সাফারি, ডেসার্ট মে সানসেট মত মিস করে স্যার, আইয়ে আপলোগ। ওদের ডাকে সাড়া দিয়ে ৮০০ টাকায় সানসেট দেখতে গেলাম আমরা। ৬ কিমি মরুভূমির  ভেতর গিয়ে দেখলাম সূযাস্তের অবর্ননীয় ছবি। চোখের সামনে মরুভূমির রঙ পরিবর্তন হতে লাগল। ভীষণ সুন্দর দৃশ্য দেখে ফেরার পথে হোলো ভয়ানক অভিজ্ঞতা। সাফারি জিপ হোলো নষ্ট, এদিকে অন্ধকার নেমেছে। আমাদের ফোনে তো নেটওয়ার্ক নেইই, ড্রাইভারের ফোনও কানেক্ট হচ্ছে না। মা আর দিদি প্রায় কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। সাফারির ড্রাইভর কোনো ভাবেই আমাদের শান্ত করতে পারছে না। অন্ধকারে কোনোভাবেই রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে না, তবুও হেটে হেটে রওনা দিই একথা বাবাকে বললাম। বাবা রাজি নন। ১৫ মিনিটের মধ্যেই একটা জিপ চলে এলো, ওরা আমাদের খুঁজতেই এসেছে। পড়ে ভাবলাম মাত্র ১৫ মিনিটই আমাদের কাছে এতক্ষণ কয়েক ঘণ্টা মনে হচ্ছিলো। ভগবানের কৃপায় রক্ষা পেলাম।

সন্ধ্যা ৭টার কিছু পরে আমরা এলাম মরুভূমির মাঝে আমাদের ক্যাম্পিং স্টেশনে। গাড়ি দাড়াতেই ওরা যেভাবে আমাদের স্বাগত জানালো, প্রথমবার কোনো পর্যটন কেন্দ্রে এমন আতিথেয়তা পেলাম। বিরাট বড় ঢোল সহ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে, কপালে তিলক কেটে আমাদের নিয়ে আসা হোলো ক্যাম্পিং স্টেশনের ভেতরে। চারিদিকে টেন্ট আর মধ্যিখানে নাচ-গানার আসরের জন্য ফাঁকা জায়গা। আমাদের নির্দিষ্ট টেন্টে ওরা লাগেজ ঢুকিয়ে দিলো। আমরা বসলাম নাচগানের আসরের সামনের নির্দিষ্ট জায়গায়। বসতে বসতেই চলে এলো চিড়ের পোলাও, কচুরি, চা আর বিস্কুট। শুরু হোলো রাজস্থানি ফোক সং, সঙ্গে বিভিন্ন শারীরিক কসরত। তারপর শুরু হোলো ফোক ডান্স। আমরাও যোগ দিলাম সেই আসরে। এখানে বাবা যা ডান্স দেখালো, একেবারে ৫৭ বছরের যুবক। ঘন্টা দুয়েকের এই অনুষ্ঠানে রাজস্থানি লোকসংস্কৃতির একটা আন্দাজ পাওয়া গেলো। থর মরুভূমিতে কাটানো বিগত কয়েক ঘণ্টায় মনে হচ্ছিল ভারতের মধ্যেই এ যেন এক অন্য ভারত।

এরপর ডিনার হলো বিভিন্ন ভেজ রাজস্থানি পদের সমন্বয়ে। রাতে খাবার পর টেন্টের কর্মচারীদের সাথে গল্প করছিলাম, ওরা জানালো এখান থেকে মাত্র ১২০ কিমি দূরে তানোট মাতা মন্দির, লঙ্গেওয়ালা পোস্ট। স্থানীয় মানুষ এবং বি এস এফ রোজ মন্দিরে পূজার্চনা করে, তারা প্রবলভাবে বিশ্বাস করে ১৯৭১ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে তানোট মাতার অসীম কৃপায় ভারতের যুদ্ধে জয়লাভ ঘটেছিল। আরো অনেক গল্প করতে করতে রাত প্রায় ১২টা বেজে গেলো, ঘুমতে চলে এলাম টেন্টর ভেতর। রাত যতো বাড়তে লাগল ঠান্ডাও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো। ভোরের দিকে কম্বল টেনে নিয়েছিলাম। সকাল ৬টায় বেড়িয়ে পড়লাম ক্যামেল সাফারিতে। উটের পিঠে মরুভূমি ঘোরার অনন্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম।

ক্যামেল সাফারির পর সকাল ৮টায় ব্রেকফাস্ট করে থর মরুভূমিকে টাটা জানিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম এখান থেকে প্রায় ৫১০ কিমি দূরের মাউন্ট আবুর উদ্দেশ্যে।




ছবি- সৌজন্যে লেখক


Jun 6, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯৬

Edit Posted by with No comments