Aug 20, 2021

সালটা ২০৮৫

Edit Posted by with 1 comment

 


সালটা ২০৮৫

সম্রাট মণ্ডল

 

কালকেই আমার ৮৫ বছরের জন্মদিন পালন হল। কদিন ধরেই শরীরটা একটু খারাপ। তাই আর দুপুরে ঘুম হচ্ছে না ঠিকঠাক। সেইজন্য বিছানা ছেড়ে উঠে নাতনিটার ঘরে গেলাম। আজকে আমার স্ত্রী সুপর্ণার কথা খুব মনে পড়ছিল। যে ৫ বছর আগেই আমায় একা ফেলে চলে গেছে। একদম সুপর্ণার মতন দেখতে আমার নাতনিটাকে। গেলাম গিয়ে দেখছি ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। আমি জিজ্ঞাস করলাম “কি করছো দিদিভাই”। উত্তরে আমায় বলল “উফফ Grandpa! তোমায় না কতবার বলেছি আমাকে ওসব দিদিভাই বলে ডাকবে না। You call me Grand-daughter”। কিন্ত কি করবো অভ্যাস হয়ে গেছে। আমায় নাতনি বলল “তুমি একটু এখানে বসো আমি পড়তে যাবো এখনই খেয়ে আসছি” এই বলে চলে গেলো। হাতের কাছে ল্যাপটপটা দেখে ভাবলাম একটু ফেসবুকটা খুলি। প্রায় ১০ বছর হয়ে গেলো আর খুলি না। পাসওয়ার্ড ও User Id টা কোনোরকম কষ্ট করে মনে করলাম করে খুললাম। দেখি অনেক গুলো Inbox এসছে। প্রথমেই এসছে আমার সব থেকে কাছের বন্ধু মৈনাকের। প্রায় ৪ বছর আগে আমায় Message করেছে। লেখা আছে “ভাই তুই কোথায়? আমার শরীর ভালো নেই। আর মনে হয় বেশিদিন বাঁচবো না। একবার একটু দেখা করে যা”। পরক্ষনেই মনে পড়লো ও মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। আর এই Message টা ছিল মারা যাওয়ার ২ দিন আগের। পরবর্তী Message ছিল ৪ বছর আগের, আমার আর এক বন্ধু সৌরভের। লিখেছে “ভাই আজকে ছেলে ও তাঁর বৌ বাড়ি থেকে বার করে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে দিলো আমায় ও আমার স্ত্রীকে। এই দিনের জন্যই কি আমরা ছেলেকে বড়ো করি”? এই কথাটা শুনে একটু খারাপ লাগলো। তাই Message box থেকে বেরিয়ে Search Bar এ গেলাম। ভাবলাম যে মানুষটা ৬০ বছর আগে একসাথে থাকবে বলেছিল সেই মানুষটা কি কেমন আছে একবার দেখি। Search করলাম Bela Bose। প্রথমেই ওর Profile টা খুললও। দেখলাম শেষ ছবি Post করেছে আজ থেকে ২ বছর আগে, তাঁর স্বামী, ছেলে, বউমা ও নাতি কে নিয়ে। হ্যাঁ এই সেই Bela Bose যে সাথে থাকার কথা দিয়েছিল। কিন্ত সম্পর্কটা আর পূর্ণতা পায়নি। নীচে ফোন নম্বর দেওয়া ছিল। সেই ৬০ বছর আগের নম্বর। সেই নম্বরে নাতনির ফোনটা নিয়ে ফোন লাগালাম। অপরদিকে বলে উঠলো এই নম্বরের কোন অস্তিত্ব নেই। খুব খারাপ লাগলো তাই চুপ করে বসেছিলাম। তখন হঠাৎ নাতনি এসে বলল “Grandpa এবার চলো আমায় পড়তে বেরতে হবে”। আমি বললাম “হ্যাঁ তুই ব্যাগ গোছা আমি যাচ্ছি”। ও হেঁসে বলল “কি যে বলো Grandpa এখন আর কি ব্যাগ গোছাবো। এখন সব Online-এ”। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম “মানে ! Online বলে কি খাতা বই নিবি না”? ও উত্তরে আমায় বলল “কিসের খাতা বই? এখন সব কিছু Online, ল্যাপটপ, Computer, মোবাইল ছাড়া পড়াশোনা আর হয় না বুঝলে। তুমি বড্ড Back Dated”। এই বলে সে চলে গেল। ও যাওয়ার পর আমি ভাবতে লাগলাম আমি কি সত্যিই Back Dated? এসব জিনিস যখন প্রথম এসছিল আমরা সবার আগে ব্যাবহার করেছিলাম। আমরা তো আমাদের বন্ধুত্বটাই ভুলে গেছিলাম এসবের পিছনে পরে। আমাদের প্রেম হতো WhatsApp, Facebook, Instagram-এ। প্রথম Online Class এসব ল্যাপটপ, Computer, ফোন ব্যবহার করে আমরাই শুরু করেছিলাম। আমরাই তো বলতাম যে যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে। সব কিছু Online হোক এটা আমরাই তো চাইতাম। আসলে আমরা তখন বুঝিনি সব কিছু Online হয় না। তাই আজকে আমার বন্ধুরা সবাই একে একে ছেড়ে চলে গেছে কিন্ত সেটা আমায় জানিয়েছে  Facebook এর মাধ্যমে। আমরাও তো একসময় বলতাম বয়স্ক মানুষদের যে তোমরা জোর করে Online জিনিস সম্পর্কে জানো। আমরা তো মাঝে মাঝে ভাইফোঁটাও নিতাম Online-এ। নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে একটা কোন ছোট Gift কিনে অনেক দিন পর দেখা করতে যাওয়া জিনিসটা তো আমরা ভুলেই গেছিলাম। ইচ্ছা হল Flipkart বা Amazon–এ Order করে দিলাম। নিজের হাতে দেওয়ার ইচ্ছাটাই মরে গেছিলো। আমরা Facebook-এ Profile Check করা পছন্দ করতাম কিন্ত সামনা সামনি দাঁড়িয়ে কথা বলাটা নয়। আমরা কোন ভালো জিনিস নিজের চোখে দেখাটাই ভুলে গেছিলাম। কোন ভালো জিনিস দেখলে আগে ফোন বার করে ছবি তুলতে ব্যস্ত ছিলাম। কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করলে আমরা একসাথে বসে করতাম না। ওই একটা WhatsApp গ্রুপ খুলে দিলাম, হয়ে গেলো। আমরা তো নিজেই জানি না কতদিন হয়ে গেলো কারোর সাথে সামনা সামনি ঠিক ভাবে দাঁড়িয়ে কথাই বলিনি। যা কথা বলার থাকতো সবই বলতাম WhatsApp, Facebook, Instagram-এ। আর আজকে আমি Back Dated। আমরাও অনেক মানুষকে বলতাম Back Dated মানুষ ওরা ওসব Online বোঝে না। কিন্ত Online-এ সুখি থাকার থেকে এই Offline-এ সুখি থাকাটাই খুব বেশি জরুরি।


1 comment: