May 19, 2021

"হারানো সম্পর্ক" - অ্যস্ত্রিক্স

Edit Posted by with No comments

 


হারানো সম্পর্ক

অ্যস্ত্রিক্স

 

আজ থেকে ঠিক দুই মাস আগে আমার আর আমার স্ত্রীর ডিভোর্স এর জন্য কোর্টে হাজির হওয়ার তারিখ ছিল। কিন্তু এই লকডাউনের দৌলতে কোর্ট-কাছারি তো সবই বন্ধ, তাই আর হলো না। কবে যে সব ঠিক হবে আর কবেই যে এই ঘরবন্দি থাকার থেকে নিস্তার পাবো, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।

আমি একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবী, বাড়ি কলকাতাতেই তবে কাজের সূত্রে থাকতে হয় নয়ডাতে। আমি আর আমার বউ, বিবাহিত প্রায় আট বছর, আমাদের একটা মেয়েও আছে, তিন্নি, এবার জুলাইতে পাঁচ বছর পূর্ণ হবে তার। তিন্নি আর ওর মা কলকাতাতেই থাকে। আসলে তিন্নির মা, মানে আমার স্ত্রী ঋতিকা, একটা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। আমার আর ওর কিন্তু লাভ ম্যারেজ হয়েছিল, তবে সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসা বা ওই লাভটা যেন হারিয়ে গেছে কোথাও। কলেজেই পরিচয় আমাদের। আমি অন্তিম স্নাতকের ছাত্র আর ওর প্রথম বৎসর। সম্পর্কটা গড়ে ওঠে খুব কম সময়েই। বিয়েটা একটু দেরিতেই হয় আমাদের। এমনি কোনো রোমাঞ্চকর গল্প নেই এর পেছনে, ওই দু’জনের পড়াশোনা শেষ করে, চাকরিতে ঢুকে নিজেদের একটু স্থায়ী করে তারপর বিয়েটা করি। ওই ধরুন বিয়ের আগে পাঁচ বছরের সম্পর্ক। ওর বাড়িও কলকাতাতেই। আমি ওই দক্ষিণ দিকে থাকতাম আর ওর বাড়ি পশ্চিম দিকে। বিয়ের পর চার বছর আমরা একসাথেই থাকতাম, আমাদের কলকাতার বাড়িতেই। ও তখনও ওই স্কুলেই চাকরি করতো আর আমি অন্য একটা বেসরকারি কোম্পানিতেই ছিলাম। বিয়ের তিন বছর পর তিন্নি এলো। আমরা খুবই খুশি ছিলাম। আমার মা-বাবা, আমি, ঋতিকা আর আমাদের পরিবারের ছোটো সদস্য তিন্নি, এটাই আমাদের সংসার ছিলো। এক সাথে বেশ ভালোই কেটেছে চারটে বছর। তারপর একটা অফার পাই আমি ব্যাঙ্গালোর থেকে, ভালো মাইনে ছিল, তাই ঠিক করি যে এই কাজেই যোগ দেবো।

একটা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি। পড়াশোনাতে আগাগোড়া ভালো ছিলাম তাই একটা সংকল্প ছিলো, যে অনেক টাকা উপার্জন করবো। তাই একটু ভালো থাকার আর সবাই কে ভালো রাখার চেষ্টায় ঋতিকা আর এক বছরের তিন্নিকে বাবা-মার সাথে ছেড়ে চলে যাই ব্যাঙ্গালোর। ভেবেছিলাম ঠিক ঠাক ভাবে সব চললে, সবাই কে নিয়ে আসবো কলকাতা থেকে এখানেই। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো সবাইকে ছেড়ে একা একা থাকতে। আর প্রথম ছয় মাস কোনো ছুটিও দেয়নি যে বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসবো। কলকাতা থেকে কারো ব্যাঙ্গালোরে আমার সাথে দেখা করতে যাওয়াও সম্ভব হতো না কারণ ঋতিকার চাকরি ছিলো তারপর তিন্নিও ছোটো আর সাথে মা-বাবাকেও একা ফেলে আসা সম্ভব ছিল না। যাই হোক, ছয় মাস পর যাই আমি বাড়িতে, তখন সবাই খুব খুশি, প্রথমবার বাড়ির থেকে এতদূর এতদিন ধরে থেকে এলাম। দশ দিনের ছুটি কাটিয়ে আবার ফিরে যাই। এভাবেই বছর কেটে যায় আর মাঝে এক দু’বার এসেছিলাম বাড়ি। তারপর ব্যাঙ্গালোরে দেড় বছর চাকরিটা করার পর নয়ডাতে বর্তমান প্রতিষ্ঠানটাতে যোগ দেই। এক বছর পর বাড়িতে বলি সবাই মিলে আমার এখানে চলে আসতে, তবে বাবা আর ঋতিকা কেউ রাজি হয়নি, যদিও মা চেয়েছিল আসতে। তারপর তিন্নিও স্কুলে ভর্তি হয়। ব্যাস কাউকেই আনা হয়নি আমার ওখানে, মাঝে ঘুরতে এসেছে কয়েকবার ঠিকই। আমিও বাড়ি আসতাম মাঝে মাঝে তবে সময়ের সাথে সাথে যাওয়া আসাটাও কমে গেছে। যেখানে থাকি আর যেমন স্তরে আমার কাজ, সেই জাকজমকে নিজের জীবনটা সাজিয়ে নিয়েছিলাম। আর কাজের চাপও বাড়তে থাকে আস্তে আস্তে। ঋতিকার সাথে ফোনে কথা বলাটাও কমে গেছিলো। আগে দিনে দু-একবার ফোন তো হতই, সবার সাথে কথা বলার জন্য আর সময় পেলেই ঋতিকাকে ফোন করে কিছুক্ষণ কথা বলে নিতাম। এখন তো সেসব কিছুই কমে গেছে। হয়ত দু’দিনে একবার ফোন করতাম আর ওটাতেই সবার সাথে কথা আর মাঝে মাঝে তো সেটাও করা হয়ে ওঠে না। তবে হ্যাঁ তিন্নি ফোন করলে আমার কথা বলতেই হতো।

আস্তে আস্তে সময় পেরিয়ে যাচ্ছিলো আর আমি দূরে সরে আসছিলাম ঋতিকার থেকে। কেমন যেন একটা বিরক্তি এসে পরেছিল। এমন না যে আমি অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পরে ছিলাম তবে এই সম্পর্কটাও এখন বাঁধন মনে হচ্ছিলো। আর এক সাথেও তো থাকা সম্ভব হচ্ছিলো না। ও আমার কাছে এসে থাকতে রাজি না নিজের চাকরি ছেড়ে আর আমার কাছেও কোনো উপায় নেই কলকাতা তে স্থায়ী ভাবে থাকার। তাই ভাবলাম বিবাহটা ভেঙ্গে দেওয়াটাই উচিত হবে। তাই বললাম একদিন ফোনেই ওকে। জিজ্ঞেস করলো "কেন, হঠাৎ কি হলো যে এতো বড়ো পদক্ষেপ?" বুঝিয়ে বললাম সব কারণ। জিজ্ঞেস করলো "বাবা-মা আর তিন্নির কি হবে?" তখন এই প্রশ্নটার উত্তর ছিলো না আমার কাছে। আসলে অতদুর ভাবিনি তখনও তাই বললাম "সে নয় একটা কোনো উপায় করা যাবে।" তখন ও বললো "ঠিক আছে আগে সব ভেবে নাও তারপর জানিও, আমারও একটু সময় চাই ভাবতে।" আমার মন বদলানোর চেষ্টা ও করেনি ঠিকই তবে ওর গলার আওয়াজটা এবার একটু ভাঙ্গা ভাঙ্গা হলো, বুঝলাম হয়েতো চোখ দিয়ে ওর জল পড়ছে, মনটা খারাপ হয়েছে কিন্তু বুঝতে দিচ্ছে না আমায়।

তিন দিন ভেবে একটা নির্ণয় নিয়ে ফোনে কথা বললাম ঋতিকার সাথে। জানালাম ওকে যে ডিভোর্সের পর বাবা-মাকে আমি নিয়ে আসবো আমার কাছে নয়ডাতে আর রইলো তিন্নির কথা, সে নয় ওর সাথেই থাকবে আর বললাম যে ও চাইলে আমাদের কলকাতার বাড়িতেই থাকতে পারে, মাঝে মাঝে তিন্নি কে দেখতে আসবো কলকাতা তে। আসলে ওই বাড়িতে বিয়ে হয়ে এসেছিলো প্রথম, এতো বছর ওই বাড়িতেই কাটিয়েছে, একটা আলাদা মায়া তে জড়িয়ে পড়েছে তাই আর আলাদা করতে চাইলাম না। সব চুপ করে শুনে উত্তর দিলো "সবই তো শুনলাম, তোমার ইচ্ছে মতনই হোক সব শুধু আমার একটা অনুরোধ আছে, সেটা রাখা গেলে ভালো হতো।" আমি জিজ্ঞেস করলাম "বলো কি চাও? চেষ্টা করবো যথাসাধ্য।" ও বললো "বাড়িটা তুমি রেখে নিও, আমি ভাড়া বাড়ি নিয়ে খরচা চালিয়ে নেবো, শুধু বাবা-মা কে আমার সাথে থাকতে দাও।" আমি শুনে অবাক হলাম, জিজ্ঞেস করলাম "এটা আবার কি ধরনের আর্জি হলো? আমার বাবা-মা তোমার সাথে কেনই বা থাকবেন ?" তখন ও বললো "আজ আমাদের বিয়ে ভেঙ্গে দিচ্ছ তুমি, বুঝতে পারছি সেটাতে তোমার অধিকার হতেই পারে। তবে গত ১২-১৩ বছর ধরে আমার বাবা-মার সমান স্থানেই এই দু’জন মানুষকে রেখেছি আর আমার বাবা-মা চলে যাওয়ার পর, এই দুটি মানুষ কে জড়িয়ে আছি আমি। আমার কি এই মানুষগুলো, এই সম্পর্কগুলোর ওপরে কোনো অধিকার নেই?" শুনলাম ওর কথাগুলো, কিছুটা বোঝার চেষ্টাও করলাম তবে মা-বাবাকে ওর কাছে দিতে পারলাম না। তাই বলে দিলাম "না এটা সম্ভব না।" তখন ও বলে উঠলো "তবে এই ডিভোর্সটাও সম্ভব না।" আর ফোনটা রেখে দিলো। মা বাবা অথবা তিন্নি কেউই এই সবের বিষয়ে জানতো না। জানাইনি কারণ বাবা-মার শরীরটা ঠিক থাকে না, তাই অযথা চিন্তায় ফেলতে চাইনা আর তিন্নি তো ছোটো, বুঝবেই বা কি ! যাই হোক, আরো এক-দুইবার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম তবে ও আর মানলো না তাই নিজের আইনজীবীকে দিয়ে ওর কাছে কাগজ পাঠালাম ডিভোর্সের, সই করেনি তাই শেষমেষ কেসটা উঠলো কোর্টে। আর সেই সূত্রেই এলাম কলকাতা আর ব্যাস আটকে পরলাম এই লকডাউনে।

