প্রাত্যহিক জীবনে সুভাষিতম্
শ্রী অয়ন চট্টোপাধ্যায়
ন কশ্চিৎ কস্যচিন্মিত্রং ন কশ্চিৎ কস্যচিদ্রিপুঃ।
ব্যবহারেণ জায়ন্তে মিত্রাণি রিপবস্তথা॥
(হিতোপদেশ, পঞ্চতন্ত্র ও চাণক্য নীতি)
বঙ্গানুবাদ:
জগতে জন্মগতভাবে কেউই কারও চিরন্তন মিত্র (বন্ধু) নয় এবং কেউই কারও স্বভাবজাত শত্রু (রিপু) নয়। মানুষের পারস্পরিক আচরণ, ব্যবহার ও কূটনৈতিক বিনিময়ের মাধ্যমেই মিত্র ও শত্রু সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ সম্পর্কের শুভাশুভ কোনো নিয়তি নয়, তা সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিজ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল।
প্রাত্যহিক জীবনে এই শ্লোকের প্রয়োগ ---
১। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্বশান্তি: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী কোনো বন্ধু বা শত্রু থাকে না; পারস্পরিক সম্মান, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ও আস্থার সম্পর্কের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্র অন্য দেশের পরম মিত্র হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়।
২। কর্মক্ষেত্রের রাজনীতি ও টিম কালচার: সহকর্মীদের সাথে প্রতিযোগিতার নামে রেষারেষি বা অহংকার না দেখিয়ে সহযোগিতাপূর্ণ ও পেশাদার আচরণ বজায় রাখলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষও দক্ষ সহযোগীতে পরিণত হয়।
৩। পারিবারিক শান্তি ও বন্ধন সুদৃঢ়করণ: রক্তের সম্পর্ক থাকলেই আন্তরিকতা টিকে থাকে না; প্রতিদিনের মিষ্টি কথা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহনশীল ব্যবহারের মাধ্যমেই পরিবারের সদস্যরা পরম সুহৃৎ হয়ে ওঠেন।
৪। প্রতিবেশী সংহতি ও সামাজিক নিরাপত্তা: প্রতিবেশীকে পর না ভেবে প্রতিদিনের কুশলবিনিময় ও আপদে-বিপদে আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এলাকার মানুষদের একটি নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা বলয়ে রূপান্তর করা।
৫। ডিজিটাল শিষ্টাচার ও সুস্থ অনলাইন পরিবেশ: সোশ্যাল মিডিয়ায় মতের অমিল হলেই তাকে ‘শত্রু’ বা ‘প্রতিপক্ষ’ বানিয়ে কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ না করে, শালীন ও যুক্তিযুক্ত আচরণের মাধ্যমে গঠনমূলক আলোচনার সংস্কৃতি বজায় রাখা।
৬। সংঘাত নিরসন ও আলোচনার সংস্কৃতি: পারিবারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিবাদে জেদ ও তিক্ততা না বাড়িয়ে, খোলামেলা ও আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি দূর করে পুরোনো সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করা।
৭। ব্যবসায়িক সততা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি: কোনো ক্রেতা বা ব্যবসায়িক অংশীদার চিরকাল না ও থাকতে পারে; আর তাই নিখুঁত পরিষেবা, কথা রাখার অভ্যাস এবং সৎ ব্যবহারের জোরেই স্থায়ী বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হয়।
৮। নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও কর্মী আনুগত্য: পদমর্যাদা বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নয়, বরং অধস্তন কর্মীদের প্রতি মানবিক, সহানুভূতিশীল ও ন্যায্য আচরণের দ্বারাই প্রকৃত নেতা হিসেবে আস্থা ও বিশ্বস্ততা অর্জন করা যায়।
৯। বাকসংযম ও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ: অযথা কটূক্তি, বিদ্রূপ ও রূঢ় কথাবার্তার মাধ্যমে অনর্থক শত্রু তৈরি না করে পরিমিত ও মিষ্টভাষণের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশকে শান্ত রাখা।
১০। পূর্বশত্রুতা নিরসন ও ক্ষমার চর্চা: অতীতের তিক্ততাকে বংশপরম্পরায় জিইয়ে না রেখে, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সদিচ্ছা ও উদার আচরণ প্রদর্শন করে বৈরী পরিবেশকে স্বাভাবিক করে তোলা।
১১। ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে মেলবন্ধন: নতুন স্থান, ভিন্ন ভাষা বা ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকে পূর্বধারণা (Prejudice) দিয়ে বিচার না করে আন্তরিক ব্যবহারের মাধ্যমে সহজে আপন করে নেওয়া।
১২। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রজন্মের দূরত্ব হ্রাস: কর্তৃত্ববাদী ভয়ের পরিবেশ তৈরি না করে অভিভাবক ও শিক্ষকদের স্নেহময় ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সাথে আস্থার সেতু তৈরি করা।
১৩। স্বার্থপরতা বর্জন ও পারস্পরিক কল্যাণ: কেবল নিজের লাভ না দেখে উভয় পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে এমন আচরণের অভ্যাস করা, যা সম্পর্কের মাঝে বিরোধ বা ক্ষোভের বীজ অঙ্কুরিত হতে দেয় না।
১৪। সংকটকালে নিঃস্বার্থ পাশে থাকা: অন্য কারও দুর্দিনে কোনো পূর্বশর্ত ছাড়া সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে সাধারণ পরিচিতিও আজীবনের গভীর মৈত্রীতে রূপ নেয়।

তৃপ্তিদায়ক। অসাধারণ শব্দ চয়ন ও বিন্যাস।
ReplyDelete