প্রাত্যহিক জীবনে সুভাষিতম্
শ্রী অয়ন চট্টোপাধ্যায়
অন্নাদ্ভবন্তি ভূতানি পর্জন্যাদন্নসম্ভবঃ।
যজ্ঞাদ্ভবতি পর্জন্যো যজ্ঞঃ কর্মসমুদ্ভবঃ॥
(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা)
বঙ্গানুবাদ:
জগতের সমস্ত জীব অন্ন (খাদ্য) থেকে উৎপন্ন হয় ও বেঁচে থাকে; সেই অন্ন উৎপন্ন হয় মেঘের বৃষ্টি (জল) থেকে; বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক জলচক্র বজায় থাকে পরিবেশসম্মত নিঃস্বার্থ পারস্পরিক কর্মের (যজ্ঞ) দ্বারা; আর সেই যজ্ঞ উৎপন্ন হয় মানুষের দায়িত্বশীল সৎকর্ম থেকে। অর্থাৎ মানুষ, কর্ম, প্রকৃতি, জল ও খাদ্যের এই অবিচ্ছেদ্য আন্তঃসম্পর্কই জীবন ধারণের মূল চালিকাশক্তি।
প্রাত্যহিক জীবনে এই শ্লোকের প্রয়োগ ---
১. খাদ্য অপচয় রোধ: নিজের থালায় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রয়োজনমাফিক খাবার নিয়ে অপচয় শূন্যে নামিয়ে আনা; কারণ একদানা অন্ন নষ্ট করা মানে প্রকৃতির বিপুল শ্রম ও জলকে অপচয় করা।
২. উদ্বৃত্ত খাদ্য ক্ষুধার্তের কাছে পৌঁছে দেওয়া: পারিবারিক অনুষ্ঠান, রেস্তোরাঁ বা উৎসবের অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত খাদ্য ফেলে না দিয়ে বিভিন্ন ফুড ব্যাংক বা প্রান্তিক মানুষের মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা করা।
৩. পানীয় জলের অপচয় বন্ধ ও সংরক্ষণ: দাঁত মাজা, স্নান বা গাড়ি ধোয়ার সময় জলের অপচয় বন্ধ করা এবং গৃহস্থালিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting) ব্যবস্থার প্রচলন করা।
৪. মাটি ও ভূগর্ভস্থ জলের স্বাস্থ্য রক্ষা: নির্বিচারে রাসায়নিক কীটনাশক ও অতিরিক্ত কৃত্রিম সার ব্যবহার না করে জৈব সারের প্রয়োগ বাড়ানো, যাতে মাটি ও ভূগর্ভস্থ জল বিষাক্ত না হয়।
৫. প্রাকৃতিক জলাশয় ও নদীর দূষণ রোধ: পুকুর, খাল, বিল ও নদী ভরাট বন্ধ করা এবং কোনো জলাশয়ে প্লাস্টিক বা কলকারখানার বর্জ্য না ফেলে প্রাকৃতিক মিষ্টি জলের উৎসকে বিশুদ্ধ রাখা।
৬. অন্নদাতা কৃষকদের প্রতি মর্যাদা ও ন্যায্য মূল্য: কৃষিকাজকে অবহেলার চোখে না দেখে দেশের কৃষক সমাজের ন্যায্য ফসলের দাম, সম্মান ও অধিকার সুনিশ্চিত করতে সামাজিক স্তরে সোচ্চার হওয়া।
৭. স্থানীয় ও ঋতুভিত্তিক পুষ্টিকর শস্য গ্রহণ: দূরদূরান্ত থেকে প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাদ্য আমদানির চেয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জোয়ার, বাজরা, রাগি (মিলেট) ও মরসুমি শাকসবজি আহারে প্রাধান্য দেওয়া।
৮. সবুজায়ন ও স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি: ব্যাপক হারে দেশীয় গাছ লাগানো; কারণ অরণ্য ও উদ্ভিদের প্রাচুর্যই মেঘ সৃষ্টি ও নিয়মিত বৃষ্টিপাতের মূল অনুঘটক।
৯. প্রকৃতির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনচর্যা: প্রকৃতি থেকে কেবল গ্রহণ না করে গাছ লাগানো, জল সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষার মাধ্যমে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা।
১০. রান্নাঘরে অপচয়মুক্ত টেকসই রন্ধনশৈলী: আনাজের খোসা বা উচ্ছিষ্ট ফেলে না দিয়ে তা দিয়ে গৃহস্থালির গাছের জন্য উন্নতমানের জৈব সার তৈরি করা।
১১. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কালোবাজারি রোধ: সংকটের সময়েও খাদ্যশস্য মজুতদারি বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি না ঘটিয়ে সামাজিক স্তরে ন্যায্য বণ্টনের সংস্কৃতি বজায় রাখা।
১২. জল পুনর্নবীকরণ ও পুনর্ব্যবহার: রান্নাঘরের সবজি ধোয়ার জল বাগানের গাছে দেওয়া এবং জল পুনঃব্যবহারের টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
১৩. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য ও জলের নিশ্চয়তা: বর্তমানের বিলাসে মাটির উর্বরতা ও পানীয় জলের সঞ্চয় নিঃশেষ না করে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উর্বর ও জলসমৃদ্ধ পৃথিবী রেখে যাওয়া।

.jpg)