জানি এই লকডাউনটা জরুরি ছিলো খুবই, মানুষ-কে সুস্থ রাখতে, ভালো রাখতে। তবে আমার জন্য যেন এটা একটা বিরক্তিকর দন্ড ছিলো, বন্দী হয়ে গেছিলাম সেই মানুষটার সাথে যার থেকে আলাদা হওয়ার জন্যই আমার এখানে আসা। খুব বিরক্ত লাগতো, সারাদিন তাকে চোখের সামনে দেখতে, তবে তিন্নিকে সারাক্ষণ কাছে পেতাম তাই সহ্য হয়ে যেত এসব। আর বাড়িতে খুব একটা কাজও ছিলো না, সারাদিন ওই মোবাইল, ল্যাপটপ আর মেইল চেক, মাঝে মাঝে ছাঁদে গিয়ে ফুল গাছগুলোকে একটু জল দিতাম আর একটুআধটু বাড়ির কাজ করতাম ব্যাস। এভাবেই দিন কাটছিলো, হঠাৎ একদিন ঘুম ভাঙ্গলো একটা চিৎকারের আওয়াজ শুনে, দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি ঋতিকা পরে আছে সিড়ির শেষে। তারাহুরো করে গেলাম ওর কাছে, বুঝতে পারলাম ভালোই চোট পেয়েছে বাম পায়ে আর ডান হাতটাতে। হেঁটে যাওয়ার অবস্থায় ছিল না, তাই আমি কোলে করেই নিয়ে গেলাম ওকে ওর ঘরে। ডাক্তার ডাকলাম, আমার বন্ধুই ছিলো সে, আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক। এলো দিব্যেন্দু আধা ঘন্টার মধ্যেই। দেখেই বললো এক্সরে আর কিছু পরীক্ষা করাতে। নিয়ে গেলাম আমি আর দিব্যেন্দু মিলে ওকে। তিন্নি আর মা-বাবা বাড়িতেই ছিলো। সব করে ফিরতে ফিরতে তখন প্রায় দুপুর দেড়টা। রিপোর্ট এলো বিকেলে, যা ভেবেছিলো দিব্যেন্দু সেটাই হয়েছে। ডান হাতের হাড়টা ভেঙেছে আর বাম পায়ের হাঁটুতে চির ধরেছে। সব মিলিয়ে দাঁড়ালো যে দুই জায়গাতেই প্লাস্টার করতে হবে আর ঠিক হতে হতে মোট এক মাস সময় লাগবে। তার আগে কোনোরকম ভারী কাজ করা বারণ আর বিছানায় সজ্জাশায়ী থাকতে হবে কম করেও আড়াই সপ্তাহ। সব ওষুধ লিখে দিয়ে আর খাওয়ানোর পদ্ধতি বলে দিব্যেন্দু চলে গেলো। সেদিন দুপুরের রান্নাটা আমিই করেছিলাম। আর তো কেউ নেই করার। আর সেদিন থেকেই ঋতিকা যেসব কাজগুলো করতো সারাদিন, যত সব ওর দায়িত্ব ছিলো সবার প্রতি, সব এলো আমার ঘাড়ে আর সাথে ওর দেখাশোনাও করতে হল।

আগামীদিন থেকে সময়তালিকা পাল্টে গেলো আমার। সকালে উঠেই গেলাম ঋতিকার ঘরে। দেখলাম ও জেগে আছে আর মা বসেছিলো ওর পাশে। কথা বলে জানতে পারলাম, ভোর পাঁচটা থেকেই নাকি ও জেগে আছে। ওটাই আসলে ওর রোজকার ওঠার সময় আর ওর ওঠার পর, এই সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মাও উঠে পড়েন তবে আজ একটু তাড়াতাড়ি উঠেছেন। আর ওঠার কারণটা হলো ঋতিকা। সকালে জেগেই নাকি কাউকে না জানিয়ে বাথরুম যাওয়ার চেষ্টা করেছিল আর পড়ে গেছে মেঝেতে আর সেই আওয়াজেই মার ঘুম ভেঙ্গে গেছে আর মা ওকে বাথরুমে নিয়ে গেছে। এটা দেখে ঠিক করলাম আজ রাত থেকে ওর আর তিন্নির সাথেই ঘুমোবো নইলে মাকে অযথা বিরক্ত হতে হবে। যদিও মা একটুকুও বিরক্ত হয়নী, বরং চিন্তিত ছিল ওকে নিয়ে। তারপর কিছু ওষুধ দেওয়ার ছিলো ওকে, সেগুলো দিয়ে নিয়ে নিজে একটু ফ্রেশ হয়ে ঢুকলাম রান্নাঘরে, মাও এলো সাহায্য করতে, মানা করাতে বললো যে এটুকু সাহায্য উনি সব সময়ই করেন রান্না করতে। দু’জনে রান্নার কাজটা সেরে তিন্নিকে উঠোলাম আর ওকে ফ্রেশ করিয়ে সবাই মিলে সকালের খাওয়ারটা খেয়ে নিলাম। এরপর বাসন মাজা, কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা সবই এক এর পর এক করতে লাগলাম, আর মাকে বললাম ঋতিকাকে খেয়াল রাখতে নইলে মা কোনো কাজই পুরোপুরি করতে দিতো না আমাকে। সব কাজের মাঝে হঠাৎ নজর চলে যেত ওর দিকে আর দেখতাম ও তাকিয়ে আছে আমার দিকে, মন খারাপ নিয়ে, কারণ ও কোনোদিন আমাকে কিছু করতে দিতো না আর যেই আমার নজর ওর ওপর যেত, অন্যদিকে তাকানোর ভান করতো। এই ভাবেই সারাদিন কেটে গেলো। রাতে খাওয়ার পর ঘুমোতে যাই, তিন্নিকেও নিয়ে আসি আমাদেরই ঘরে, ওকে মাঝে শুইয়ে দু’পাশে শুলাম দু’জনে। আজ প্রায় দুই বছর পর এক বিছানায় আমরা। খুব ক্লান্ত ছিলাম তাই বিছানাতে মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে পড়ি। পরে সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি মাঝে তিন্নি নেই চলে গেছে ঠাম্মা আর ঠাকুরদার কাছে, বিছানায় ছিলাম শুধু আমি আর ও। উঠে পড়লাম দেরি না করে আর শুরু একই সেই সময়তালিকা হিসেবে কাজ করা। আজ রাত থেকে তিন্নি ঘুমাতো না আমাদের সাথে, শুধু আমি আর ওই শুতাম একসাথে। এই ভাবেই দিনগুলো পেরোতে থাকলো, একদিন, দুইদিন, তিনদিন করে এক সপ্তাহ। রোজ ভোরে ওঠা, সবার জন্য কাজ করা আর ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যাওয়া। খুব বিষণ্ণ লাগতো মাঝে মাঝে। আর বুঝলাম আস্তে আস্তে এই কিছুদিনেই আমার এই অবস্থা আর মানুষটা তো কতো বছর থেকে এই সব করছে আর সাথে নিজের চাকরিটাও সামলাচ্ছে। জানেন সেদিন থেকে একটা আলাদা শ্রদ্ধা জন্মালো ওর প্রতি। সেই যে আমাদের কলেজের অপরিপক্ক ভালোবাসাটা ছিলো, তারপর বিয়ে তারপর সেইভাবে সম্পর্কটাকে সময়টাই দিয়ে ওঠা হয়নি পূর্ণতা পাওয়ার, যদিও বেশিরভাগ দোষটা আমারই ছিল, সেই সময়টা মনে হলো যেন সম্পর্কটা এখন পূর্ণতা পাচ্ছিলো।

দিন পেরোতে থাকলো আর তার প্রতি ভালোবাসাটা যেন ফিরে ফিরে আসছিল আমার মনে। সেই দিনগুলো, সেই সময়গুলো ভেসে আসছিলো যখন ভালোবাসায় মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছিলাম দু’জনে। মনে মনে ঠিক করলাম ফিরবো না নয়েডাতে আর। ওই কাজটা ছেড়ে, কলকাতাতেই কোনো কাজ খুঁজে নেবো। সময় লাগবে একটু আর বেতনটাও হয়তো মনের মতন পাবো না, তাও যেটুকু ব্যাংকের খাতায় আছে সেটুকুতে চলে যাবে। আর এই লকডাউন এটাও শিখিয়েছে যে আমাদের রোজকার জীবিকাতে জরুরি জিনিসগুলোর আর্থিক মূল্য যথেষ্ট কম, অর্থ তো আমরা খরচ করি নিজেদের সদাম্ভিক জীবিকার সামগ্রীগুলোতে। এটা মনে ভেবে রাখলাম তবে ওকে বলার সাহসটা জোগাতে সময় লেগেছে অনেক। ভালোবাসা যখন ছিল না এই ভয়টাও ছিল না আর এখন ভয়টা এসেছে কারণ ভালোবাসাটা ফিরে পেয়েছি। ভয়টা ওর থেকে না, ওকে হারানোর ভয় এটা।

দেখতে দেখতে ঠিক হয়ে গেল ও। এখন যথেষ্টই ভালো, নিজের সব কাজ আবার সামলে নিচ্ছে, তবুও যেটুকু পারি হাতে হাতে ওকে সাহায্য করি, ও মানা করে তবে এই সাহায্যের ছলেই হোক, ওর কাছাকাছি থাকতে পারি আর ওর কিছুটা আরাম হয় তাই করি। এখনো এক সাথেই শুই। হঠাৎ একদিন শোয়ার সময় আর নিজের মনের কথা আটকাতে পারলাম না, ভেঙ্গে পরলাম, কেঁদে ফেললাম, আর আমার চোখে জল দেখে জড়িয়ে ধরলো ও আমাকে, জিজ্ঞেস করলো "কি হয়েছে ? কাঁদছো কেন এভাবে হঠাৎ?" আমি বললাম "আর পারছি না, তোমাকে ছেড়ে, তোমার পাশে থেকেও তোমার থেকে কতো দূরে সরে গেছি আমি নিজের ভুলে। পারছি না আর।" আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো "তোমার জীবন, তুমি যেভাবে চাও বাঁচতেই পারো, তুমি বিয়ে করেছ বলেই যে আমার সাথে সারাজীবন থাকতে হবে সেটাতো জরুরি না, তুমি আলাদা হতে চাও আলাদা হয়ে যেতেই পারো। সেটা তো দোষের কিছু না।" ওর কথাগুলো শুনে যেন আরো ভেঙ্গে পড়লাম, নিজেকে আরো ছোটো মনে হল এই মানুষটার কাছে। শেষে বললাম ওকে "আমি তোমাদের সাথে থাকবো, চাইনা আমার ডিভোর্স, চাইনা টাকা, শুধু তোমাদের নিয়ে থাকতে চাই। এখানেই একটা কাজ খুঁজে থেকে যাবো। একসাথে থাকবো, বলো রি তুমি থাকবে তো আমার সাথে ?" এটা শুনেই ও আমায় ছেড়ে একটু দূরে সরে বসলো। ওর চোখটাও ভেজা তবে মুখে কিছুই বললো না। জিজ্ঞেস করলাম আবার "বলো না রি তুমি থাকবে তো আমার সাথেই?" কিছুক্ষণ পর উত্তর দিলো "না। আমি থাকতে পারবো না তোমার সাথে।" আমি কারণটা জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলো "তুমি যা বলেছ, যেই নির্ণয় নিয়েছো এই সম্পর্কটা নিয়ে নিজের ব্যাপারে ভেবে আমি সেটাতেই রাজি ছিলাম। আর আজ আমি নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি আর আমি চাই না এই সম্পর্কটা রাখতে। আশা করি তুমিও জোর করবে না আমায়।" এই কথাটা শুনে আর কি বা বলতাম ওকে আমি। ঠিকই তো বলছে ও, আমার জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার অধিকার আমার থাকলে ওরও অধিকার আছে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার। যদিও জানি ও খুব অভিমান করে আছে আমার ওপর, এটাও হতে পারে যে ওর আত্মমর্যাদাতে অনেকখানি আঘাত লেগেছে আমার কথায় অথবা ওর আমার প্রতি ভালোবাসাটা আজ কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। কারণটা যেটাই হোক, অসম্মান করবো না ওর কথার আমি শুধু প্রার্থনা করছি ওর আমার সাথে থেকে যাওয়ার। আর যদি না থাকে তাহলে এই লকডাউনটা যতদিন আছে, নিজের এই সুবর্ণ মুহূর্তগুলো উপভোগ করে নেই। শেষে কি হবে এই সম্পর্কটার পরিণতি আমি জানি না তবে ঋতিকাকে আজীবন ভালোবেসে যাবো আর থাকবো ওর আশেপাশেই, নিজের সব দায়িত্বগুলো পালন করবো ওর প্রতি। ভালো রাখবো ওকে।


May 16, 2021

নেট ফড়িং সংখ্যা- ১৯৩ (ঈদ সংখ্যা)

Edit Posted by with No comments

May 15, 2021

লেখকের চোখে নেট ফড়িং

Edit Posted by with No comments

 


লেখকের চোখে নেট ফড়িং

লিখেছেন- দেবদর্শন চন্দ

 

স্বভাবতই পুরোনো স্মৃতি আমাদের প্রত্যেককেই নস্টালজিক করে তোলে। এই পত্রিকাটিও আমার কাছে তাই। প্রথমদিন থেকে বেশ কিছুটা পথ পত্রিকার সাথে জড়িয়ে থাকার সুযোগ হয়েছে আমার। সান্নিধ্য পেয়েছিলাম কোচবিহার সহ বিভিন্ন জায়গার একঝাঁক তরুণ তুর্কি এবং পাকা হাতের লেখকদেরও। একটা কথা না বললেই নয়। বহু ছোট-বড় বাধা অতিক্রম করে আজ চৌমাথায় দাঁড়িয়ে নেট ফড়িং। লেভেল ক্রসিং পেরোলেই আবার ছুটতে প্রস্তুত। তবে এতটা পথ একা চলা মোটেই সহজ নয়, কারোপক্ষেই। শুরুতেই কোনো পত্রিকার যাত্রাপথ এতটাও সহজ থাকে না। নেট ফড়িং-ও তার ব্যতিক্রম নয়। দিনের পর দিন যত্ন করে একটা ছোট শিশুকে বড়ো করে তোলেন অভিভাবকরাই। পত্রিকার কাছের মানুষগুলোর ভালোবাসা আগামীর যাত্রাপথে গোলাপসম। শুরুতে অনলাইন ম্যাগাজিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নেটফড়িং। এরপর অনলাইনের পাশাপাশি এসেছে মুদ্রণ সংখ্যাও। লিটল ম্যাগকে অন্যরূপে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে দিনরাত প্রয়াস চালাচ্ছেন সম্পাদকমন্ডলী। তাদের প্রতি রইলো কৃতজ্ঞতা। বর্তমানে পত্রিকার গঠনশৈলীতে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন। শুধু লেখক বা লেখিকারাই নয়। ছবি আঁকা হোক কিংবা ছবি তোলা, সকলের কাছেই নেট ফড়িং যেন 'হাত বাড়ালেই বন্ধু'। গ্রিক শব্দ নসটস(বাড়ী ফেরা) ও আলজিয়া (প্রত্যাশা) থেকেই নস্টালজিয়া শব্দের উৎপত্তি। নস্টালজিয়া বলতে সুখের স্মৃতি রোমন্থন, স্মৃতি মনে করে সেই পুরোনোতে ফিরে যেতে চাওয়া। কলম যত এগোচ্ছে ততই পুরোনো দিনগুলো অনেকটাই কাছের বলে মনে হচ্ছে। সবটা মিলিয়ে একটা ভালো লাগার অনুভূতি। পুরোনো বন্ধু, পুরোনো মানুষ, পত্রিকা এমনকি শুরুতে একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাগুলিও আজ মনে পড়ছে ভীষণভাবে। আজ ২০০ সংখ্যার দোরগোড়ায় নেট ফড়িং। কোচবিহার থেকে বাংলাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বের বহু মানুষের ভালোবাসায় আজ সমাদৃত পত্রিকাটি। সর্বোপরি, প্রত্যেকের কাছেই নেট ফড়িং উৎসাহের আশ্রয়। উঁচুতে পৌঁছবার শেষের আগের ধাপ। এভাবেই এগিয়ে যাক নেট ফড়িং। টিম নেট ফড়িং এর জন্যেও রইলো একরাশ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

 

May 9, 2021

"ভোজন রসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর" - অনাদি মুখার্জি

Edit Posted by with 2 comments

 


ভোজন রসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অনাদি মুখার্জি

 

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন খেতে ভালবাসতেন, তেমন খাওয়াতেও ভালো বাসতেন ! মাঝেমধ্যেই তার বৈঠকখানায়তে বিশেষ আলোচনা সভা বসতো, সেই সভাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন মধ‍্যমণি, অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা হতো ! অনেক সময় রাত দুটো বেজে যেত ! কিন্তু কবি তাদের জন্য এত রাতে মৃণালিনী দেবী-কে রান্না করতে বলতেন ! মৃণালিনী দেবী বিভিন্ন পদের রান্না করে খাওয়াতেন ! কবি দেশি খাবার বেশি পছন্দ করতেন, দুধ আমসত্ত্ব দিয়ে সন্দেশ খুব বেশি ভালোবাসতেন! ইলিশের ঝোল, চিতল মাছ দিয়ে মুগের ডাল, ভাত খেতেন !

১২ বছর বয়সে যখন প্রথমবার তার বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে বিদেশে যেতেন, ওখানে নানা জায়গা ঘুরে সব ভালো ভালো খাবার খেয়ে সেই সব খাবার গুলো ঠাকুর বাড়ির হেঁশেলে চালু করে দিতেন ! কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব চা পান করতে ভালোবাসতেন। তার প্রিয় ছিল গ্রীন ট্রি ! একটি বড়ো কাপে সারাদিনের অনেকবার চা খেতেন !

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারাদিনে বেশ কয়েকবার খেতেন ! প্রতিদিন সকালে উঠে এক গ্লাস নিমপাতা শরবত খেতেন, একটু বেলা হলে ভেজা বাদাম, মধু সহযোগে টোস্ট ও এককাপ দুধ খেতেন ! আবার মাঝে মাঝে সন্দেশ ও কলা দুধের মধ্যেই ফেলে মেখে খেতেন ! পরে আবার আম বা লেবুর শরবত খেতেন, দুপুরে সামান্য ভাত খেতেন কিন্তু বিভিন্ন রকমের তরকারি ও মাছ থাকতো, সেইসাথে পাতের শেষে টক দই, মিষ্টি খেতেন !

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঝে মধ্যে নিজেই রান্না করতে ভালোবাসতেন ! দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে তিনি সেখানকার মেনুকার্ড জোগাড় করে রাখতেন তার কাছে ! পরে সেই রকম রান্না করে খেতেন বা সবাইকে খাওয়াতেন ! আপেল দিয়ে রান্না খাসীর মাংস ও তুকী কাবাব, এই সব খাবার বিদেশে খেয়ে, সেসব রান্না শিখে তিনি তার বাড়িতে রান্না শুরু করে দিতেন এবং ঠাকুর বাড়ির সবাইকে তা খাওয়াতে ভালোবাসতেন ! দেশীয় খাবারে মধ্যে চিতল মাছ ও ভাপা ইলিশ তার ছিল খুব প্ৰিয়, রাতে লুচি আর ফুলকফি ও আলু দিয়ে সবজি বা কখনো পটল দিয়ে নানা পদের সবজি বানিয়ে খেতেন ! তার বাড়িতে কোনো সভা বসলে তিনি কাজুবাদাম ও কিসমিস মেশানো মালপোয়া সবাইকে খাইয়ে তবে ছাড়তেন ! এসব দেখে বোঝাই যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতোটা ভোজন রসিক ছিলেন !


"অভিসার" - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (নাট্যরুপ- বিক্রম শীল)

Edit Posted by with No comments

 


কবিতা- অভিসার

কবি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নাট্যরূপ- বিক্রম শীল

 

দৃশ্য- ০১

প্রেক্ষাপট- বোধিসত্তাবদান-কল্পলতা সন্ন্যাসী উপগুপ্ত একদিন মথুরাপুরীর প্রাচীরের নীচে ধ্যানমগ্ন ছিলেন, নগরের দীপ বাতাসে নিভে গেছে, পৌর ভবনের দুয়ারও বন্ধ, শ্রাবণের রাতের তারা ছিল মেঘে ঢাকা। হঠাৎ কারো নূপুর পায়ে হেঁটে আসার শব্দ শোনা গেল! সন্ন্যাসী চমকে জেগে উঠলেন, স্বপ্ন জড়িমা এক পলকে ভেঙ্গে গেল, আবছায়া দীপের আলোতে তার ক্ষমাসুন্দর চোখে তিনি দেখলেন নগরীর এক যৌবনমত্তা নটী তার নির্দিষ্ট অভিসারে হেঁটে চলছেন। তার অঙ্গে সুনীল বরণ এর আঁচ, রুনুঝুনু শব্দে তার শরীরের অলঙ্কারগুলো শব্দ করছে। সন্ন্যাসীর কাছে এসে পা থমকে গেল বাসবদত্তার।

প্রদীপ ধরে সন্ন্যাসীর নবীন গৌরকান্তি মুখের দিকে তাকালো সেই রমণী- সন্ন্যাসীর উজ্জ্বল মুখমণ্ডল, দু’চোখ থেকে যেন করুনার আলো ছড়িয়ে পড়ছে, সাদা কপালে যেন চাঁদের মতো স্নিগ্ধ শান্তি ছড়িয়ে পড়েছে।

চোখে লজ্জা জড়িয়ে নরম কণ্ঠে, রমণী বললেন- “আমায় ক্ষমা করুন কুমার কিশোর,

যদি দয়া কর আমার গৃহে চলেন। এই কঠিন ধরণীতলে থাকা খুব কষ্টকর, এখানে আপনি থাকতে পারবেন  না।’’

সন্ন্যাসী করুণ সুরে রমণীর দিকে তাকিয়ে বললেন- "এখনো আমার যাওয়ার সময় হয়নি, তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখানে যাও, যেদিন সময় আসবে আমি নিজেই তোমার কাছে যাবো।"

হঠাৎ সেখানে বজ্রপাত হল, ঝড়-ঝঞ্জা শুরু হল, রমণী ভয়ে কেপে উঠলেন, বাতাসে যেন প্রলয়শঙ্খ বেজে উঠলো। সারা আকাশ জুড়ে বজ্রপাতের মাধ্যমে কেউ যেন অট্টহাসি দিতে লাগলো।

 

দৃশ্য-২

প্রেক্ষাপট- বছর তখনও শেষ হয়নি, সেদিন ছিল চৈত্র মাসের এক সন্ধ্যা। বাতাস উতলা আকুল হয়ে উঠেছিল সেদিন। পথের ধারের গাছগুলোতে মুকুল এসেছে। রাজার বাগানে বকুল, পারুল, রজনীগন্ধা ফুল ফুটেছে। অনেক দূর থেকে বাঁশির মধুর সুর ভেসে আসছিল। আজ নগর একেবারে জনহীন, নগরের সবাই মধুবনে ফুল-উৎসবে যোগ দিতে গেছেন। শূন্য নগরের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ যেন নীরবে হাসছে। নির্জন পথে জ্যোৎস্না-আলোতে এক সন্ন্যাসী একাকি পথ চলছেন। মাথার ওপরে গাছের ডালে থাকা কোকিল কুহু কুহু রবে বারবার ডাকছে। এতদিন পরে আজ হয়তো সেই অভিসাররাত্রি এসেছে।

নগরের সীমানা পেরিয়ে সন্ন্যাসী বাইরের প্রাচীরপ্রান্তে এসে পৌঁছুলেন। এসে দাঁড়ালেন পরিখার পাড়ে, হঠাৎ আম্রবনের ছায়ায় গাছের নীচের আঁধারে কোন এক রমণীকে তিনি পড়ে থাকতে দেখলেন। কাছে গিয়ে দেখলেন নিদারুণ রোগে মারীগুটিকায় তার অঙ্গ ভরে গেছে। তার প্রায় সারা শরীর রোগে কালো হয়ে গেছে। সেকারণে নগরের প্রজারা তাকে পরিখার বাইরে ফেলে দিয়ে গেছে। তাকে বিষাক্ত ভেবে সবাই তার সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে।

সন্ন্যাসী নীচে বসে রমণীর আড়ষ্ট মাথা নিজের কোলে তুলে নিলেন। তার শুষ্ক গলায় জল ঢেলে দিলেন। মন্ত্র পড়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। রমণীর সারা দেহে চন্দন লেপে দিলেন।

সেদিন জোস্না রাতে গাছের মুকুল ঝরছে, কোকিলের কুহু কুহু ডাক শোনা যাচ্ছে।

রমণী বললো- “ওগো দয়াময় তুমি কে?”

সন্ন্যাসী বললেন- “আজ রাতেই সেই সময় এসেছে, আমি তোমার কাছে এসেছি বাসবদত্তা!”

 

(নাট্যরূপটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর চরণতলে একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য মাত্র, কবির লেখনীর নাট্যরূপ দেওয়ার ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, যেকোনো ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবেন এই নিবেদন রইলো- বিনীত লেখক)

নেট ফড়িং সংখ্যা - ১৯২

Edit Posted by with No comments

May 8, 2021

"এগারো বছর" - সায়ন বণিক

Edit Posted by with No comments

 


এগারো বছর

সায়ন বণিক

 

পড়ন্ত বিকেলের সূর্য অস্ত যাওয়ার পথে। অমল তখনও পড়েই চলেছে। ছাদের ওপরের টেবিলটাও প্রায় অন্ধকারে ঢেকে এসেছে, এমনিতে শীতকালের বেলা।

বইটা বন্ধ করে সে একহাত দিয়ে তার চোখের জলটা মুছল। রবি ঠাকুরের কাবুলিওয়ালা পড়েছে কিনা, জল মোছাটাই স্বাভাবিক।

নীচে গিয়ে জ্যাকেটটা গায়ে দিল। সন্ধে হয়ে এসেছে। প্রতিটা দিনই সে একটা করে গল্প পড়বে আর বাইরে বেরোবে। স্বভাব হয়ে এসেছিল।

অমলের বাবা ডি-গ্রুপের একটা অফিসে কাজ করে। তবুও কাউকে অভাব পেতে দেয়নি, আজ পর্যন্ত। মাসখানেক হল দোতলার ছাদটা দিয়েছে। অমলের বাবা আসলে খুব অভাব বড় হয়েছিল, তাই তার বউ-ছেলের প্রতি কোনো অভাব রাখে না।

"বাবা, আমি একটু ঘুরে আসি" বলেই হুড়মুড় করে তার সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। অমলের মা তাদের পাশের বাড়ির বান্ধবীর বাড়িতে গিয়েছিল গল্প করবার জন্য। তাই সে আজ বাবাকে বলেই বেরোল।

অমলের বয়স সতেরো। দু’মাস আগেই তার জন্মদিন ছিল। বেশ ভালোভাবেই খাইয়েছে তাদের বন্ধুদের। ইলিভেনে উঠেছে, নতুন নতুন সাবজেক্ট নিয়েছে। পাঠ্য বই তেমনভাবে না পড়লেও, গল্পের বইয়ের প্রতি খুব আগ্রহ তার সে বাংলা হোক, কিংবা ইংরেজী। আর তার বই পড়বার সময় যদি কেউ বিরক্ত করে, তাহলে খুব রেগে যায় সে।

মাঝেমধ্যে তো অমল নিজেও ভাবে যে, সে কি করল এই সতেরোটা বছর, তার জীবনে। তার বেশিরভাগ বন্ধুরাই পড়াশোনায় যেমন ভালো, তেমনি তাদের গার্লফ্রেন্ডরাও। যখন সবাই একসাথে বসে গল্প করে, তখন অমলের নিজেকেই একা একা মনে হয়।

"কীরে, আজ এত দেরি করলি যে" সুজয় বলল।

"না এমনি, একটা গল্প পড়ছিলাম তো তাই" অমল বলল।

সুজয় খুবই কাছের বন্ধু অমলের। তার পাশে সুখে-দুঃখে সবসময়ই থাকে বলতে গেলে। সে ভাবে, গার্লফ্রেন্ড ছেড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সুজয় আমার সাথে কখনই বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। এতটুকু ভেবেই সে শান্তিতে থাকে। আসলে প্রতিটা মানুষেরই এমন কোনো একজনকে দরকার যাকে সে সব খুলে বলতে পারে এবং সে শোনে। তাদের বন্ধুদের মধ্যে অমলই একজন ছেলে যে সব কথা খুলে বলতে ভালোবাসে এবং হাসিখুশি থাকতে ভালোবাসে। আর তার কথা শোনবার জন্যে আছেই তো সুজয়। সে অমলের সব কথা শোনে এবং বুঝিয়েও বলে। কিন্তু সুজয় যেন একটি আলাদা ধরণের। তার গার্লফ্রেন্ড রিয়া সবসময়ই তার কাছে একদম যেন বেঁধে রেখে দেয়। তাদের মধ্যেকার একটা কথাও সে নিজে বলে না, সুজয়কে দিয়ে বলায়। এই নিয়ে তাদের বন্ধুদের মধ্যে এক-একসময় যা হাসাহাসি হয়।

"একটা সিগারেট দে না" জয়কে অমল বলল। তিন-চার মাস ধরে অমল নতুন সিগারেট খাওয়া শুরু করেছে।

"আচ্ছা অমল, একটা কথা বলি খারাপ পাস না। তোর কি আর মনে পড়ে না ওর কথা?" রিয়া বলল। "যতদিন থেকে এই সিগারেটটা ধরেছিস, ততদিন থেকে কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকিস। আগের মতন সেই আড্ডাটাও জমে না আর আমাদের। যে এত হাসি-ঠাট্টা করত সবসময়। আর আজ..." বলতে বলতে থেমে গেল রিয়া।

জয়ের গার্লফ্রেন্ড প্রিয়াঙ্কাও বলল, "সেটাই"

বছর দুয়েক আগে...

"ও যে, মানে না মানা..." গান করতে করতে তাদের বাড়ির বাগানের মাটি খুঁড়ছিল চারু, চারুলতা বসু। বাবা-মায়ের একমাত্র আদুরে সন্তান। ভালোবেসে 'চারু' বলেই ডাকে সবাই। খোলা চুল, সূর্যের আলো তার মুখের উপর পড়ে যেন জ্বলজ্বল করছে। রাস্তার ঠিক পাশেই তাদের বাড়ি, শখের জন্যে সামনেটা বাগান করেছে। তাতেই, গুনগুন করে গান করতে করতে ধবধবে সাদা দাঁতগুলো বেরিয়ে এল। চারু তার মাটিওয়ালা হাত নিয়ে ঘাম মুছে দাঁড়াল এবং মাথা হেলিয়ে চুলগুলো পিছনে দিয়ে ঘুরল সে।

আশ্বিন মাস। না ঠাণ্ডা, না গরম। পুজোর জন্য প্যান্ডেল বানানো শুরু হয়েছে। অমল সাইকেলের দোকান থেকে ব্রেক-শু টা টাইট করে বাড়ি ফিরছে।

"মা, এবারের পুজোটাতে কিন্তু দারুণ আনন্দ করব। পাড়ার ক্লাবের পঞ্চাশ বছর বলে কথা। আর তাছাড়াও সমস্ত প্ল্যান হয়ে গেছে আমাদের।" সাইকেলটা রাখতে রাখতে তার মাকে বলল।

ষষ্ঠী ! সকাল সাতটায় অমল ঘুম থেকে উঠে গেছে। পুজোর চারটা দিন, সে বইয়ের দিকে হাতটাও দেয় না।

"ঢাকে তাহলে কাঠি পড়ল শেষপর্যন্ত" প্যান্ট পরতে পরতে অমল তার মাকে বলল।

দু-একটা বাড়ি পেরিয়েই সুজয়ের বাড়ি। তাকে সে ডেকে নিয়ে মণ্ডপে গেল। ষষ্ঠীর সকাল, তেমনভাবে কেউ একটা আসছে না। তাও পঞ্চাশ বছর বলে দু-একজন করে আসা শুরু হয়ে গেছে।

অমলের বন্ধুদের দল একদিকে মণ্ডপের গেটের পাশে বসেছে। আরেকদিকে মেয়েদের দল। প্রিয়াঙ্কা, রিয়াও সেখানে ছিল।

দেখতে দেখতেই ভিড় উপচে পড়া শুরু হয়ে গেল। কিন্তু অমলের চোখ ভিড় এড়িয়ে শুধু একটি মেয়ের দিকেই যাচ্ছিল। তার হাসি, টানা চোখ বান্ধবীদের সাথে হাসি-মজা করতে করতে খোলা চুলগুলিও দুলছিল। অমল কারও সাথে কিছু না বলে চেয়ারে বসে তাকেই শুধু হাঁ করে দেখছিল।

"কীরে, এত অন্যমনস্ক হয়ে আছিস যে" তার চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে সুজয় বলল। "চল কিছু খেয়ে আসি।"

মণ্ডপের লাইন দিয়ে বেশ কিছু খাবারের দোকান বসেছে। দুটো ফুচকার দোকানের পরে অমল আর সুজয় ভেলপুরির দোকানটাতে গেল এবং দুজনে দুটো ভেলপুড়ির বাটি হাতে নিয়ে খাওয়া শুরু করল।

"এই এই দেখ, ও আসছে।" অমল চিবোতে চিবোতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল। সুজয়ও যথারীতি দেখল।

মেয়েটি এসে ভেলপুরির দোকানটাতে দাঁড়াল, যেখানে তারা খাচ্ছিল। সে এক প্লেট ভেলপুরি তার জন্যে দিতে বলল।

"হাই, আমি অমল" সুজয়ের রুমালটা দিয়ে মুছে অমল বলল।

"হাই। মাইসেলফ্ চারু, চারুলতা বসু।" কিন্তু, তোমায় তো ঠিক চিনলাম না..." ভ্রু কুঁচকে হেসে বলল।

"আমি আসলে মণ্ডপে তোমায় বান্ধবীদের সাথে দেখলাম, তাই আর কি" অমল লজ্জার সঙ্গে হেসে চারুলতাকে বলল।

"তুমি কি এখানেই থাকো?" অমলকে জিজ্ঞাসা করল।

"হ্যাঁ হ্যাঁ, এইতো তিনটে বাড়ির পরেই।" আঙুল দিয়ে তাদের টিনের বাড়িটার দিকে দেখাল।

ভালই গল্প-গুজব করছিল অমল আর চারু। ষষ্ঠীর দুপুরটা এভাবেই চলে গেল অমলের, চারুর সাথে গল্প করে। চারুর বাড়িতে যেতে হবে তার মা দু’টোর মধ্যে ফিরতে বলেছিল।

"চলো চারু, এগিয়ে দিয়ে তোমায়" অমল বলল।

"চলো।"

সামনের মোড়ের বাড়িটাই চারুলতাদের। তাকে এগিয়ে দিয়ে সে বলল, "আজ রাত্রে ফাঁকা আছো ? ঘুরবে আমাদের সাথে ?" অমল বেশ উৎসুক ভাবে তাকে জিজ্ঞাসা করল।

"না অমল, রাতে বেরোতে দেবে না বাবা-মা" চারু বলল। "কাল দুপুরে যদি ফাঁকা থাকো, তাহলে ঘুরতে যেতে পারি।"

"হ্যাঁ হ্যাঁ, ফাঁকাই আছি।" অমল উত্তেজিত হয়ে বলল।

"ঠিক আছে তাহলে, বাই।" চারু পিছন ফিরে গেট খুলতে খুলতে বলল।

সেই রাতে তারা সবাই বন্ধু-বান্ধবী মিলেই পূজো দেখতে গেল।

সপ্তমীর সকাল ! মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। শার্টের কলারে মেসোর দেওয়া ইউরোপিয়ান পারফিউমটা লাগিয়ে ঘর থেকে বেরোল অমল।

"এই, চল আজকে আমরা সবাই দিনের বেলায় একটু ঘুরে আসি। চারুলতাও আসবে বলেছে।" জয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল।

হলুদ রঙের কুর্তিটা পরে অমলদের পাশে এসে চারু বলল, "চলো যাই।"

জয়, প্রিয়াঙ্কা হাত ধরে হেঁটে চলেছে। সুজয় তার গার্লফ্রেন্ড রিয়ার কখনও কাধেঁ হাত দেয়, আবার হাত ধরে হাঁটতে থাকে। ওরা চারজন সামনে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যেতে থাকে, চারু আর অমল পেছন পেছন আসতে থাকে।

"তুমি ভবিষ্যতে কী হতে চাও?" কোনো কথা না পেয়ে, অমল চারুকে জিজ্ঞেস করল।

"ইচ্ছে তো আছে ডাক্তারি পড়বার। দেখা যাক পরে কি হয়" হেসে চারু বলল।

অমল ভাবল যে, সে নিজেই তো এত কাঁচা পড়াশোনায়। আর চারু ডাক্তার...। কি করে বলব তোমায় চারু, আমি যে তোমার প্রেমে পড়ে গেছি। তোমাকে প্রথম দেখতেই যে আমার খুব ভালো লেগে গেছে। আর এখন যদি তুমি ডাক্তার হয়ে যাও, তাহলে যে আমি তোমার কাছে কিছুই না, নগণ্য। এই ভেবে মুখটা বিষন্নতায় ভরে উঠল অমলের।

আচমকাই অমলের হাতটা ধরে উঠল চারু। তার মনে যে অল্প হলেও জায়গা রয়েছে, সেটা বুঝতে দেরি হল না অমলের।

"সবাই কত সুন্দর হাত ধরে হাঁটছে, আমরাও না ধরে হাঁটলে কেমন লাগছে। তাই তোমার হাতটা ধরলাম।" চারুলতারও বুঝতে দেরি হল না যে সে তাকে পছন্দ করে না।

"বিরিয়ানি খাবে তোমরা ? আমি ট্রিট দেবো।" রিয়া বলল।

রেস্টুরেন্টে ঢুকে সবাই যে যার চেয়ারে বসল। একটা টেবিলে চারটে জায়গা। তাই অমল আর চারু অপর টেবিলে বসল।

"এই, তোমার বান্ধবীকে বলো যে, আমি বিরিয়ানি খাবো না। আমি চিকেন কাটলেট নিয়ে নিচ্ছি।" চারু বলল।

তারা পরস্পর কি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলবে, এটা ভাবতে ভাবতেই তাদের খাবারগুলো দিয়ে গেল। চাকু দিয়ে কাটলেটটা কেটে বলল, "হাঁ করে তাকিয়ে আছো কি, এই-ই নাও" অর্ধেক টুকরোটা অমলের মুখে খাইয়ে দিয়ে চোখের দিকে তাকাল।

"নাও না, তুমিও নাও।" বিরিয়ানির প্লেটটা চারুর দিকে এগিয়ে বলল।

"আমি যে তোমায় খাইয়ে দিলাম তখন তো খেয়ে নিলে। আর এখন প্লেট এগিয়ে দিচ্ছ, খাব না।" চারু মুখ ঘুরিয়ে বলল।

অমল তার পাতলা চুলগুলো সরিয়ে গালটা ধরে বলল, "নাও, খাইয়ে দিচ্ছি।" অমল চামচে করে তাকে খাইয়ে দিল।

আনন্দর মধ্যে দিয়ে সপ্তমীর দিনটি কেটে গেল। রাতে শুয়ে এ কথাই ভেবে চলছিল চারু। অমলের চুলগুলো সরিয়ে তার গাল ধরে তাকে খাইয়ে দেওয়া। এসব ভেবেই সে গায়ে দেওয়ার চাদরটাকে টেনে নিচ্ছিল।

অষ্টমী ! যুবক-যুবতীদের যেন আজ আলাদাই দেখতে লাগে। ছেলেদের গায়ে পাঞ্জাবী আর মেয়েদের শাড়ি।

সরস্বতী পুজোর জন্য কেনা পাঞ্জাবীটা অষ্টমীতে পড়ে বেরোল অমল। মণ্ডপে ঢুকেই সে দেখতে পেল চারু তার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সে ভেবেছিল আজ সবার প্রথমে সবার প্রথমে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে, কিন্তু তার ভাবনা ভুল হল।

অমল আর চারু দু’জনকেই খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। চারু লাল রঙের শাড়ি পরে এসেছিল এবং কোমর বন্ধনীর জন্য তাকে আরো অপরূপা দেখাচ্ছিল।

চারু অমলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল এবং অমল দু-এক পা করে পিছোতে পিছোতে একটা জায়গায় গিয়ে ঠেঁকল। চারু অমলের একটা হাত ধরে চুম্বন করা শুরু করল।

ফাঁকা মণ্ডপে বাইরে থেকে কেউ আসার শব্দ শোনা গেল।

চারু অমলের ঠোঁটের ওপর থেকে তার নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে বলল, "আই লাভ ইউ"

ঢাক বাজা শুরু হল। অষ্টমীর অঞ্জলী দেওয়ার জন্য ভক্তরা ঠাকুরের সামনে হাত জোর করে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোহিতমশাই মন্ত্র বলছে। অমল আর চারুও হাত জোর করে দাঁড়িয়ে ছিল।

সকালটা উপোস করে ছিল তারা। অমল আর চারু দুজনে মিলে রেস্টুরেন্টে গেল। বড় রেস্টুরেন্টে গিয়েছে। টেবিলগুলোর উপর ফুলদানি রাখা।

তারা বসল এবং অমল চারুর কাঁধে হাত রেখে গালদুটো ধরে বলল, "আই লাভ ইউ টু" পিছনের গ্লাসে রাখা গোলাপটা নিয়ে চারুকে দিল।

নবমী, দশমীটা অমল আর চারুর ভালোবাসার মধ্যে দিয়েই সেবারের পুজোটা চলে গেল।

এরপর থেকে তারা রোজ দেখা করতে না পারলেও মাঝে-মাঝেই দেখা করত।

ওরা একে-অপরকে আরও ভালোবাসতে শুরু করল। কোনো উৎসব-অনুষ্ঠান হলেই তারা সারাটা দিন একসাথে থাকত। অমল যখন ক্লাস নাইনে পড়ত, তখন থেকেই সে চারুকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল, এভাবে ক্লাস টেনটাও চলে গেল।

দশমীর দিন ! অমল আর চারু দু’জনেই ইলিভেনে পড়ে।

চারুও এখন বুঝতে শিখে গেছে। সে নিজে এখন ভাবতে থাকে যে, সে যদি বড় ডাক্তার হতে চায়, তাহলে এসব প্রেম-ট্রেম করলে চলবে না। তার নিজের লক্ষ্যের দিকে তাকাতে হবে আগে।

এ কারণেই অমলের সঙ্গে খুব কথা-কাটাকাটি, ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক এসব দু’মাস ধরে লেগেই থাকত। তাই কোনো কারণ ছাড়াই সেদিন বিসর্জন ঘাটে গিয়ে চারু অমলকে বলল, "আমি তোমার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্কে থাকতে পারব না।"

এই বলে সে ওখান থেকে পেছনে ঘুরে গিয়ে চোখের এক কোণায় জল নিয়ে চলে আসল।

তারপর থেকে দেখা হলেও, অমলকে দেখেও না দেখার ভান করে চলত চারুলতা। কিছুবার কথা বলার চেষ্টা করলেও সেটাকে চারুলতা পাত্তা না দিয়ে চলত...

—সুজয় বলল "আর এই জন্যে বিশ্বাস করবি না ভাই, আমি যে কত ডিপ্রেসড হয়েছিলাম, সেটা একমাত্র সুজয়ই জানে।" জয়ের দিকে তাকিয়ে অমল সিগারেটটা ফেলে পা চাপা দিয়ে বলল।

"তার জন্যেই কি তুই আজকাল এত সিগারেট খাচ্ছিস রোজ?" প্রিয়াঙ্কা কৌতুহলীভাবে জিজ্ঞেস করল।

"কি হবে, এতগুলো সিগারেট খেয়ে ? কমিয়ে দে তোর এসব খাওয়া, ফালতু..." কথাটা বলে আটকে গেল রিয়া।

মানসিক অবসাদ আর অমলের জমিয়ে রাখা জেদ নিয়ে আজ সে একজন সাংবাদিক। সাংবাদিকের পাশেও সে একজন লেখক। চারুলতার ছেড়ে যাওয়ার পর সে যেমনভাবে আঘাত পেয়েছিল, তেমনি তার মধ্যে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখা গিয়ে তাকে লেখক হয়ে তুলতেও সাহায্য করেছিল।

তার জীবনের প্রথম লেখাগুলো দুঃখ-কষ্টে ভরা সব কবিতা। সাপ্তাহিক পত্রিকায় ছাপা সব কবিতা ছিল অমলের জীবনে প্রথম লেখা প্রকাশিত হওয়া। এরপরে ছোট গল্পের দশ-বারোটা বইও তার ছাপা হয়েছে।

আজ থেকে এগারো বছর আগের চারুলতার মুখটা যেন আজও ভাসিয়ে তোলে তার সাদা কাগজের লেখার পাতায়। তাকে নিয়ে বেশ কিছু গল্প-কবিতা পাঠকদের জন্যও লিখেছে অমল। কিন্তু, এখনও সে জানে না চারু তার লেখা আদৌ পড়ে কিনা !

অমল যেই ছোট্ট শহরটিতে থাকত, সেখানে এখন সে আর থাকে না। কাজের সুত্রে, ব্যস্ত শহরেই থাকতে হয়েছে তাকে। এখানে এসে ফ্ল্যাট কিনেছে। বাবা-মাকেও ইতিমধ্যে নিয়ে আসার কথা চিন্তা করেছে। যদিও তার একাকীত্বের সঙ্গী খাতা আর পেন।

একদিন, অফিসে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ তার চোখে পড়ল চারুলতা বসু রায় নামে একটি আর্টিকেল বেরিয়েছে। সে ভালোভাবে পড়তেই দেখলো যে তার পাশের ছোট্ট গ্রামটির ঊনত্রিশ বছরের এক মহিলা ডাক্তারের ধর্ষণ হয়েছে। তার এক বছরের বিয়ে হওয়া স্বামীও তাকে ছেড়ে গিয়েছে। কারও সাথে কথা বলতে পারছে না সে। এমনকি, দরজার বাইরে মুখটা দেখাতেও লজ্জা বোধ করে। যত দিন যাচ্ছে সে একটু একটু করে পাগল হয়ে যাচ্ছে।

"চারুলতা বসু রায়ের ডিটেলসটা আমাকে এক্ষুনি এনে টেবিলটাতে দিয়ে যাস" জয়কে বলল। জয়

আর অমল একই অফিসে চাকরি করে, দেড় বছর হল নতুন জয়েন করেছে।

জয়ের কাছ থেকে ডিটেলস নিয়ে অমল পরের দিনই রওনা হল।

বাস থেকে নেমে পা রাখতেই গ্রামের প্রতিটা মানুষের মুখে বিষণ্নতার ছাপ দেখতে পেল অমল। গ্রামের একজন মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, "দিদি, চারুলতা বসু রায়ের চেম্বারটা কোন দিকটায়?" মহিলা মুখ বন্ধ করেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

ট্রলি টানতে টানতে চারুলতা বসু রায়ের চেম্বারের সামনে গিয়ে, বাড়ির ভেতরের দরজাটা খুলল।

উশকোখুশকো চুল নিয়ে পা গুটিয়ে বসে ছিল তেরো বছরের পুরোনো সেই চারুলতা। তার নামের পেছনে 'রায়' থাকলেও, 'চারু' নামটি যেন আজও জ্বলজ্বল করছে তার মনে। অনেকটা বড় দেখাচ্ছিল চারুকে। সমান সিঁথি থাকলেও, তার স্বামী ছেড়ে দিয়েছে কিনা ! এজন্যও চারুর অবসাদ হওয়ার অন্য এক কারণ।

দরজা খোলায় বাইরের আলোতে স্পষ্ট চিনতে পেরেছে চারু, যে এই সেই অমল যাকে সে এগারো বছর আগে তার জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছিল।

জোরে দৌড়ে এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চারু অমলকে বলল, "আমায় ক্ষমা করে দিও অমল। আমি তো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি যে তুমি এই অবস্থাতেও আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। আমি তোমাকে ভুল ভেবেছিলাম অমল। পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও"

ট্রলি থেকে হাতটা নামিয়ে চারুর কাঁধটা ধরে, "খোঁখী, তোমী সসুরবারি যাবিস্?" অমল মুচকি হেসে বলল।

চোখে জল নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে "হ্যাঁ" বলল।

"অতীত দেখেই যদি জীবনটা চালাতে হত, তাহলে আর আমরা কখনই এগোতে পারতাম না। তোমাকে নিয়েই আজ থেকে সারাটা জীবন থাকব, কথা দিলাম।

মনে আছে চারু, কাল ষষ্ঠী?" পা উঁচু করে অমলের ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রেখে পুরোনো অনুভব করতে লাগল চারু।

অন্ধকার চেম্বারের ভিতর দু’জনের নিঃসঙ্গতায় আনন্দ উপভোগ করছিল অমল আর চারু। তাদের এগারো বছর পর দেখা হয়ে যেন অন্য আরেক পৃথিবীতে চলে গিয়েছিল তারা। পরস্পরের মধ্যে কেউই ঠোঁট ছাড়ছিল না। তাদের এতগুলো বছর না দেখা হওয়ায় পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসার টানটা শক্ত হয়ে উঠেছিল। অমল চারুর পেটের থেকে নিজের হাতটা সরালো এবং জিজ্ঞেস করলো, "আমায় বিয়ে করবে চারু?"

কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল চারু। তারপর বলল, "তুমি তো আমায় বলেছিলেই যে, আমি শশুরবাড়ি যাচ্ছি কিনা। আমি তো তখন হ্যাঁ বলেছিলাম। তাহলে আবার..." নিজের হাতের আঙুল ধরে বলল।

"সবারই একটা মত থাকা জরুরী চারু। আমি যে তোমায় এখন থেকে আমার কাছে বন্দী করে রাখব সেরকমটা নয়। তোমাকে আমি তোমার স্বাধীনতাতেই বাঁচতে দিব, তুমি যা ইচ্ছে করতে পারো কোন আমার অসুবিধে থাকবে না। কিন্তু, আমরা যদি বিয়েটা না করি তাহলে হয়তো সমাজের চোখে অপমানিত হয়ে থাকবো। তাই তোমায় জিজ্ঞেস করলাম চারু।" অমল মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।

চারুলতা সমস্ত রকম জিনিস-পত্র গোছাল। অমলও সাহায্য করল। কিছুক্ষণ বাদে, জিনিসপত্রের ব্যাগ নিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটু বাড়িটাকে দেখে নিয়ে দরজা আটকে দিল। এরপরে তারা সেই গ্রাম ছেড়ে চলে আসল।

দু’মাস পর আজ বাইরেটা দেখতে পেয়ে, চোখের সামনে হাত নিয়ে ভ্রু কুঁচকালো। কিছুক্ষণ পিট পিট করে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে পরিষ্কার দেখতে লাগলো চারু।

গ্রামের আশেপাশের লোকজনেরা যেভাবে সম্মান করতো ডাক্তার চারুলতাকে, সেই সম্মান আজ আর দেখতে পেল না চারুলতা। যেসব মানুষেরা তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো তারাই আজ পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে কিংবা আর চোখে দেখছে না।

চারু তার নিজের মনকে সান্তনা দিল। সে এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে, সত্যিই অমল তার প্রিয় মানুষ। এগারো বছর আগে অমলকে হারিয়ে যে কতটা ভুল করেছে চারু, সেটার জন্যেই সে আজও নিজেকেই দোষী বলে। সে এটাও ভাবে যে, যদি আজ অমলকে না হারিয়ে ফেলত তাহলে না ধর্ষণ হত, না বিয়েটাই হত! চারু বিড়বিড় করে বলে, "অবশ্যও, বিয়েটাতো আর আমার..."

বাসের পেছনে তাদের মালপত্রগুলো রেখে উঠল। বাসের কন্ডাক্টর জিজ্ঞেস করল অমলকে, কোথায় যাবেন ! অমল বললো, "কলকাতা।" এই বলে অমলকে নিয়ে বাসের মাঝখানের সিটে বসলো। চারুকে জানলার পাশে রেখে অমল তার পাশে বসলো। অমল আর চারু ঠিক এগারো বছর আগে যেভাবে যাতায়াত করত ঠিক সেভাবেই বসলো। তাদেরকে যেন ছোটোবেলাকার অমল আর চারুলতার মতন দেখাচ্ছিল।

বাসে ওঠার আধঘন্টা পরে, রায়গঞ্জ থেকে গাড়ি ছাড়ল। চারু রায়গঞ্জটাকে একবার ভালো করে দেখে চোখের কোণায় জল এনে 'বিদায়' জানাল। অমল তার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে সান্তনা দিল।

সন্ধ্যে হতে এসেছে। কলকাতায় পৌঁছবার কিছুটা পথ বাকি। চারু অমলের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। গাড়িটা জ্যামে আটকে পড়ায় চোখ খুলল চারু।

"খাবে কিছু? স্যান্ডউইচ আছে আমার কাছে।" অমল জিজ্ঞেস করলো। চারু মাথা নাড়লো।

অমলের ছোট ব্যাগটা থেকে টিফিনবক্সটা বের করে নিয়ে চারুকে দিল। চারু পকেট থেকে স্যানিটাইজারটা বের করে নিয়ে অমলকে দিল আর সে নিজেও হাতে মেখে নিল।

চারটে স্যান্ডউইচ নিয়ে এসেছিল অমল। চারুকে দুটো দিয়ে, সে নিজেও দুটো খেল।

অমল ব্যাগের থেকে জলটা বের করতে করতে চারুকে বলল, "এই এগারোটা বছর তোমায় ছাড়া আমার কিভাবে যে দিনগুলো কেটেছে, তা তুমি জানো না চারু। অনেক কথা বাকি আছে চারু, তোমায় বলবার।" এই বলে জল খেল। চারু ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেল। তার হাতটা অমলের বা পায়ে রাখল।

সাড়ে সাতটায় বাস থামল। অমল তাদের জিনিসপত্রগুলো নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে তার ফ্ল্যাটে পৌঁছল।

"কবে কিনেছ?" চারু জিজ্ঞেস করল।

"এইতো বছরখানেক হল। চারমাস থেকে এই ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করেছি। আগে একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। তারপর দেখলাম যে খুব অসুবিধা হচ্ছে, তাই অফিসের কাছেই নিলাম।" দরজার লকটা খুলতে খুলতে অমল বলল।

ঘরে ঢুকেই চারু দু’টো ক্যানভাসে আঁকা বিশাল ছবি দেখতে পেল। আরেকটু সামনে যেতেই ক্যানভাসের নীচে ইংরেজিতে 'অমল দত্ত' লেখা রয়েছে দে লক্ষ করল।

"অমল, এই ছবিগুলো কি তুমি এঁকেছ? তুমি কি আর্ট শিখতে?" চারু কৌতূহলীর সঙ্গে জিজ্ঞেস করল।

"তোমাকে বলেছিলাম না চারু, আমার আর্ট শিখবার খুব ইচ্ছে ছিল। কলেজে উঠে আমি আর্ট শেখা শুরু করি। আর তারপর নিজের মনে যা আসত সেটাকেই ছবিতে বন্দী করে রাখতাম।"

"কিন্তু এই ছবিটা যে এঁকেছ, এটা তো আমার বহু পুরোনো। মানে, আমি যখন ইলিভেন-টুয়েলভে পড়তাম তখনকার চেহারা।" চারু নিজেও বুঝতে পারলো যে তার এখনকার চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে।

"তুমি যেবার ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, সেবার তো না আমার কাছে কোনো ছবি ছিল, না তোমার দেওয়া কোনো গিফ্ট রেখেছিলাম। তাই তখন থেকে আরও বেশি করে আর্ট শিখবার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠেছিল। আর তারপরেই আমি তোমার ছবিটা এঁকেছি।" সোফার কুষাণগুলো ঠিক করে নিতে অমল বলল

চারু সোফায় বসে জিজ্ঞেস করল, "আর এই মেয়েটা কে? যার ছবি তুমি এঁকে রেখেছ?"

"বাসে তোমায় বলেছিলাম না, তোমার সাথে অনেক কথা বাকি আছে। এর জন্যেই বলেছিলাম।

যাই হোক সেসব কথা বলবো, তার আগে বলো যে, কোল্ড কফির অভ্যেসটা রেখেছ তো এখনও?"

"না এখন তেমন নেই সেরকম। আসলে, আমার খুব সর্দি-কাশি হয়েছিল একবার তারপরের থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু, এতদিন পরে যখন বলছ তাহলে দাও।" মিষ্টি হাসি দিয়ে চারু বললো।

অমল চারুর মিষ্টি হাসিটা আবার দেখল, যা দে এগারো বছর আগে তার মুখে সবসময় দেখতে পেত। "তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি রেডি করছি।"

চারু তার ট্রলি থেকে গেঞ্জি কাপড়ের একটা প্যান্ট আর টপ নিয়ে বাথরুমে ঢুকল।

এদিকে অমল ফ্রিজ থেকে আইস বের করল। আর তার নিজের জন্য চা বানাল।

ট্রে-তে করে চা আর কোল্ডকফিটা নিয়ে এসে সেন্টার টেবিলে রাখল।

অমলের টাওয়েলটা দিয়ে চারু মুখের চারপাশে লেগে থাকা জলগুলো মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বের হল।

তার ফর্সা গায়ের রং, খয়েরী চুলগুলো দেখে অমল তার দিকে তাকিয়েছিল।

"অমন করে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার কি হল !" মুচকি হেসে চারু বললো।

"না, তোমাকে এরকমভাবে আজ প্রথমবার দেখলাম। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায় জানো? মনে হচ্ছে যেন আরও একবার তোমার প্রেমে পড়ে যাই"

"তাই? তাহলে পড়ো না; নতুন করে আরও একবার আমরা প্রেমে পড়ি।" এই বলে সে হা-হা করে হাসতে লাগল।

টাওয়েলটা ঝুলিয়ে রাখল। সোফায় বসে কোল্ডকফির গ্লাসটা তুলে চারু বলল, "হ্যাঁ, এবার বলো।"

চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে বলল,

"আজ থেকে এগারো বছর আগে...

দশমীর রাতে যখন তুমি আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, তখন আমি খুব একাকী হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল এ জগৎটা যেন খুব অন্ধকার তোমায় ছাড়া। সূর্য উঠত, অস্ত যেত - পাখিরা বাসায় ফিরে যেত, আবার সকাল হলেই রাখালরা গোরু চড়াবার জন্য বেড়িয়ে পড়তো। এইভাবেই আমি উচ্চমাধ্যমিকটাও দিয়ে ফেললাম।

কলকাতায় আসলাম এর পরে, নতুন কলেজে ভর্তি হলাম। বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে তোমার উদ্দেশ্যে দুঃখে-ভরা সব কবিতা যা লিখেছিলাম সেগুলোকে প্রকাশ করলাম। 'দুঃখের জগৎ' নামে বইটা প্রকাশ হল। দু-তিনমাসের মধ্যেই বইয়ের সব কবিতাগুলো পাঠকমহলে সাড়া ফেলে দিয়েছিল।"

"চা-টা খাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।" অমলকে চারু বলল।

"এরপরে একের পর এক নানানরকম গল্প-কবিতা লিখতে শুরু করলাম আমি। পাঠকদের উৎসাহ আমাকে আরও জাগিয়ে তুলছিল কাহিনী লেখা সাহায্য করতে।

জার্নালিসম নিয়ে পড়া শেষ করে একটা অফিসে চাকরি পেলাম। ওখানে গিয়ে একটা মেয়ের সাথে দেখা পেলাম।"

চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা টেবিলে রাখল। সিগারেটটা হাতে নিয়ে ব্যালকনির পাশে এসে দাঁড়ালো অমল। চারুও তার পাশে গিয়ে রেলিংটা ধরে চেয়ারটা টেনে বসল। সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে আগুন ধরাতে ধরাতে বললো,

"মেয়েটির নাম ছিল ক্যাথেরাইন্। ওর মা দুবাইয়ে থাকতো, তার বাবা ক্যাথেরাইনের মাকে নিয়ে কলকাতায় এসেছিল।

ক্যাথেরাইন্ অ্যাংকারিং করত। আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম পরস্পর। আমি, জয় আর ক্যাথেরাইন্ প্রতিদিন একইসাথে লাঞ্চ করতাম। কোনো কোনো দিন অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে ক্যাথেরাইনকে তার বাড়িতে ড্রপ করে দিতাম।

আঠাশে আগস্ট আমার জন্মদিন। বন্ধুরা সবাই খুব জেদ করছিল তাদের পার্টি দেওয়ার জন্য। একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম, সেখানে সুজয়, রিয়া, জয়, প্রিয়াঙ্কা আর ক্যাথেরাইন্ আসল।

বিশাল বড় একটা টেবিলে ছয়জন একসাথে বসলাম। আমি বলে দিয়েছিলাম ওদের যা খুশি ইচ্ছে অর্ডার করতে। ওরা যে যার মতন তাদের ডিশ অর্ডার করল, আর আমি দু`টো ওয়াইন্ অর্ডার করলাম।

রাত হয়ে গিয়েছিল। সবাই নিজেদের গাড়ি নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হল। আমি ক্যাথেরাইনকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছিলাম।

গাড়ি থেকে নেমে আমার কাঁচের জানলায় নক্ করল দু-তিনবার। আমি গাড়ির কাঁচটা খুলতেই ও বলল, আচ্ছা অমল তুমি তো আমার বাড়ির ভেতরে কখনই আসনি। এতবার বলেছিলাম আগে সবসময়ই না-না করে গেছ। আজ কিন্তু তোমায় বাড়িতে আসতেই হবে।

আমি প্রতিবারের মত এবারও মানা করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু শেষপর্যন্ত ও ছাড়ল না। গাড়িটা পার্ক করে রেখে, অবশেষে ঢুকতেই হল।

শর্ট স্কার্টের নিচে ফর্সা চামড়ার সরু পা গুলো থেকে লম্বা হিলওয়ালা জুতোগুলো খুলে দরজার এক পাশে রাখল ক্যাথেরাইন্। আমিও জুতোগুলো এক পাশে খুলে রেখে তার পেছন পেছন ঢুকলাম।

একটা ঘরের সামনে নিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলতে খুলতে বলল ক্যাথেরাইন্। আমি একবার তার দিকে তাকিয়ে, ভয়ে ভয়ে পেছনের অন্ধকার দরজাটা খুললাম।

দরজাটা খুলতেই, চারিদিকটা বেলুন দিয়ে সাজানো ছিল এবং চারটে মোম জ্বলছিল। আমি একটু এগোতেই ক্যাথেরাইন্ তার ঘরের ভেতর ঢুকে লাইট জ্বালাল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এসব আবার কেন !

ক্যাথেরাইন্ তার মুখের সামনে হাত উঁচু করে বলল, সারপ্রাইজ!

আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে তার এত সুন্দর করে সাজানো ঘরটাকে দেখছিলাম। ক্যাথেরাইন্ আমার দিকে এগিয়ে আসল।

ও তার পা-টাকে উঁচু করে আমার মাথাটা ধরে নিয়ে ঠোঁটে নিল। আমিও উত্তেজিত হয়ে গেলাম।

আমাদের ঠোঁটদুটো একসাথে থাকা অবস্থাতেই দরজার ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিল ক্যাথেরাইন্। আমিও তখন উত্তেজিত হয়ে তার কোমল পেট ধরে চারপাশের বেলুন ছড়ানো বিছানায় চলে গেলাম।

আর আমাদের সেই রাত...।"

চারু অমলের চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিল। লজ্জায় এবং অস্বস্তিতে তার চোখ থেকে নিজের চোখটা সরিয়ে নিল।

চারুর বিরক্তের সঙ্গে আগ্রহ জন্মাল। সে পুরো ব্যাপারটা জানবার জন্যে অমলকে আবার জিজ্ঞেস করল, "ক্যাথেরাইনের কি হল পরে? ও কি তোমাকে ভালোবাসত, নাকি তুমি ভালোবাসতে শুরু করেছিলে?"

টেবিলের ওপর রাখা বোতল থেকে জল খেয়ে আসলো অমল। চেয়ারটা এগিয়ে বসে নিয়ে আরও একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করল,

"সেই রাতটা আমি ক্যাথেরাইনের বাড়িতেই কাটালাম। পরদিন সকালে আমি আমার ঘরে আসলাম।

অফিসের একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল সেদিন। তাই বাড়িতে দু’ঘণ্টা থেকে অফিসে বেরোলাম। সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছিল, তাই আর দুপুরে লাঞ্চ করার সময় পাইনি।

পরেরদিন ছুটি ছিল, তাই সেদিনটা একটা উপন্যাসের কিছুটা শুরু করতে করতেই কেটে গেল।

তারপরের দিন আবার অফিসে গেলাম। রোজকার মত লাঞ্চ করতে গেলাম। কিন্তু আজ আর জয় আসেনি।

ক্যাথেরাইন্ আর আমি একটা টেবিলে পরস্পর মুখোমুখি বসে আছি। আমাদের সবার খাওয়ারের রুটিন সেম ছিল। কোনো কোনোদিন এক্সট্রা জ্যুস্ নেওয়া হত।

খাওয়ার আসতে দেরি হচ্ছিল। আমার টেবিলে রাখা হাতগুলো হঠাৎ ক্যাথেরাইন্ ধরে বলল, আই লাভ ইউ। তুমি যেদিন থেকে অফিসে জয়েন করেছ আমি তোমায় দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি। আমায় বিয়ে করবে অমল ?

আমি নিমেষের মধ্যে হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি বললাম যে, না এটা কখনই সম্ভব নয় ক্যাথেরাইন্।

 ক্যাথেরাইন্ বলল, কেনো অমল আমার মধ্যে এমন কি নেই যে তুমি আমায় বিয়ে করতে চাও না?

মানছি আমি খুব সাজতে ভালোবাসি, ছোট ছোট ড্রেস পড়ি। কিন্তু আমার ভালোবাসা যে সত্যি, আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারবো না অমল।

আমি সেদিন রাতে যা করেছি তাতে আমি খুবই দুঃখিত। আমি চাইনি আমাদের শরীরের উত্তাপ বাড়াতে। কিন্তু আমি যে থাকতে পারিনি। আমাদের ঠোঁটের সংস্পর্শে আমরা দু’জনেই যে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম।

আমি ক্যাথেরাইনকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম। বললাম, তুমি আমায় ভালোবাসো ঠিক আছে। কিন্তু আমি যে তোমায় ভালোবাসতে পারবো না ক্যাথেরাইন্।

ক্যাথেরাইন্ বলল, কেন অমল?

আমি বলতে শুরু করলাম, ‘আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন আমার সাথে একটি মেয়ে, চারুলতার প্রথম দেখা হয় এবং তখন থেকেই আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু দু’বছরের মাথায় দশমীর দিন, আমাদের সম্পর্কটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আমি জানি যে চারুলতা হয়তো আজও আমাকে ভালোবাসে। আর, আমার মন থেকে ওর প্রতি একটুও জায়গা সরাতে পারবো না ক্যাথেরাইন্। বোঝার চেষ্টা করো।’

এই বলে আমি টেবিল থেকে উঠতে নিলাম, কিন্তু আমার হাতদুটো আটকে ক্যাথেরাইন্ রাগের মাথায় বলে উঠল,

কেন আমার মনকে জিততে দিয়েছ অমল? কেনই বা সেই রাতে ঠোঁট রাখতে দিয়েছিলে? কেনই বা প্রতিদিন একইসাথে বসে লাঞ্চ করেছিলে? আর কেনই তুমি আমায় বাড়িতে ড্রপ করে দিতে? চোখের কোণায় জল নিয়ে ক্যাথেরাইন্ বলতে লাগল।

ক্যাথেরাইনকে এর আগে এরকমভাবে বলতে শুনিনি। আমিও আবেগপ্রবণ হয়ে চেয়ারে বসে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পরে ক্যাথেরাইন্ তার নাক টেনে নিয়ে, রুমাল দিয়ে চোখদুটো মুছে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

দেখো অমল, আমি জানি হয়তো চারুলতার প্রতি তোমার ভালোবাসা কখনই মুছে ফেলতে পারবে না।

আমি মাথা নাড়লাম।

কিন্তু অমল, তোমার হৃদয়ের গোপন একটা কোণায় আমার জন্য জায়গা নিয়ে রাখো। দেখবে সেদিন হয়তো তুমিও আমাকে ভালবাসতে পারবে।

এই শুনে আমি সিগারেট জ্বালিয়ে সেখান থেকে উঠে পড়লাম।

বাড়িতে এসে ক্যাথেরাইনের শেষ দুটো বাক্য আমার মধ্যে সর্বক্ষণ ঘুরপাক খেতে শুরু করেছিল।

সাতদিনের মাথায় একটা পার্কে আমি ক্যাথেরাইনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ক্যাথেরাইন্ সেদিন শরীর ঢাকা একটা কুর্তি পরে এসেছিল।

আমি বললাম, আমায় বিয়ে করবে ক্যাথেরাইন্?

তৎক্ষণাৎ ক্যাথেরাইন্ আমায় জড়িয়ে ধরল।

দু’মাসের মধ্যেই আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।

আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।"

"সত্যিই তুমি বিয়ে করে নিয়েছিলে ক্যাথেরাইনকে?" চারু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

"হ্যাঁ সাহসের সঙ্গে উত্তর দিল অমল।

"কিন্তু..."

"কিন্তু কী অমল?" চারু জিজ্ঞেস করল।

সিগারেটটা রেলিংয়ের বাইরে ফেলে দিয়ে বলল, "কিন্তু, আমাদের রিসেপশন্ পার্টির দিন চারু হঠাৎ উধাও হয়ে গেল।"

চারুর মনে শিহরণ জেগে উঠল।

অমল বলল, "পরেরদিন সকালে ঘন জঙ্গল থেকে ক্যাথেরাইনের দেহটা খুঁজে পেয়েছিল যারা মাঠে কাজ করতে আসে। দুই উরু দিয়ে রক্ত ঝরছিল। গলায় হাতের ছাপ দেখতে পেল কৃষকরা।"

"ব্যাস অমল, আর না... চুপ করো...!" কাঁদতে কাঁদতে চারু তার কানদুটো হাত দিয়ে বন্ধ করে নিল।

"পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত করে তারা জানাল যে তিনজন লোক একসাথে এসে ধর্ষণ করে ক্যাথেরাইনকে গলা টিপে খুন করেছে।

আর তারপর থেকেই..." চুপ হয়ে গিয়ে, চোখের সামনে হাত নিয়ে চারুকে না দেখিয়ে অমল কাঁদল।

চারু কাঁদতে কাঁদতে বলল, "এত সুন্দর মেয়েটার এরকম অবস্থা কেনই বা হল ! সত্যিই আজ সমাজটা কত পাপাচারে ভরে উঠেছে।"

"আমি ভাবি, কেন এরকমটা আমার সাথেই বারেবারে হয়।

আর আমি সংবাদপত্রে তোমার খবরটা পেয়ে ছুট্টে চলে গেছি তোমার সাথে দেখা করতে। আমি অনেক কিছু জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছি চারু, এগারো বছর আগে যাকে হারিয়েছি তাকে আর নতুন করে হারাতে চাই না।" এই বলে চোখে জল নিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।

অমল বাবা-মাকে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে আসল। তারা একসাথে থাকতে শুরু করলো। পনেরো দিনের মাথায় তাদের মধ্যে বিয়েও হয়ে গেল।

অমল এখন বিয়ে করে খুব সুখী। চারুকেও নতুন করে চেম্বার করে দিল অমল। চারুও এখন অমলকে দেখে রাত্রিবেলাটা লেখালিখি শুরু করে দিয়েছিল।

এই দেখতে দেখতে তিনটে বছর কেটে গেল। চারু গর্ভবতী। ছয় মাসের শিশু তার শরীরে বেড়ে উঠছে।

কিন্তু হঠাৎ একদিন, বাড়ির মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গেল অমল দেহত্যাগ করল।

তিন মাস কেটে গেল। চারুলতা ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তান জন্ম দিল। বাবা হারা ছেলের নাম রাখা হল, 'কমল দত্ত'।

অমলের ইচ্ছে ছিল, তাদের ভালোবাসা নিয়ে একটি বই লেখবার। আর সেই ইচ্ছে পূরণ করতেই চারুলতা লিখতে বসল।

গল্পের নাম দিল, "এগারো বছর: ভালোবাসার অন্তিম কাহিনী"

শুরুতেই সে লিখল, "আমি অনেক কিছু জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছি চারু, এগারো বছর আগে যাকে হারিয়েছি তাকে আর নতুন করে হারাতে চাই না।

আর তুমি আজ নিজেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলে..."

টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে অমলের ইচ্ছা পূরণ করবার জন্য সারাটা রাত ভেবে লিখতে শুরু করে দিল চারুলতা, "এগারো বছর: ভালোবাসার অন্তিম কাহিনী"।